(বিকল্প নাম: পরিবেশ সুরক্ষায় ছাত্র সমাজ / পরিবেশ সংকট ও মানব সভ্যতা)
পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার
ভূমিকা:
“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর…” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই যন্ত্রসভ্যতার গ্রাস থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক মায়ের সাথে সন্তানের মতো। পরিবেশের কোলেই মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির নেশায় মানুষ আজ নিজের সেই আশ্রয়স্থলকেই ধ্বংস করছে। অরণ্য কেটে গড়ে উঠছে নগর, আর কলকারখানার ধোঁয়ায় আকাশ হচ্ছে মলিন। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যাকে আমরা এককথায় বলি ‘পরিবেশ দূষণ’।
দূষণের প্রকারভেদ ও কারণ: পরিবেশ দূষণ মূলত চারভাবে আমাদের গ্রাস করেছে:
- ১. বায়ু দূষণ: এটি সবথেকে মারাত্মক। কলকারখানার চিমনি ও যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড বাতাসে মিশে বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। অবাধে গাছ কাটার ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে।
- ২. জল দূষণ: নদীর জলে কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, শহরের নর্দমার জল এবং আবর্জনা ফেলার ফলে জল দূষিত হচ্ছে। এর ফলে জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে এবং পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে।
- ৩. মাটি দূষণ: প্লাস্টিক, পলিথিন এবং কৃষিকাজে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি তার উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। মাটি হয়ে পড়ছে বিষাক্ত।
- ৪. শব্দ দূষণ: যানবাহনের হর্ন, মাইক, বাজি এবং কলকারখানার বিকট শব্দ মানুষের সহনক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে মানুষের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে।
দূষণের ভয়াবহ ফলাফল: পরিবেশ দূষণের ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ।
- বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): বাতাস দূষিত হওয়ার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
- রোগব্যাধি: দূষিত জল ও বাতাসের কারণে মানুষ হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ক্যান্সার, চর্মরোগ ও পেটের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে।
- প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ঋতুচক্রের পরিবর্তন হচ্ছে। যখন তখন খরা, বন্যা বা সাইক্লোন দেখা দিচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পশুপাখি।
প্রতিকার ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা: পরিবেশ দূষণ রোধে এখনই সচেতন না হলে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য। এই কাজে ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে:
- বৃক্ষরোপণ: “একটি গাছ, একটি প্রাণ“—এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ছাত্রদের প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে। অরণ্যই পারে বাতাসকে শুদ্ধ করতে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: ছাত্ররা র্যালি, পথনাটিকা বা পোস্টারিং-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্লাস্টিক বর্জন এবং জলাশয় পরিষ্কার রাখার গুরুত্ব বোঝাতে পারে।
- প্লাস্টিক বর্জন: ছাত্ররা নিজেরা প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করবে এবং বাড়ি ও পাড়ায় পাটের বা কাপড়ের থলি ব্যবহারে উৎসাহ দেবে।
- শব্দ নিয়ন্ত্রণ: উৎসবে মাইক বা বাজি ফাটানো বন্ধ করতে ছাত্ররাই পারে বড়দের বাধ্য করতে।
উপসংহার: প্রকৃতি আমাদের সব দিয়েছে, কিন্তু আমরা তাকে শুধু আঘাতই করেছি। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন— “Earth provides enough to satisfy every man’s needs, but not every man’s greed.” আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখতে হলে দূষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে শপথ নিই—পরিবেশ বাঁচাব, আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী উপহার দেব।




