জলা বুজিয়ে আবাসন নয়: বিপন্ন পরিবেশ ও শহরের ভবিষ্যৎ
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা, ৭ জানুয়ারি ২০২৬: নগরায়ন ও আধুনিকতার দোহাই দিয়ে শহরের বুক থেকে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে ছোট-বড় জলাশয়। একসময় যেখানে টলটলে জলের ওপর ভেসে বেড়াত হাঁস, পাড়ের গাছে বাসা বাঁধত নানা পাখি, আজ সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বহুতল আবাসন। পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ‘জলা বুজিয়ে আবাসন’ তৈরির এই প্রবণতা থামছে না, যা ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।
শহর ও শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় বেআইনিভাবে পুকুর বা ডোবা ভরাট করার অভিযোগ উঠছে নিয়মিত। জমি মাফিয়া ও অসাধু প্রোমোটার চক্র রাতের অন্ধকারে আবর্জনা ও মাটি ফেলে জলাশয় ভরাট করছে। পরবর্তীতে সেখানে তৈরি হচ্ছে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা। এর ফলে সরাসরি লঙ্ঘিত হচ্ছে জলাভূমি সংরক্ষণ আইন। স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করলেও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে সুফল মিলছে না।
জলাশয় ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। প্রথমত, শহরে ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। আগে এই পুকুরগুলো বৃষ্টির জল ধরে রেখে মাটির নিচের জলের ভারসাম্য বজায় রাখত। এখন সবটাই কংক্রিটে মোড়া থাকায় বৃষ্টির জল মাটিতে শোষিত হতে পারছে না। ফলস্বরূপ, গ্রীষ্মকালে তীব্র জলকষ্ট দেখা দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, নিকাশি ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই শহরের রাস্তাঘাট জলমগ্ন হয়ে পড়ছে, কারণ জল সরে যাওয়ার বা জমা হওয়ার প্রাকৃতিক আধারগুলো আর নেই। একে বলা হচ্ছে ‘আরবান ফ্লাড’ বা শহুরে বন্যা। এছাড়া, জলাশয় ভরাটের ফলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে এবং এলাকার তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। জলাশয় যে কেবল জমির টুকরো নয়, বরং পরিবেশের ফুসফুস—এই বোধ সাধারণ মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হবে। প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে এবং বেআইনি ভরাট দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আবাসন মানুষের প্রয়োজন, কিন্তু তা প্রকৃতির বিনিময়ে নয়। কারণ, জল না থাকলে যেমন জীবন থাকবে না, তেমনই বাসযোগ্য পরিবেশ না থাকলে আবাসনও অর্থহীন হয়ে পড়বে।
