জীবনের আদর্শ / ছাত্রজীবনের লক্ষ্য

বাংলা রচনা: তোমার জীবনের লক্ষ্য – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: জীবনের আদর্শ / ছাত্রজীবনের লক্ষ্য)

“লক্ষ্যহীন জীবন, হালহীন নৌকার মতো।”

সমুদ্রে ভাসমান নাবিকের যেমন দিকনির্ণয় যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, তেমনি জীবনসমুদ্রে পাড়ি দিতে হলে প্রতিটি মানুষের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা প্রয়োজন। লক্ষ্য ছাড়া সাফল্য অর্জন অসম্ভব। ছাত্রাবস্থাতেই ঠিক করে নিতে হয় ভবিষ্যতে আমি কী হতে চাই। আমার জীবনের লক্ষ্য হলো একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া।

অনেকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে চায়। কিন্তু আমি মনে করি, সমাজ গড়ার আসল কারিগর হলেন শিক্ষকরা। আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎকে সঠিক আকার দেন একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে আজও শিক্ষার আলো সব ঘরে পৌঁছায়নি। কুসংস্কার আর অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে আছে অনেক গ্রাম। আমি শিক্ষকতার মহান পেশার মাধ্যমে সেই অন্ধকার দূর করতে চাই।

ডাক্তাররা মানুষের শরীর সারান, কিন্তু শিক্ষকরা মানুষের মন তৈরি করেন। আমি গ্রামের কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে চাই যেখানে ছাত্রছাত্রীরা সুযোগের অভাবে পিছিয়ে আছে। তাদের কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত করাই আমার কাজ হবে না, বরং তাদের চরিত্র গঠন করা, সৎ ও দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হবে আমার ব্রত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ আমার আদর্শ।

স্বপ্ন দেখা সহজ, কিন্তু তা বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন। আমার এই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমি এখন থেকেই কঠোর পরিশ্রম করছি। মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল করে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য ভালো কলেজে ভর্তি হতে চাই। এরপর শিক্ষকতা প্রশিক্ষণের (B.Ed) মাধ্যমে নিজেকে একজন দক্ষ শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলব। আমি জানি পথ কঠিন, কিন্তু আমার সংকল্প অটুট।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন— “জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” আমি শিক্ষকতার মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের সেবা করে দেশের সেবা করতে চাই। আমার বিশ্বাস, একজন ভালো শিক্ষক হাজার হাজার ভালো মানুষ তৈরি করতে পারেন। আর এভাবেই আমি আমার জীবনকে সার্থক করে তুলতে চাই।

ষড়ঋতুর দেশ / বাংলার প্রকৃতি

বাংলা রচনা: বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: ষড়ঋতুর দেশ / বাংলার প্রকৃতি)

ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে—” রবীন্দ্রনাথের গানেই বাংলার প্রকৃতির রূপ ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশ ষড়ঋতুর দেশ। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ঋতুর এমন বৈচিত্র্যময় খেলা দেখা যায় না। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—প্রতি দুই মাস অন্তর প্রকৃতি এখানে নতুন সাজে সেজে ওঠে। একেক ঋতুর একেক রূপ, একেক রং।

বছরের শুরু হয় গ্রীষ্ম দিয়ে। প্রখর রোদে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। নদী-নালা শুকিয়ে যায়। কিন্তু এরই মাঝে আসে সুস্বাদু ফল—আম, জাম, লিচু ও কাঁঠাল। মাঝে মাঝে কালবৈশাখী ঝড় এসে প্রকৃতিকে ধুয়ে দিয়ে যায়।

গ্রীষ্মের দাবদাহ জুড়িয়ে দিতে আসে বর্ষা। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়, শুরু হয় অবিরাম বৃষ্টি। নদী-পুকুর জলে টলমল করে। প্রকৃতি সজীব হয়ে ওঠে, গাছে গাছে কদম ও কেয়া ফুল ফোটে। কৃষকরা ধানের চারা রোপণ করেন এই সময়েই।

বর্ষার মেঘ সরে গিয়ে আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভাসে। নদীতীরে ফোটে সাদা কাশফুল। শিউলি ফুলের গন্ধে বাতাস মেতে ওঠে। এই ঋতুতেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার আগমন ঘটে। প্রকৃতি তখন খুশিতে ঝলমল করে।

শরতের পরই আসে হেমন্ত। এই ঋতু অনেকটা শান্ত ও নিস্তব্ধ। মাঠভরা সোনালি ধান দেখে কৃষকের মুখে হাসি ফোটে। ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠার উৎসবে মেতে ওঠে গ্রামবাংলা, যাকে বলা হয় ‘নবান্ন’। শীতের একটু একটু আমেজ পাওয়া যায় এই সময়ে।

হেমন্তের শেষে উত্তুরে হাওয়া নিয়ে আসে শীত। কুয়াশায় চাদর মুড়ি দেয় প্রকৃতি। মানুষ গরম পোশাকে নিজেকে ঢেকে রাখে। খেজুরের রস, পিঠেপুলি আর নলেন গুড়ের গন্ধে শীতকাল হয়ে ওঠে উপভোগ্য। গাঁদা, ডালিয়া আর চন্দ্রমল্লিকায় বাগান ভরে ওঠে।

সবশেষে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। শীতের রুক্ষতা দূর করে গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়। কোকিলের কুহু তানে মুখরিত হয় চারপাশ। পলাশ আর শিমুল ফুলের লাল রঙে প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে। দোলযাত্রার রঙের উৎসবে মানুষ মেতে ওঠে।

ছয়টি ঋতু যেন ছয়জন ভিন্ন জাদুকর। তারা আসে, তাদের জাদুর ডালা সাজায় এবং চলে যায়। ঋতুচক্রের এই আবর্তন বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। প্রকৃতির এই বিচিত্র রূপই বাংলাদেশকে করেছে ‘রূপসী বাংলা’।

পরিবেশ সুরক্ষায় ছাত্র সমাজ / পরিবেশ সংকট ও মানব সভ্যতা

বাংলা রচনা: পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: পরিবেশ সুরক্ষায় ছাত্র সমাজ / পরিবেশ সংকট ও মানব সভ্যতা)

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

ভূমিকা:

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর…” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহু আগেই যন্ত্রসভ্যতার গ্রাস থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক মায়ের সাথে সন্তানের মতো। পরিবেশের কোলেই মানুষের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির নেশায় মানুষ আজ নিজের সেই আশ্রয়স্থলকেই ধ্বংস করছে। অরণ্য কেটে গড়ে উঠছে নগর, আর কলকারখানার ধোঁয়ায় আকাশ হচ্ছে মলিন। এর ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যাকে আমরা এককথায় বলি ‘পরিবেশ দূষণ’।

দূষণের প্রকারভেদ ও কারণ: পরিবেশ দূষণ মূলত চারভাবে আমাদের গ্রাস করেছে:

  • ১. বায়ু দূষণ: এটি সবথেকে মারাত্মক। কলকারখানার চিমনি ও যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড বাতাসে মিশে বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। অবাধে গাছ কাটার ফলে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে।
  • ২. জল দূষণ: নদীর জলে কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, শহরের নর্দমার জল এবং আবর্জনা ফেলার ফলে জল দূষিত হচ্ছে। এর ফলে জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে এবং পানীয় জলের সংকট দেখা দিচ্ছে।
  • ৩. মাটি দূষণ: প্লাস্টিক, পলিথিন এবং কৃষিকাজে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি তার উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। মাটি হয়ে পড়ছে বিষাক্ত।
  • ৪. শব্দ দূষণ: যানবাহনের হর্ন, মাইক, বাজি এবং কলকারখানার বিকট শব্দ মানুষের সহনক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে মানুষের মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে।

দূষণের ভয়াবহ ফলাফল: পরিবেশ দূষণের ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ।

  • বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): বাতাস দূষিত হওয়ার ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
  • রোগব্যাধি: দূষিত জল ও বাতাসের কারণে মানুষ হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, ক্যান্সার, চর্মরোগ ও পেটের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে।
  • প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ঋতুচক্রের পরিবর্তন হচ্ছে। যখন তখন খরা, বন্যা বা সাইক্লোন দেখা দিচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে অনেক পশুপাখি।

প্রতিকার ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা: পরিবেশ দূষণ রোধে এখনই সচেতন না হলে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য। এই কাজে ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে:

  • বৃক্ষরোপণ:একটি গাছ, একটি প্রাণ“—এই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ছাত্রদের প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে। অরণ্যই পারে বাতাসকে শুদ্ধ করতে।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: ছাত্ররা র‍্যালি, পথনাটিকা বা পোস্টারিং-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্লাস্টিক বর্জন এবং জলাশয় পরিষ্কার রাখার গুরুত্ব বোঝাতে পারে।
  • প্লাস্টিক বর্জন: ছাত্ররা নিজেরা প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করবে এবং বাড়ি ও পাড়ায় পাটের বা কাপড়ের থলি ব্যবহারে উৎসাহ দেবে।
  • শব্দ নিয়ন্ত্রণ: উৎসবে মাইক বা বাজি ফাটানো বন্ধ করতে ছাত্ররাই পারে বড়দের বাধ্য করতে।

উপসংহার: প্রকৃতি আমাদের সব দিয়েছে, কিন্তু আমরা তাকে শুধু আঘাতই করেছি। মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন— “Earth provides enough to satisfy every man’s needs, but not every man’s greed.” আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখতে হলে দূষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আসুন, আমরা সবাই মিলে শপথ নিই—পরিবেশ বাঁচাব, আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবী উপহার দেব।

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ / বাংলার সংস্কৃতি ও উৎসব

বাংলা রচনা: বাংলার উৎসব – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ / বাংলার সংস্কৃতি ও উৎসব)

“জগৎ পারাবারের তীরে শিশুরা সব জড়ো, দুহাত তুলে আকাশ পানে কী যে আশায় ওড়ো।”

বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি আর কঠোর পরিশ্রমের মাঝে উৎসব যেন এক ঝলক তাজা বাতাস। প্রবাদ আছে, “বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ”। অর্থাৎ বছরের প্রতিটি ঋতুতেই বাঙালির ঘরে ঘরে কোনো না কোনো উৎসব লেগেই থাকে। এই উৎসবগুলোই বাঙালির প্রাণশক্তি।

বাংলার উৎসবগুলিকে মূলত চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: ১. ধর্মীয় উৎসব: হিন্দুদের দুর্গাপূজা, কালীপূজা, দোলযাত্রা; মুসলমানদের ঈদ-উল-ফিতর, মহরম; খ্রিস্টানদের বড়দিন এবং বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা। তবে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে এই উৎসবগুলো আজ সার্বজনীন হয়ে উঠেছে। ২. সামাজিক উৎসব: অন্নপ্রাশন, উপনয়ন, বিবাহ, জামাইষষ্ঠী, ভাইফোঁটা, রাখিবন্ধন ইত্যাদি। এগুলি পারিবারিক বন্ধন ও আত্মীয়তার সম্পর্ক দৃঢ় করে। ৩. ঋতু উৎসব: প্রকৃতির পালাবদলের সাথে সাথে আসে নবান্ন, পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব বা হোলি, বর্ষামঙ্গল ইত্যাদি। ৪. জাতীয় উৎসব: স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, নেতাজির জন্মদিন, রবীন্দ্রজয়ন্তী ইত্যাদি।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হলো দুর্গাপূজা। শরতের নীল আকাশ আর কাশবনের দোলায় মা আসেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই নতুন পোশাকে সেজে ওঠে। অন্যদিকে খুশির উৎসব ঈদ-এ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে কোলাকুলি করে। সম্প্রীতির এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায় তখন।

বাংলার উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে মেলা। রথযাত্রা, চড়ক বা রাসমেলায় গ্রামীণ কুটির শিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন কারিগররা। মাটির পুতুল, বাঁশের কাজ, ঘর সাজানোর জিনিস বিক্রি করে অনেক মানুষের অন্নসংস্থান হয়। উৎসব তাই শুধু আনন্দ দেয় না, অর্থনীতির চাকাও সচল রাখে।

উৎসব মানেই মিলন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ।” জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে মানুষ এক হয় উৎসবে। বিজয়ার কোলাকুলি বা ঈদের সেমাই খাওয়া—সবখানেই থাকে মানবতার জয়গান।

বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে, তখন এই উৎসবগুলোই আমাদের শিকড়ের কাছে ধরে রাখে। বাংলার উৎসব আমাদের শেখায় সংকীর্ণতা ভুলে উদার হতে এবং সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে।

বাংলা রচনা: বিজ্ঞানের ভালো ও মন্দ – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

বাংলা রচনা: বিজ্ঞানের ভালো ও মন্দ – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান / বিজ্ঞান: আশীর্বাদ না অভিশাপ)

“বিস্ময় তাই জাগে, মানুষের জাদুমন্ত্রে জগত আজ হাতের মুঠোয় লাগে।”

আদিম মানুষ একসময় গুহায় বাস করত, কাঁচা মাংস খেত। আজ সেই মানুষই বিজ্ঞানের জাদুকরী স্পর্শে মহাকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত—আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত বিজ্ঞানের দানে ঘেরা। বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক জীবন এক মুহূর্তও অচল। বিজ্ঞান মানুষের হাতে অসীম ক্ষমতা তুলে দিয়েছে।

বিজ্ঞান মানবসভ্যতার পরম বন্ধু। এর সুফল সবদিকে ছড়িয়ে আছে:

  • চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য: একসময় মহামারী বা সাধারণ অসুখে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। আজ পেনিসিলিন থেকে শুরু করে আধুনিক সার্জারি, এক্স-রে, এমআরআই (MRI) এবং দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিষেধক মানুষের গড় আয়ু অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
  • যোগাযোগ ব্যবস্থা: চাকা আবিষ্কার দিয়ে যে যাত্রার শুরু, আজ তা দ্রুতগামী ট্রেন, বিমান ও রকেটে পৌঁছেছে। পৃথিবী আজ ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে।
  • কৃষি ও শিল্প: ট্রাক্টর, উন্নত বীজ ও সারের ব্যবহারে কৃষিতে সবুজ বিপ্লব এসেছে। ফলে মানুষের অন্নের সংস্থান হয়েছে। কলকারখানায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন জীবনকে সহজ করেছে।
  • দৈনন্দিন জীবন ও বিনোদন: বিদ্যুৎ, ফ্যান, এসি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট—সবই বিজ্ঞানের দান। ঘরের কোণে বসেই আজ সারা বিশ্বের খবর ও বিনোদন পাওয়া যায়।

কিন্তু মুদ্রার যেমন উল্টো পিঠ থাকে, বিজ্ঞানেরও আছে। মানুষের লোভ আর অবিবেচনা বিজ্ঞানকে অভিশাপে পরিণত করেছে:

  • ধ্বংসলীলা: বিজ্ঞান মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে পরমাণু বোমা, হাইড্রোজেন বোমা ও বিষাক্ত জীবাণু অস্ত্র। হিরোশিমা ও নাগাসাকির কান্না আজও থামেনি। এক লহমায় পৃথিবী ধ্বংস করার ক্ষমতা আজ মানুষের হাতে।
  • পরিবেশ দূষণ: কলকারখানা আর গাড়ির ধোঁয়ায় বাতাস বিষাক্ত হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণে মাটি ও জল নষ্ট হচ্ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্বউষ্ণায়নের ফলে পৃথিবী বিপন্ন।
  • যান্ত্রিকতা ও বেকারত্ব: যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষকে অলস ও আবেগহীন করে তুলছে। আবার কম্পিউটারের ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাজের সুযোগ কমছে, বাড়ছে বেকারত্ব।

বিজ্ঞান নিজে ভালোও নয়, মন্দও নয়—এটি একটি শক্তি মাত্র। ছুরি দিয়ে ডাক্তার যেমন অপারেশন করে প্রাণ বাঁচান, তেমনি খুনি মানুষ মারে। দোষ ছুরির নয়, ব্যবহারকারীর। আমাদের মনে রাখতে হবে, “Science is a good servant but a bad master.”

বিজ্ঞানের জয়রথকে থামানো যাবে না, থামানো উচিতও নয়। তবে তার রাশ আমাদের হাতে রাখতে হবে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাজ হলো বিজ্ঞানকে ধ্বংসের কাজে ব্যবহার না করে, মানবকল্যাণে ব্যবহার করা। যেদিন আমরা বিজ্ঞান ও বিবেককে এক করতে পারব, সেদিনই পৃথিবী সত্যিকারের স্বর্গে পরিণত হবে।

বাংলা রচনা: বিজ্ঞান ও কুসংস্কার – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

বাংলা রচনা: বিজ্ঞান ও কুসংস্কার – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ

(বিকল্প নাম: কুসংস্কার দূরীকরণে ছাত্রসমাজ / বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার)

“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো!…”

আজ একশবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা বিজ্ঞানের জয়জয়কার দেখছি। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মঙ্গলে যান পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি এই বিজ্ঞানের যুগেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে আছে কুসংস্কার। কুসংস্কার হলো মনের অন্ধকার, যা যুক্তির আলোকে ভয় পায়। বিজ্ঞান ও কুসংস্কার দুটি বিপরীত মেরু—যেখানে বিজ্ঞান আছে, সেখানে কুসংস্কার থাকার কথা নয়।

কুসংস্কার মানে হলো যুক্তিহীন অন্ধ বিশ্বাস। কার্যকারণ সম্পর্ক বিচার না করে কোনো ঘটনাকে অলৌকিক বা দৈব বলে মেনে নেওয়াই হলো কুসংস্কার। পথে বিড়াল দেখলে থমকে দাঁড়ানো, হাঁচি দিলে যাত্রানাস্তি, তাবিজ-কবচ ধারণ, ডাইনিতন্ত্রে বিশ্বাস, সাপে কামড়ালে ওঝা ডাকা—এসবই কুসংস্কারের উদাহরণ। শিক্ষার আলো যেখানে পৌঁছায়নি, সেখানেই কুসংস্কারের দাপট বেশি।

আজকের মানুষ অদ্ভুত দ্বিমুখী আচরণ করে। পকেটে আধুনিক স্মার্টফোন, ঘরে ইন্টারনেট, চিকিৎসার জন্য আধুনিক হাসপাতাল—সবই বিজ্ঞানের দান। অথচ সেই মানুষই আবার পরীক্ষার আগে ‘ডিম’ খেতে ভয় পায় বা অসুখ হলে ঝাড়ফুঁক করায়। বিজ্ঞান আমাদের আরাম দিয়েছে, কিন্তু সবার মনে বিজ্ঞানমনস্কতা বা যুক্তিবাদী মন তৈরি করতে পারেনি। এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের অগ্রগতির প্রধান বাধা।

কুসংস্কার শুধু হাস্যকর নয়, অনেক সময় তা প্রাণঘাতীও হয়। সাপে কামড়ালে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। ডাইনি সন্দেহে অনেক নিরপরাধ নারীকে হত্যা করার ঘটনাও খবরের কাগজে দেখা যায়। কুসংস্কার মানুষকে ভীরু করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়।

সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে বিজ্ঞানের আলো ছড়াতে হবে:

  • প্রকৃত শিক্ষা: শুধু বই মুখস্থ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
  • সচেতনতা বৃদ্ধি: বিজ্ঞান মঞ্চ, সেমিনার এবং প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে অলৌকিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।
  • চিকিৎসা ব্যবস্থা: গ্রামে গঞ্জে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাড়াতে হবে যাতে মানুষ ওঝার কাছে না যায়।

ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারি। তাদের নিজেদের মন থেকে আগে কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে হবে। তারপর পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করতে হবে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘বিজ্ঞান ও যুক্তি’ বিষয়ক পথনাটিকা বা আলোচনার মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারে। কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটলে তার পেছনের আসল বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে বের করে সবাইকে জানাতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন, সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে।” সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মন থেকে কুসংস্কারের অন্ধকার দূর না করলে দেশের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব। এসো, আমরা শপথ নিই—কুসংস্কারের অন্ধকার সরিয়ে যুক্তির আলোয় সমাজকে আলোকিত করব।