ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ধারা | WBBSE Class 6 History Chapter 3 Question Answer
ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায় 'ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ধারা' (মেহেরগড় ও হরপ্পা সভ্যতা) এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।
প্রথম পর্যায়: সভ্যতার বিকাশ
১. নতুন পাথরের যুগে মানুষের জীবনে কী কী বড়ো পরিবর্তন এসেছিল?
উত্তর: মানুষ কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু করে এবং স্থায়ী বসতবাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে শেখে।
২. সমাজে নিয়ম বা নিয়মের শাসনের প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
উত্তর: জমির অধিকার নিয়ে মানুষের মধ্যে লড়াই শুরু হলে নিজেদের বিবাদ মেটাতে এবং শান্তিতে বসবাস করতে নিয়মের শাসন চালু হয়।
৩. জিনিস কেনাবেচা সহজ করার জন্য কীসের প্রচলন হয়?
উত্তর: সেকালের মুদ্রার প্রচলন হয়।
৪. সভ্যতা বলতে মূলত কী বোঝায়?
উত্তর: গ্রাম ও নগর কেন্দ্রিক উন্নত জীবনযাপন, শাসন কাঠামো, শিল্প-স্থাপত্য এবং লিপির ব্যবহারকে একসঙ্গে সভ্যতা বলা হয়।
৫. সভ্যতার সবথেকে বড়ো মাপকাঠি কী?
উত্তর: লিপিমালার ব্যবহার।
৬. নগর সভ্যতায় সমাজের কী পরিবর্তন ঘটেছিল?
উত্তর: সমাজে সমতার ধারণা নষ্ট হয়ে শাসক গোষ্ঠী তৈরি হয় এবং নানা পেশার ভিত্তিতে ভেদাভেদ তৈরি হয়।
৭. সভ্যতার একটি বড়ো বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: সুযোগ-সুবিধার জন্য একে অন্যের ওপর বা বিভিন্ন পেশার মানুষের পারস্পরিক নির্ভর করা।
৮. নগরের বাসিন্দারা কার ওপর নির্ভর করত?
উত্তর: খাদ্যশস্যের জন্য গ্রামের ফসলের ওপর নির্ভর করত।
দ্বিতীয় পর্যায়: মেহেরগড় সভ্যতা
৯. তামা-পাথরের যুগ কাকে বলে?
উত্তর: যখন পাথরের পাশাপাশি তামা ও কাঁসার ব্যবহার শুরু হয়েছিল কিন্তু লোহার ব্যবহার জানা ছিল না, তাকে তামা-পাথরের যুগ বলে।
১০. মেহেরগড় সভ্যতা কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: বর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে বোলান গিরিপথের কাছে।
১১. মেহেরগড় সভ্যতা কবে এবং কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজে (রিচার্ড মেডো-র সাহায্যে) আবিষ্কার করেন।
১২. মেহেরগড়ের প্রথম পর্বের (৭০০০-৫০০০ খ্রিঃপূঃ) প্রধান ফসল কী ছিল?
উত্তর: গম ও যব।
১৩. প্রথম পর্বে মেহেরগড়ের মানুষ কী কী পশু পালন করত?
উত্তর: ছাগল, ভেড়া ও কুঁজওয়ালা ষাঁড়।
১৪. উপমহাদেশের সব থেকে পুরোনো শস্য মজুত রাখার বাড়ি কোথায় পাওয়া গেছে?
উত্তর: মেহেরগড়ে।
১৫. মেহেরগড়ের দ্বিতীয় পর্বে (৫০০০-৪০০০ খ্রিঃপূঃ) কোন নতুন ফসলের চাষ শুরু হয়?
উত্তর: কার্পাস চাষ।
১৬. পৃথিবীর সবথেকে পুরোনো কার্পাস চাষের নমুনা কোথায় মিলেছে?
উত্তর: মেহেরগড়ে।
১৭. কুমোরের চাকার ব্যবহার মেহেরগড়ে কবে শুরু হয়?
উত্তর: দ্বিতীয় পর্বের একেবারে শেষের দিকে।
১৮. মেহেরগড়ের তৃতীয় পর্বে (৪৩০০-৩৮০০ খ্রিঃপূঃ) মাটির পাত্রের কী পরিবর্তন হয়?
উত্তর: পাত্রগুলি চুল্লিতে পুড়িয়ে সেগুলির গায়ে একরঙা, দুইরঙা ও বহুরঙা নকশা আঁকা শুরু হয়।
১৯. মেহেরগড়ে মৃতদেহকে কীভাবে সমাধি দেওয়া হতো?
উত্তর: মৃতদেহকে সোজাসুজি বা কাত করে শুইয়ে লাল কাপড় জড়িয়ে ও লাল রং মাখিয়ে সমাধি দেওয়া হতো।
২০. সমাধিতে মৃতের সঙ্গে আর কী কী দেওয়া হতো?
উত্তর: শাঁখ বা পাথরের গয়না, কুড়ুল, মূল্যবান পাথর এবং নানা গৃহপালিত পশু।
তৃতীয় পর্যায়: হরপ্পা সভ্যতা (আবিষ্কার ও বিস্তার)
২১. হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো কবে আবিষ্কৃত হয়?
উত্তর: ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে হরপ্পা এবং ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয়।
২২. হরপ্পা সভ্যতা প্রথম কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: দয়ারাম সাহানি।
২৩. মহেঞ্জোদারো কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
২৪. শুরুতে হরপ্পা সভ্যতার নাম কী ছিল এবং কেন?
উত্তর: শুরুতে নাম ছিল 'সিন্ধু সভ্যতা', কারণ প্রথম কেন্দ্র দুটি সিন্ধু উপত্যকায় অবস্থিত ছিল।
২৫. হরপ্পা সভ্যতাকে 'প্রায়-ইতিহাস যুগের সভ্যতা' বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ এই সভ্যতার মানুষ লিখতে জানলেও তাদের লিপি আজও পড়া যায়নি, তাই প্রত্নবস্তুর ওপর ভিত্তি করেই এর ইতিহাস জানতে হয়।
২৬. হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল কত?
উত্তর: মোটামুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত।
২৭. হরপ্পা সভ্যতার বিস্তৃতি কতদূর ছিল?
উত্তর: উত্তরে জম্মুর মাণ্ডা থেকে দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের দৈমাবাদ এবং পশ্চিমে বালুচিস্তান থেকে পূর্বে আলমগিরপুর (দিল্লি) পর্যন্ত।
হরপ্পার নগর পরিকল্পনা
২৮. ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নগরায়ণ কোথায় ঘটেছিল?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতায়।
২৯. 'সিটাডেল' কী?
উত্তর: হরপ্পা নগরগুলির উঁচু এলাকায় বানানো ঢিবির ওপর ঘেরা অংশকে সিটাডেল বলা হতো, যেখানে জরুরি ইমারতগুলি থাকত।
৩০. হরপ্পার কোন নগরে সিটাডেল ছিল না?
উত্তর: চানহুদারোতে।
৩১. মহেঞ্জোদারোর স্নানাগারটির মাপ কত ছিল?
উত্তর: লম্বায় ১৮০ ফুট ও চওড়ায় ১০৮ ফুট।
৩২. হরপ্পায় শস্য রাখার বাড়িটিতে কটি তাক ছিল?
উত্তর: দুই সারিতে ভাগ করা মোট বারোটা বড়ো তাক ছিল।
৩৩. হরপ্পার রাস্তাঘাট কেমন ছিল?
উত্তর: পাকা, চওড়া রাস্তাগুলি উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ছিল, ফলে নগরের নকশাগুলি চৌকো আকারের হতো।
৩৪. হরপ্পার জল নিকাশি ব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: প্রতিটি বাড়িতে শৌচাগার ও কুয়ো ছিল। বাড়ির ছোটো নালাগুলি গিয়ে বড়ো ও ঢাকা দেওয়া নর্দমায় মিশত।
হরপ্পার কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য
৩৫. হরপ্পায় ধান চাষের প্রমাণ কোথায় পাওয়া গেছে?
উত্তর: গুজরাটের রংপুর ও লোথালে।
৩৬. কালিবঙ্গানে কৃষিকাজের কী প্রমাণ মিলেছে?
উত্তর: কাঠের লাঙলের ফলার দাগ পাওয়া গেছে।
৩৭. হরপ্পার মানুষ কোন পশুর ব্যবহার জানত না?
উত্তর: ঘোড়ার ব্যবহার জানত না।
৩৮. হরপ্পার কারিগরি শিল্পে কোন ধাতুর ব্যবহার হতো না?
উত্তর: লোহার ব্যবহার।
৩৯. 'লাল-কালো মাটির পাত্র' কী?
উত্তর: হরপ্পায় কিছু মাটির পাত্রের গায়ে চকচকে লাল পালিশ লাগিয়ে তার ওপর কালো রঙের নকশা আঁকা হতো, এগুলিকে লাল-কালো মাটির পাত্র বলে।
৪০. হরপ্পার সিলমোহরগুলি কেমন ছিল?
উত্তর: বেশিরভাগ নরম পাথর কেটে তৈরি, যাতে একশিংওলা প্রাণী, ষাঁড় বা জ্যামিতিক নকশার উলটো ছাপ খোদাই করা থাকত।
৪১. লোথাল কেন বিখ্যাত ছিল?
উত্তর: লোথাল ছিল ভোগাবোর নদীর তীরে অবস্থিত হরপ্পা সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-নগর, যেখানে জাহাজঘাটার নমুনা মিলেছে।
৪২. কোন সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পার জলপথে বাণিজ্য চলত?
উত্তর: মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সঙ্গে।
৪৩. হরপ্পায় স্থলপথে যাতায়াতের জন্য কী ব্যবহার করা হতো?
উত্তর: বলদ, গাধা ও উটে টানা দু-চাকার গাড়ি।
হরপ্পার ধর্ম ও পতন
৪৪. হরপ্পায় মাতৃপুজোর প্রমাণ কী?
উত্তর: প্রচুর পোড়ামাটির নারীমূর্তি পাওয়া গেছে, যার থেকে মনে করা হয় মাতৃপুজোর চল ছিল।
৪৫. হরপ্পার সিলমোহরে থাকা যোগী মূর্তিকে অনেকে কী মনে করতেন?
উত্তর: পশুপতি শিবের আদি রূপ।
৪৬. হরপ্পার মানুষ কোন গাছের পুজো করত?
উত্তর: অশ্বত্থ গাছের।
৪৭. হরপ্পায় মৃতদেহ কীভাবে রাখা হতো?
উত্তর: মাথা উত্তর দিকে করে শুইয়ে রাখা হতো এবং সঙ্গে গয়না ও মাটির পাত্র দেওয়া হতো।
৪৮. হরপ্পার লিপিতে কতগুলি চিহ্ন ছিল?
উত্তর: ৩৭৫ থেকে ৪০০টির মতো সাংকেতিক চিহ্ন ছিল।
৪৯. হরপ্পার লিপি কীভাবে লেখা হতো?
উত্তর: ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে লেখা হতো।
৫০. হরপ্পা সভ্যতার পতন কবে শুরু হয়?
উত্তর: খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দের পর থেকে।
৫১. মহেঞ্জোদারোর উঁচু পাঁচিলে কাদার চিহ্ন কীসের প্রমাণ দেয়?
উত্তর: সিন্ধুনদের বিধ্বংসী বন্যার প্রমাণ দেয়, যা নগরের ক্ষতি করেছিল।
৫২. হরপ্পার কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কেন?
উত্তর: খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ অব্দ নাগাদ বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে শুষ্ক জলবায়ু দেখা দেওয়ায় কৃষিকাজ ব্যাহত হয়।
৫৩. ইট পোড়ানোর জন্য ব্যাপক গাছ কাটার ফল কী হয়েছিল?
উত্তর: পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে গিয়েছিল।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...