বাংলা রচনা: বিজ্ঞানের ভালো ও মন্দ – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ
বাংলা রচনা: বিজ্ঞানের ভালো ও মন্দ – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ - সহজ ভাষায় লেখা সম্পূর্ণ উত্তর ও আলোচনা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য সেরা গাইড। Vision Institute থেকে পড়ে নাও।
প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান / বিজ্ঞান: আশীর্বাদ না অভিশাপ
“বিস্ময় তাই জাগে, মানুষের জাদুমন্ত্রে জগত আজ হাতের মুঠোয় লাগে।”
১ ভূমিকা
আদিম মানুষ একসময় গুহায় বাস করত, কাঁচা মাংস খেত। আজ সেই মানুষই বিজ্ঞানের জাদুকরী স্পর্শে মহাকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত—আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত বিজ্ঞানের দানে ঘেরা। বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক জীবন এক মুহূর্তও অচল। বিজ্ঞান মানুষের হাতে অসীম ক্ষমতা তুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার ব্যবহার আমরা কীভাবে করছি, তার ওপর নির্ভর করছে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ।
২ আশীর্বাদ রূপে বিজ্ঞান (সুফল)
বিজ্ঞান মানবসভ্যতার পরম বন্ধু। এর সুফল সবদিকে ছড়িয়ে আছে:
- চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য: একসময় মহামারী বা সাধারণ অসুখে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। আজ পেনিসিলিন থেকে শুরু করে আধুনিক সার্জারি, এক্স-রে, এমআরআই (MRI) এবং দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিষেধক মানুষের গড় আয়ু অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন আজ বিজ্ঞানের আশ্চর্য দান।
- যোগাযোগ ব্যবস্থা: চাকা আবিষ্কার দিয়ে যে যাত্রার শুরু, আজ তা দ্রুতগামী ট্রেন, বিমান ও মহাকাশযানে পৌঁছেছে। টেলিফোন, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের মাধ্যমে পৃথিবী আজ ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। পলকের মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব।
- কৃষি ও শিল্প: আধুনিক ট্রাক্টর, গভীর নলকূপ, উন্নত হাইব্রিড বীজ ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারে কৃষিতে সবুজ বিপ্লব এসেছে। ফলে কোটি কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় কলকারখানায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিপুল পরিমাণে তৈরি হয়ে জীবনযাত্রা সহজ করেছে।
- দৈনন্দিন জীবন ও বিনোদন: বিদ্যুৎ, আলো, পাখা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কম্পিউটার, বিনোদন মাধ্যম—সবই বিজ্ঞানের বরদান। ঘরের কোণে বসেই আজ সারা বিশ্বের শিক্ষামূলক তথ্য ও বিনোদন হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়।
৩ অভিশাপ রূপে বিজ্ঞান (কুফল)
কিন্তু মুদ্রার যেমন উল্টো পিঠ থাকে, বিজ্ঞানেরও একটি কালো দিক আছে। তবে এই অভিশাপের জন্য বিজ্ঞান নিজে দায়ী নয়, দায়ী মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা ও নৈতিকতাহীন স্বার্থপরতা:
- মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র ও ধ্বংসলীলা: বিজ্ঞান মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে পরমাণু বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও বিষাক্ত রাসায়নিক-জীবাণু অস্ত্র। হিরোশিমা ও নাগাসাকির নারকীয় ট্র্যাজেডি বিজ্ঞানের অপব্যবহারের চরম নিদর্শন। সামান্য ভুলে মুহূর্তেই পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হতে পারে।
- পরিবেশ দূষণ ও উষ্ণায়ন: অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহারে আজ বায়ু, জল ও মাটি মারাত্মক দূষিত। নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
- যান্ত্রিকতা ও আলস্য: প্রযুক্তি মানুষকে ক্রমশ যন্ত্রনির্ভর ও কর্মবিমুখ করে তুলছে। অতিরিক্ত মুঠোফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে তরুণ প্রজন্ম শারীরিক শ্রম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, মানবিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহানুভূতি হ্রাস পাচ্ছে।
৪ বিজ্ঞান ও মানবিকতা
বিজ্ঞান নিজে ভালোও নয়, মন্দও নয়—এটি একটি অসীম শক্তি মাত্র। ছুরি দিয়ে ডাক্তার যেমন অপারেশন করে প্রাণ বাঁচান, আবার সেই ছুরি দিয়েই অপরাধী নরহত্যা করে। দোষ ছুরির নয়, পরিচালকের। ঠিক তেমনই বিজ্ঞানের শক্তিকে যখন শুভ মানবিক বোধ ও সমাজকল্যাণে লাগানো হয়, তখন তা আশীর্বাদ; কিন্তু স্বার্থপরতায় অন্ধ হয়ে বিধ্বংসী কাজে ব্যবহার করলে তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন— "ধর্মহীন বিজ্ঞান পঙ্গু, আর বিজ্ঞানহীন ধর্ম অন্ধ।"
৫ উপসংহার
বিজ্ঞানের জয়রথকে থামানো যাবে না, থামানো উচিতও নয়। তবে তার রাশ আমাদের হাতে রাখতে হবে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য বিজ্ঞানকে মানবকল্যাণে প্রয়োগ করা। মারণাস্ত্র তৈরি বন্ধ করে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও রোগমুক্ত বিশ্ব গড়াই হোক বিজ্ঞানের পরম ব্রত। তবেই বিজ্ঞান প্রকৃত অর্থে মানবজাতির শাশ্বত আশীর্বাদ হয়ে থাকবে।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...