'কোনি' উপন্যাসের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর গাইড: ৫ নম্বরের সেরা প্রশ্ন ও চরিত্র বিশ্লেষণ
মাধ্যমিক পরীক্ষায় সহায়ক পাঠ 'কোনি' উপন্যাস থেকে ৩টি প্রশ্ন থাকে এবং ২টি ৫ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় (মোট: ১০ নম্বর)। পরীক্ষায় ফুল মার্কস পাওয়ার জন্য ক্ষিতীশ সিংহের চরিত্র, কোণির জীবনসংগ্রাম ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি ভিত্তিক প্রশ্নোত্তরের সেরা সমাধান।
প্রশ্ন ১: 'কোনি' উপন্যাস অবলম্বনে সাঁতার প্রশিক্ষক ক্ষিতীশ সিংহের চরিত্র বিশ্লেষণ করো। (মান: ৫)
উত্তর: মতি নন্দীর ক্রীড়াভিত্তিক উপন্যাস 'কোনি'-র মূল চালিকাশক্তি ও কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হলেন সাঁতার প্রশিক্ষক ক্ষিতীশ সিংহ, যিনি সবার কাছে 'ক্ষিতদা' নামে পরিচিত। উপন্যাসটিতে তাঁর চরিত্রের কয়েকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে:
- ১. জহুরির চোখ ও প্রতিভা অন্বেষণ: গঙ্গার ঘাটে আম কুড়োনোর জন্য এক কৃশকায়া দরিদ্র মেয়েকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটতে দেখেই ক্ষিতীশ চিনে নিয়েছিলেন তার ভেতরের অদম্য আগুন ও সাঁতারু হওয়ার দুর্লভ ক্ষমতাকে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সাধারণ কোণিকে চ্যাম্পিয়ন তৈরির সংকল্প নেন।
- ২. আপসহীন নিষ্ঠা ও কঠোর শৃঙ্খলা: জুপিটার ক্লাবের সংকীর্ণ দলাদলি ও অপমান তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি কোণিকে প্রতিদিন ভোরবেলায় কঠোর নিয়মে জলে নামিয়েছেন। ক্লান্তি, কান্না বা অজুহাতকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। শিষ্যকে নিখুঁত করতে তিনি নিজে কঠিনতম সাধনা করেছেন।
- ৩. পিতৃস্নেহ ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ: বাইরের কঠোর আবরণের নিচে ক্ষিতীশের অন্তরে ছিল স্নেহের ফল্গুধারা। কোণির পরিবারের চরম দারিদ্র্যের কথা জেনে তিনি নিজে অর্থ সাহায্য করেছেন, কোণির খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন এবং নিজের পরিবারের আর্থিক টানাটানি সত্ত্বেও কোণির প্রশিক্ষণে কোনো খামতি রাখেননি।
- ৪. প্রেরণাদাতা: মাদ্রাজ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কোণি যখন চক্রান্তের শিকার হয়ে ভেঙে পড়েছিল, তখন ক্ষিতীশের সেই অমর মন্ত্র—"ফাইট কোনি ফাইট" তাকে বিশ্বজয়ের শক্তি জুগিয়েছিল।
উপসংহার: ক্ষিতীশ সিংহ কেবল একজন সাধারণ সাঁতার প্রশিক্ষক নন, তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা ভাস্কর—যিনি সমাজের অবহেলিত ধূলিকণা থেকে এক রত্ন তৈরি করেছিলেন।
প্রশ্ন ২: “দারিদ্র্য আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে কোণির যে লড়াই—তা সংক্ষেপে বর্ণনা করো।” (মান: ৫)
উত্তর: 'কোনি' উপন্যাসে মতি নন্দী দেখিয়েছেন কীভাবে একজন বস্তির নিঃস্ব মেয়ে দারিদ্র্য ও সমাজের ষড়যন্ত্রের পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছিল:
- দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই: কোণির পরিবার ছিল চরম অভাবগ্রস্ত। সাত ভাইবোনের সংসার, পিতা টিবি রোগে মারা গিয়েছিলেন। বড়ো ভাই কমলের সামান্য উপার্জনে কোনোমতে সংসার চলত। পরে কমলের অকালমৃত্যুতে পরিবারটির উপোস করার মতো অবস্থা হয়। সেই অভুক্ত পেট আর অপুষ্টি নিয়েও কোণি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছে।
- সামাজিক অবহেলা ও অপমান: নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে বলে সমাজের ভদ্রলোকদের ক্লাব 'জুপিটার' তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তাকে ট্রামে-বাসে হেনস্থা হতে হয়েছে। কিন্তু কোণি কোনো অপমানে মাথা নত করেনি; তার চোখের জলকে সে বারুদে পরিণত করেছিল।
- ক্রীড়া চক্রান্তের বিরুদ্ধে জয়: জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের দলে কোণিকে নির্বাচন না করার জন্য জুপিটার ক্লাবের কর্তারা নোংরা রাজনীতি ও ষড়যন্ত্র করেছিলেন। বেঙ্গল টিমের ম্যানেজার ও অন্য সাঁতারুরা তাকে একঘরে করে রেখেছিল। কিন্তু ফাইনালে নেমে সব অপমান ও লাঞ্ছনার জবাব কোণি দিয়েছিল সোনা জিতে।
এইভাবে কোণি কেবল সাঁতারের রেস জেতেনি, সে প্রতিকূল ভাগ্যের বিরুদ্ধে মানবাত্মার অপরাজেয় লড়াইয়ে জয়ী হয়েছিল।
প্রশ্ন ৩: “তোর আসল লজ্জা জলে, আসল গর্বও জলে।”—কে, কাকে কেন এই কথা বলেছিল? তাৎপর্য লেখো। (মান: ১+১+৩ = ৫)
বক্তা ও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি: উদ্ধৃত কথাটি মতি নন্দীর 'কোনি' উপন্যাসে সাঁতার প্রশিক্ষক ক্ষিতীশ সিংহ তাঁর শিষ্যা কোণিকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন।
প্রসঙ্গ ও তাৎপর্য: কোণি যখন ট্রেনার ক্ষিতীশের কথামতো শরীরচর্চা ও পোশাক পরার ব্যাপারে সংকোচ বোধ করছিল এবং সাধারণ মানুষের দৃষ্টির কারণে লজ্জা পাচ্ছিল, তখন ক্ষিতীশ এই গভীর সত্যটি তাকে বুঝিয়ে দেন।
ক্ষিতীশ কোণিকে মনে করিয়ে দেন যে একজন খেলোয়াড়ের কাছে বাইরের জগতের কে কী ভাবল, বা কে কী পোশাক পরল—তাতে কোনো লজ্জা বা গর্বের বিষয় নেই। একজন সাঁতারুর আসল ক্ষেত্র হলো সুইমিং পুলের জল। জলে নেমে যদি সে হেরে যায়, তবে সেটাই তার চরম লজ্জা। আর জলে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে যদি সে জয় ছিনিয়ে আনে, তবে সেটাই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ গৌরব ও সম্মান। এই উপদেশের মাধ্যমে ক্ষিতীশ কোণির মন থেকে লোকলজ্জার ভীরুতা দূর করে তাকে এক একনিষ্ঠ সাধিকায় রূপান্তরিত করেছিলেন।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...