বাংলা রচনা: বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ
বাংলা রচনা: বাংলার ঋতু বৈচিত্র্য – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ - সহজ ভাষায় লেখা সম্পূর্ণ উত্তর ও আলোচনা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য সেরা গাইড। Vision Institute থেকে পড়ে নাও।
ষড়ঋতুর দেশ / বাংলার প্রকৃতি
“ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে, মরি হায়, হায় রে—”
১ ভূমিকা
বাংলা যেন প্রকৃতির এক অপরূপ লীলাভূমি। বিশ্বের খুব কম দেশেই বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রকৃতির রূপ এমন বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। বাংলায় প্রতি দু-মাস অন্তর ঋতু বদলায়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—এই ছয়টি ঋতু যেন তাদের নিজস্ব রূপ, রং ও সাজপোশাক নিয়ে বাংলার বুকে এক অবিরাম রঙের মেলা বসিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের গানে ও কবিতায় এই রূপের নিখুঁত বর্ণনা ধরা পড়েছে বারবার।
২ গ্রীষ্মকাল (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ)
বছরের শুরু হয় গ্রীষ্ম দিয়ে। প্রখর রোদ, উত্তপ্ত বাতাস আর তপ্ত দুপুরে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। নদী-নালা শুকিয়ে ওঠে। কিন্তু এই রুদ্র রূপের মাঝেই গ্রীষ্ম আমাদের দেয় মিষ্টি রসালো ফল—আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু আর তরমুজ। কালবৈশাখীর শীতল ঝড়-বৃষ্টির পর প্রকৃতি যেন নতুন জীবনের আশ্বাস পায়।
৩ বর্ষাকাল (আষাঢ়-শ্রাবণ)
গ্রীষ্মের দাবদাহ জুড়িয়ে দিতে ময়ূরের পেখম তুলে আসে বর্ষা। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়, শুরু হয় রিমঝিম অবিরাম ধারা। নদী-নালা জলে উপচে পড়ে। মাঠে মাঠে কৃষকদের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, শুরু হয় ধানের চারা রোপণের কাজ। কদম, জুঁই আর কেতকীর মিষ্টি সৌরভে ভিজে ওঠে বাংলার মাটি। ইলিশের স্বাদে মুখরিত হয় বাঙালির হেঁশেল।
৪ শরৎকাল (ভাদ্র-আশ্বিন)
বর্ষার ঘন মেঘ সরে গিয়ে আকাশে ভাসে পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘের ভেলা। নদীর বাঁকে বাঁকে বাতাসে দোলে সাদা কাশফুল। ভোরের ঘাসে শিশিরবিন্দু আর শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধে বাঙালি মেতে ওঠে বছরের সেরা উৎসব—শারদোৎসবে। মা দুর্গার আগমনে সমগ্র বাংলা আনন্দ ও মিলনের আলোয় ভরে ওঠে।
৫ হেমন্তকাল (কার্তিক-অগ্রহায়ণ)
শরতের পরেই পা টিপে আসে হেমন্ত। এই ঋতু অনেকটা শান্ত ও মিতভাষী। মাঠে মাঠে সোনালি ধানের শিষ দোল খায়। গ্রামবাংলা মেতে ওঠে নতুন ধান কাটার মহোৎসবে। ঘরে ঘরে শুরু হয় নবান্ন উৎসব—নতুন চালের পায়েস আর পিঠেপুলির সুবাসে ভরে ওঠে পল্লীসমাজ। ঘাসের ডগায় জমে ওঠে হিমেল শিশিরকণা।
৬ শীতকাল (পৌষ-মাঘ)
হেমন্তের শেষে উত্তুরে হাওয়ার ডানায় ভর করে আসে শীতকাল। ভোরের কুয়াশার চাদর সরিয়ে মিষ্টি রোদ ওঠে। এই ঋতুতে বাংলার মেঠোপথে ফোটে সর্ষে ফুল, বাগান ভরে ওঠে ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা আর গোলাপের বাহারি সাজে। কড়াইশুঁটি, নতুন গুড়, পৌষমেলা আর বনভোজনের অনাবিল আনন্দে বাঙালি শীতকে সাদরে বরণ করে নেয়।
৭ বসন্তকাল (ফাল্গুন-চৈত্র)
সবশেষে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। শীতের শুষ্কতা বিদায় নিয়ে গাছে গাছে গজিয়ে ওঠে কচি কিশলয়। আমের বোলে ম ম করে বাতাস। পলাশ, শিমুল ও কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে রেঙে ওঠে কানন। কোকিলের কুহু তানে মুখরিত হয় আম্রকুঞ্জ। রঙের উৎসব দোলযাত্রায় সমস্ত মানুষ একে অপরকে ভালোবাসার আবীরে রাঙিয়ে তোলে।
৮ উপসংহার
বাংলার ছয়টি ঋতু যেন ছয়টি স্বতন্ত্র সুরে বাঁধা অনন্য এক সিম্ফনি। তারা আসে, তাদের জাদুর ডালা উজাড় করে দেয় এবং বিদায় নেয়। ঋতুচক্রের এই চিরন্তন আবর্তন শুধু বাংলার প্রকৃতিকেই সমৃদ্ধ করে না, বাঙালির মনন, সংস্কৃতি ও উৎসবকে চিরসবুজ করে রাখে। রূপসী বাংলার এই রূপ-ঐশ্বর্যই আমাদের অহংকার।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...