বাংলা রচনা: বিজ্ঞান ও কুসংস্কার – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ
বাংলা রচনা: বিজ্ঞান ও কুসংস্কার – ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবন্ধ - সহজ ভাষায় লেখা সম্পূর্ণ উত্তর ও আলোচনা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য সেরা গাইড। Vision Institute থেকে পড়ে নাও।
কুসংস্কার দূরীকরণে ছাত্রসমাজ / বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার
“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো!…”
১ ভূমিকা
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর জয়যাত্রা দেখছি। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মঙ্গলে রোবট পাঠিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসাধ্য সাধন করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিজ্ঞানের এই আলোকোজ্জ্বল যুগেও আমাদের সমাজ কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও অমূলক ভয়ের অন্ধকার থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের এই দ্বন্দ্ব আজও সভ্যতার সামনে এক বড়ো চ্যালেঞ্জ।
২ কুসংস্কার কী ও তার স্বরূপ
কুসংস্কার হলো অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন ও যুক্তিহীন অন্ধ বিশ্বাস। কোনো ঘটনার বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ বিচার না করে তাকে কাল্পনিক অলৌকিক বা দৈব শক্তি বলে মেনে নেওয়াই কুসংস্কার। যেমন—রাস্তায় বিড়াল পার হলে অশুভ মনে করা, গ্রহদোষ কাটানোর নামে দামি পাথর পরা, চন্দ্রগ্রহণের সময় খাদ্য গ্রহণ না করা কিংবা ডাইনি সন্দেহে অসহায় বৃদ্ধাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো।
৩ বিজ্ঞানমনস্কতা বনাম অন্ধবিশ্বাস
আজকের সমাজে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। মানুষ পকেটে আধুনিক স্মার্টফোন রাখে, রোগ নিরাময়ে অ্যান্টিবায়োটিক খায়, আবার সেই মানুষই পরীক্ষার সাফল্যের জন্য তাবিজ বাঁধে কিংবা জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হয়। গ্যাজেট ব্যবহার করলেই মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয় না; বিজ্ঞানমনস্কতা হলো একটি যুক্তিবাদী মনোভঙ্গী, যা প্রতিটি বিষয়কে পরীক্ষা, প্রমাণ ও যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করতে শেখায়।
৪ কুসংস্কারের কুফল
কুসংস্কার কেবল হাস্যকর নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী:
- সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে ওঝা বা গুণিনের কাছে নিয়ে যাওয়ায় বহু মানুষের অকালে মৃত্যু হয়।
- মানসিক রোগীদের ‘ভূতে ধরা’ বলে ঝাঁটাপেটা করা ও শিকল দিয়ে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
- গ্রামাঞ্চলে আজও নির্দোষ নারীদের ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
- অন্ধ কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে ভণ্ড সাধু, জ্যোতিষী ও তান্ত্রিকেরা সাধারণ মানুষের অর্থ ও সম্ভ্রম লুট করে চলেছে।
৫ কুসংস্কার দূরীকরণে বিজ্ঞানের ভূমিকা
কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করার একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার হলো বিজ্ঞানভিত্তিক চেতনা:
- যুক্তিনির্ভর শিক্ষা: শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা জাগ্রত করতে হবে।
- কুসংস্কারের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: গ্রহণ কোনো রাহু কর্তৃক গ্রাস নয়—চাঁদ ও পৃথিবীর ছায়ার খেলা; সাপের বিষে ওঝার কোনো হাত নেই—চিকিৎসকের অ্যান্টিভেনামই একমাত্র প্রতিষেধক; এই সহজ সত্যগুলো মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে হবে।
৬ ছাত্রসমাজের ভূমিকা
তরুণ ছাত্রসমাজই দেশের আসল পরিবর্তনের কান্ডারি। ছাত্ররা তাদের নিজেদের পরিবার ও পাড়া থেকেই এই লড়াই শুরু করতে পারে। কুসংস্কার দূরীকরণ পদযাত্রা, বিজ্ঞান মেলা, পথনাটিকা ও বিতর্ক সভার আয়োজন করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। বিজ্ঞানমঞ্চ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রক্তদান শিবির ও যুক্তিবাদী ভাবধারা প্রচার করতে হবে।
৭ উপসংহার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন— “যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন, সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে।” কুসংস্কার সমাজকে পিছিয়ে রাখে আর বিজ্ঞান সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সমাজকে বাঁচাতে হলে বিজ্ঞানের আলোয় অন্ধকারকে পরাস্ত করতেই হবে। কুসংস্কারমুক্ত, সুস্থ ও বৈজ্ঞানিক সমাজ গঠনে শপথ নেওয়াই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...