(বিকল্প নাম: কুসংস্কার দূরীকরণে ছাত্রসমাজ / বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার)
বিজ্ঞান ও কুসংস্কার
“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো!…”
ভূমিকা:
আজ একশবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা বিজ্ঞানের জয়জয়কার দেখছি। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মঙ্গলে যান পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রদীপের নিচে যেমন অন্ধকার থাকে, তেমনি এই বিজ্ঞানের যুগেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে আছে কুসংস্কার। কুসংস্কার হলো মনের অন্ধকার, যা যুক্তির আলোকে ভয় পায়। বিজ্ঞান ও কুসংস্কার দুটি বিপরীত মেরু—যেখানে বিজ্ঞান আছে, সেখানে কুসংস্কার থাকার কথা নয়।
কুসংস্কার কী ও তার স্বরূপ:
কুসংস্কার মানে হলো যুক্তিহীন অন্ধ বিশ্বাস। কার্যকারণ সম্পর্ক বিচার না করে কোনো ঘটনাকে অলৌকিক বা দৈব বলে মেনে নেওয়াই হলো কুসংস্কার। পথে বিড়াল দেখলে থমকে দাঁড়ানো, হাঁচি দিলে যাত্রানাস্তি, তাবিজ-কবচ ধারণ, ডাইনিতন্ত্রে বিশ্বাস, সাপে কামড়ালে ওঝা ডাকা—এসবই কুসংস্কারের উদাহরণ। শিক্ষার আলো যেখানে পৌঁছায়নি, সেখানেই কুসংস্কারের দাপট বেশি।
বিজ্ঞানমনস্কতা বনাম অন্ধবিশ্বাস:
আজকের মানুষ অদ্ভুত দ্বিমুখী আচরণ করে। পকেটে আধুনিক স্মার্টফোন, ঘরে ইন্টারনেট, চিকিৎসার জন্য আধুনিক হাসপাতাল—সবই বিজ্ঞানের দান। অথচ সেই মানুষই আবার পরীক্ষার আগে ‘ডিম’ খেতে ভয় পায় বা অসুখ হলে ঝাড়ফুঁক করায়। বিজ্ঞান আমাদের আরাম দিয়েছে, কিন্তু সবার মনে বিজ্ঞানমনস্কতা বা যুক্তিবাদী মন তৈরি করতে পারেনি। এই বৈপরীত্যই আমাদের সমাজের অগ্রগতির প্রধান বাধা।
কুসংস্কারের কুফল:
কুসংস্কার শুধু হাস্যকর নয়, অনেক সময় তা প্রাণঘাতীও হয়। সাপে কামড়ালে হাসপাতালে না নিয়ে গিয়ে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়ার ফলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। ডাইনি সন্দেহে অনেক নিরপরাধ নারীকে হত্যা করার ঘটনাও খবরের কাগজে দেখা যায়। কুসংস্কার মানুষকে ভীরু করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়।
কুসংস্কার দূরীকরণে বিজ্ঞানের ভূমিকা:
সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে বিজ্ঞানের আলো ছড়াতে হবে:
- প্রকৃত শিক্ষা: শুধু বই মুখস্থ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: বিজ্ঞান মঞ্চ, সেমিনার এবং প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে অলৌকিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে।
- চিকিৎসা ব্যবস্থা: গ্রামে গঞ্জে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বাড়াতে হবে যাতে মানুষ ওঝার কাছে না যায়।
ছাত্রসমাজের ভূমিকা:
ছাত্ররাই দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারি। তাদের নিজেদের মন থেকে আগে কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে হবে। তারপর পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করতে হবে। গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘বিজ্ঞান ও যুক্তি’ বিষয়ক পথনাটিকা বা আলোচনার মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে পারে। কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটলে তার পেছনের আসল বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে বের করে সবাইকে জানাতে হবে।
উপসংহার:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন— “যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন, সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে।” সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মন থেকে কুসংস্কারের অন্ধকার দূর না করলে দেশের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব। এসো, আমরা শপথ নিই—কুসংস্কারের অন্ধকার সরিয়ে যুক্তির আলোয় সমাজকে আলোকিত করব।

