জল চক্র কী? চিত্র সহ বর্ণনা করো
মাধ্যমিক ভূগোল প্রশ্ন: জল চক্র (Water Cycle বা Hydrological Cycle) কাকে বলে? চিত্র সহ এর বিভিন্ন পর্যায়গুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো। মান: ৩ (বর্ণনা) + ২ (চিত্র) = ৫
১. জল চক্রের সংজ্ঞা (Definition of Water Cycle):
সৌরশক্তি ও পৃথিবীর অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে বারিমণ্ডল (জলভাগ), বায়ুমণ্ডল এবং অশ্মমণ্ডলের (স্থলভাগ) মধ্যে জলের বিভিন্ন ভৌতিক অবস্থায় (কঠিন, তরল ও গ্যাসীয়) যে অবিরাম, গতিশীল ও চক্রাকার আবর্তন চলতে থাকে, তাকে জল চক্র (Water Cycle বা Hydrological Cycle) বলে।
এই নিরবচ্ছিন্ন চক্রাকার আবর্তনের ফলে পৃথিবীতে জলের মোট পরিমাণের সামগ্রিক ভারসাম্য সর্বদা স্থির ও অপরিবর্তিত থাকে।
জল চক্র প্রধানত নিম্নলিখিত পাঁচটি মৌলিক ভৌগোলিক পর্যায়ের মাধ্যমে চক্রাকারে সম্পূর্ণ হয়:
- বাষ্পীভবন (Evaporation): সূর্যের তীব্র তাপে সাগর, মহাসাগর, নদী, হ্রদ ও বিভিন্ন জলাশয়ের পৃষ্ঠীয় জল উত্তপ্ত হয়ে হালকা জলীয় বাষ্পে পরিণত হয় এবং তা বায়ুমণ্ডলের উর্ধ্বস্তরে উঠে যায়। পৃথিবীর সামগ্রিক বাষ্পীভবনের প্রায় ৮৪% মহাসাগর থেকে এবং ১৬% স্থলভাগ থেকে সম্পন্ন হয়।
- বাষ্পমোচন / প্রস্বেদন (Transpiration): উদ্ভিদ তার মূলরোম দ্বারা ভূগর্ভ থেকে যে জল শোষণ করে, তার অতিরিক্ত অংশ পাতার পত্ররন্ধ্রের (Stomata) মাধ্যমে জলীয় বাষ্প আকারে বায়ুমণ্ডলে ত্যাগ করে। এটি বায়ুমণ্ডলের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
- ঘনীভবন ও মেঘ সৃষ্টি (Condensation): উর্ধ্বগামী হালকা ও উষ্ণ জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলের উঁচুতে গিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রা হ্রাসের হারে (Normal Lapse Rate) শীতল হয়। এরপর বায়ুতে ভাসমান ধূলিকণা ও লবণকণাকে (Aerosols) আশ্রয় করে এই বাষ্প অতিক্ষুদ্র জলবিন্দু ও বরফকণায় ঘনীভূত হয়ে মেঘ ও কুয়াশা তৈরি করে।
- অধঃক্ষেপণ / বৃষ্টিপাত (Precipitation): মেঘের মধ্যে থাকা ক্ষুদ্র জলকণাগুলি পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রমশ বড় ও ভারী হতে থাকে। মেঘ যখন এত বেশি ভারী হয়ে পড়ে যে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে না, তখন অভিকর্ষজ টানে বৃষ্টিপাত, তুষারপাত কিংবা শিলাবৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে।
- ভূপৃষ্ঠীয় জলপ্রবাহ ও অনুস্রাবণ (Runoff & Infiltration):
- ভূপৃষ্ঠীয় প্রবাহ (Surface Runoff): অধঃক্ষেপণের সিংহভাগ জল ভূমির ঢাল অনুসরণ করে নদী, নালা ও খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত সাগর-মহাসাগরে ফিরে যায়।
- অনুস্রাবণ ও ভূগর্ভস্থ জল (Infiltration & Groundwater): বৃষ্টির কিছু জল মাটির রন্ধ্র দিয়ে নিচে চুঁইয়ে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জল (Groundwater) হিসেবে জমা হয়, যা পরবর্তীকালে প্রস্রবণ বা নদীর মাধ্যমে পুনরায় সমুদ্রে গিয়ে মেশে।
৪. পরিবেশে জল চক্রের ভৌগোলিক গুরুত্ব (Geographical Significance of Water Cycle):
- জলের ভারসাম্য রক্ষা: বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও অশ্মমণ্ডলের মধ্যে জলের আদান-প্রদান ঘটিয়ে পৃথিবীতে জলের মোট পরিমাণ ধ্রুবক ও অপরিবর্তিত রাখে।
- তাপমাত্রা ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ: জলীয় বাষ্প পরিবহন ও বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে জলচক্র পৃথিবীর সৌরতাপের ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে।
- মিষ্টি জলের যোগান: লবণাক্ত সমুদ্রের জলকে প্রাকৃতিক বাষ্পীভবন প্রক্রিয়ায় শোধন করে সমগ্র উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের ব্যবহারের উপযোগী মিষ্টি জলের অফুরন্ত যোগান দেয়।
- বাস্তুতন্ত্রের সচলতা: জলচক্রের অবিরাম গতির ফলেই স্থলভাগের মাটি উর্বর থাকে, কৃষিকাজ সম্ভব হয় এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র সচল থাকে।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...