WBBSE Class 6 History Chapter 7 অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা : সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর ও গাইড
October 06, 2026
0 Views
0 Likes
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) ষষ্ঠ শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবই 'অতীত ও ঐতিহ্য'-এর সপ্তম অধ্যায়: অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের প্রথম ভাগ)-এর সম্পূর্ণ অধ্যায়ভিত্তিক ও পাঠ্যবই অনুশীলনী সমাধান এখানে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরা হলো। প্রাচীন ভারতের কৃষিব্যবস্থা, উন্নত সেচ ও ঐতিহাসিক সুদর্শন হ্রদ, মৌর্য ও গুপ্ত আমলের জমি-রাজস্ব ও অগ্রহার ব্যবস্থা, কারিগরি ও রেশম-বস্ত্রশিল্প, অভ্যন্তরীণ ও রোমান বৈদেশিক বাণিজ্য, বিখ্যাত বন্দর ও প্রাচীন মুদ্রা, দ্বিতীয় নগরায়ণ, কারিগরদের গিল্ড বা শ্রেণি, চতুর্বর্ণ ও চণ্ডালদের দুরবস্থা, চতুরাশ্রম প্রথা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস এবং নালন্দা মহাবিহারের শিক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত সমস্ত সঠিক উত্তর নির্বাচন (MCQ), শূন্যস্থান পূরণ, এক কথায় উত্তর, দু-তিনটি বাক্যে উত্তর (মান ২), চার-পাঁচটি বাক্যে উত্তর ও সম্পূর্ণ টীকা (মান ৩) এবং আট-দশটি বাক্যে উত্তর (মান ৫)-এর সহজ ও নম্বরমুখী সমাধান দেওয়া হলো।
১প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষিকাজের প্রধান ভিত্তি বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল ছিল — VVI
(A) গম
(B) যব
(C) ধান
(D) ভুট্টা
সঠিক উত্তর: (C) ধান
ব্যাখ্যা: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে গঙ্গা উপত্যকায় ধান ছিল প্রধান খাদ্যশস্য। বিভিন্ন জাতের ধান যেমন শালি ও ব্রীহি ধানের চাষ হতো।
২বিখ্যাত ঐতিহাসিক 'সুদর্শন হ্রদ' ভারতের কোন অঞ্চলে অবস্থিত? VVI
(A) মধ্যপ্রদেশের মালব অঞ্চলে
(B) গুজরাটের সৌরাষ্ট্রের জুনাগড়ে
(C) রাজস্থানের মরু অঞ্চলে
(D) ওড়িশার কলিঙ্গে
সঠিক উত্তর: (B) গুজরাটের সৌরাষ্ট্রের জুনাগড়ে
ব্যাখ্যা: গুজরাটের কাথিয়াবাড় উপদ্বীপের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে জুনাগড়ে গিরনার পর্বতের পাদদেশে সুদর্শন হ্রদ তৈরি করা হয়েছিল।
৩কার শাসনকালে সুদর্শন হ্রদটির নির্মাণকাজ প্রথম শুরু হয়েছিল? VVI
(A) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
(B) সম্রাট অশোক
(C) রুদ্রদমন
(D) স্কন্দগুপ্ত
সঠিক উত্তর: (A) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
ব্যাখ্যা: মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে তাঁর প্রাদেশিক শাসক পুষ্যগুপ্ত বৈশ্য পাহাড়ি নদীর জল আটকে এই হ্রদটির নির্মাণ শুরু করেছিলেন।
৪সুদর্শন হ্রদ থেকে সেচকার্যের সুবিধার জন্য প্রথম খাল কাটান কে?
(A) পুষ্যগুপ্ত
(B) সম্রাট অশোকের শাসনকালে যবনরাজ তুষাস্প
(C) রুদ্রদমন
(D) সুবিশাখ
সঠিক উত্তর: (B) সম্রাট অশোকের শাসনকালে যবনরাজ তুষাস্প
ব্যাখ্যা: সম্রাট অশোকের সময় তাঁর রাজকর্মচারী তুষাস্প হ্রদ থেকে জল কৃষিজমিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য খাল কেটে সেচের ব্যবস্থা করেন।
৫মৌর্য আমলে রাজার নিজস্ব বা রাষ্ট্রীয় খাসজমিকে কী বলা হতো? VVI
(A) অগ্রহার জমি
(B) ব্রহ্মদেয় জমি
(C) সীতা জমি
(D) খিল জমি
সঠিক উত্তর: (C) সীতা জমি
ব্যাখ্যা: মৌর্য আমলে রাজকীয় খাসজমিকে 'সীতা' জমি বলা হতো এবং এর দেখভাল করতেন 'সীতাধ্যক্ষ'।
৬প্রাচীন ভারতে কৃষকদের সাধারণত উৎপন্ন ফসলের কত অংশ রাজাকে রাজস্ব হিসেবে দিতে হতো?
(A) একের চার অংশ (১/৪)
(B) একের ছয় অংশ (১/৬)
(C) একের দশ অংশ (১/১০)
(D) অর্ধেক অংশ (১/২)
সঠিক উত্তর: (B) একের ছয় অংশ (১/৬)
ব্যাখ্যা: প্রাচীন ভারতে কৃষকদের কাছ থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ সাধারণ ভূমি রাজস্ব হিসেবে আদায় করা হতো, যা 'ভাগ' নামে পরিচিত।
৭প্রাচীন ভারতে সেচ বা জলের ব্যবহারের জন্য প্রজাদের প্রদেয় করকে কী বলা হতো? VVI
(A) বলি
(B) উদকভাগ
(C) হিরণ্য
(D) পিণ্ডকর
সঠিক উত্তর: (B) উদকভাগ
ব্যাখ্যা: অর্থশাস্ত্রে সেচব্যবস্থা বা সরকারি জলাশয় থেকে জল নেওয়ার বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের একটি অংশ কর হিসেবে দেওয়ার নিয়ম ছিল, যাকে 'উদকভাগ' বা জলকর বলা হতো।
৮ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ ও মঠ-মন্দিরকে নিষ্ক নিষ্কর জমি দান করার প্রথাকে কী বলা হতো? VVI
(A) অগ্রহার ব্যবস্থা
(B) জায়গির প্রথা
(C) রায়তওয়ারি ব্যবস্থা
(D) সামন্ত চুক্তি
সঠিক উত্তর: (A) অগ্রহার ব্যবস্থা
ব্যাখ্যা: গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগে ধর্মীয় পণ্ডিত ও মঠ-মন্দিরকে বংশানুক্রমিকভাবে ভোগ করার জন্য রাজস্বমুক্ত জমিদানের প্রথাকে অগ্রহার ব্যবস্থা বলা হতো।
৯প্রাচীন ভারতের বঙ্গোপসাগরীয় পূর্ব উপকূলের সর্বপ্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর কোনটি ছিল? VVI
(A) ভারুকচ্ছ
(B) তাম্রলিপ্ত
(C) সোপারা
(D) মুজিরিস
সঠিক উত্তর: (B) তাম্রলিপ্ত
ব্যাখ্যা: বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তমলুক বা প্রাচীন তাম্রলিপ্ত ছিল পূর্ব উপকূলের প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর, যেখান থেকে সিংহল, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য চলত।
১০প্রাচীন ভারতের পশ্চিম উপকূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর কোনটি ছিল?
(A) ভারুকচ্ছ (ভৃগুকচ্ছ)
(B) তাম্রলিপ্ত
(C) পুরী
(D) বিশাখাপত্তনম
সঠিক উত্তর: (A) ভারুকচ্ছ (ভৃগুকচ্ছ)
ব্যাখ্যা: আধুনিক গুজরাটের ভারুচ বা প্রাচীন ভারুকচ্ছ ছিল পশ্চিম উপকূলের বিখ্যাত বন্দর, যা দিয়ে রোমান ও পারস্য বাণিজ্যের জাহাজ যাতায়াত করত।
১১রোমান ও গ্রিক বণিকদের কাছে ভারতের কোন মশলাটি 'যবনপ্রিয়' নামে পরিচিত ছিল? VVI
(A) এলাচ
(B) দারুচিনি
(C) গোলমরিচ
(D) লবঙ্গ
সঠিক উত্তর: (C) গোলমরিচ
ব্যাখ্যা: গ্রিক ও রোমানরা ('যবন') ভারতীয় গোলমরিচ অত্যন্ত পছন্দ করত এবং রোমে এর বিপুল চাহিদা ছিল বলে সংস্কৃত সাহিত্যে একে 'যবনপ্রিয়' বলা হয়েছে।
১২'পেরিফ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি' গ্রন্থের রচয়িতা কে ছিলেন? VVI
(A) মেগাস্থিনিস
(B) প্লিনি
(C) এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক
(D) টলেমি
সঠিক উত্তর: (C) এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক
ব্যাখ্যা: খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিক লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের বন্দর ও বাণিজ্য সংক্রান্ত এই বিখ্যাত গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন।
১৩প্রাচীন ভারতে একই পেশার কারিগর বা ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সংগঠনকে কী বলা হতো? VVI
(A) সমিতি
(B) সভা
(C) শ্রেণি বা গিল্ড
(D) পঞ্চায়েত
সঠিক উত্তর: (C) শ্রেণি বা গিল্ড
ব্যাখ্যা: একই ধরনের শিল্প বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কারিগর ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য যে পেশাগত সংঘ গড়ত, তাকে 'শ্রেণি' (বা গিল্ড) বলা হতো।
১৪প্রাচীন ভারতে ভ্রমণকারী ব্যবসায়ী কাফেলার দলপতিকে কী বলা হতো?
(A) সামন্ত
(B) সার্থবাহ
(C) সেনাপতি
(D) অমাত্য
সঠিক উত্তর: (B) সার্থবাহ
ব্যাখ্যা: প্রাচীন ভারতে দূর-দূরান্তে পণ্য নিয়ে ভ্রমণকারী বণিক দলকে 'সার্থ' এবং সেই দলের প্রধান বা কাফেলা প্রধানকে 'সার্থবাহ' বলা হতো।
১৫গুপ্ত যুগে প্রচলিত প্রধান সোনার মুদ্রাকে কী বলা হতো? VVI
(A) রূপক
(B) দিনার ও সুবর্ণ
(C) কাহন
(D) শতমান
সঠিক উত্তর: (B) দিনার ও সুবর্ণ
ব্যাখ্যা: গুপ্ত রাজাদের আমলে প্রচলিত মূল্যবান স্বর্ণমুদ্রাকে 'দিনার' ও 'সুবর্ণ' বলা হতো; অন্যদিকে রুপোর মুদ্রাকে বলা হতো 'রূপক'।
১৬চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন কার রাজত্বকালে ভারতে এসেছিলেন?
(A) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
(B) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
(C) হর্ষবর্ধন
(D) প্রথম কুমারগুপ্ত
সঠিক উত্তর: (B) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
ব্যাখ্যা: খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে ফা-হিয়েন ভারতে এসেছিলেন এবং চণ্ডালদের দুরবস্থার চিত্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন।
১৭বিশ্ববিখ্যাত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিদ্যাপীঠ 'নালন্দা মহাবিহার' কে প্রতিষ্ঠা করেন? VVI
(A) গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত
(B) সমুদ্রগুপ্ত
(C) স্কন্দগুপ্ত
(D) হর্ষবর্ধন
সঠিক উত্তর: (A) গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত
ব্যাখ্যা: খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত বিহারের রাজগৃহের কাছে এই মহাবিহারটি স্থাপন করেন।
১৮চীনা তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাঙ যখন নালন্দা মহাবিহারে এসেছিলেন, তখন সেখানকার প্রধান অধ্যক্ষ কে ছিলেন? VVI
(A) নাগার্জুন
(B) আচার্য শীলভদ্র
(C) অতিশ দীপঙ্কর
(D) বসুবন্ধু
সঠিক উত্তর: (B) আচার্য শীলভদ্র
ব্যাখ্যা: চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ নালন্দার সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রধান আচার্য শীলভদ্রের কাছে বৌদ্ধ দর্শন ও ব্যাকরণ চর্চা করেছিলেন।
১প্রাচীন ভারতে গুজরাটের সৌরাষ্ট্রে সেচব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল _______ হ্রদ। VVI
উত্তর: সুদর্শন
২কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে সেচের ব্যবহারের জন্য প্রদেয় করকে _______ বলা হয়েছে।
উত্তর: উদকভাগ
৩মৌর্য সাম্রাজ্যে রাজকীয় খাসজমি বা সীতা জমি দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে _______ বলা হতো।
উত্তর: সীতাধ্যক্ষ
৪ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধ-জৈন মঠ-মন্দিরকে নিষ্ক নিষ্কর জমি দান করার প্রথাকে _______ ব্যবস্থা বলা হতো। VVI
উত্তর: অগ্রহার
৫প্রাচীন ভারতীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বণিক সমিতির প্রধান বা ধনী ব্যবসায়ীদের _______ বা শেঠ বলা হতো।
উত্তর: শ্রেষ্ঠী (বা জেঠক)
৬দলবেঁধে চলাচলকারী বণিক কাফেলার নেতাকে প্রাচীন ভারতে _______ বলা হতো।
উত্তর: সার্থবাহ
৭প্রাচীন ভারতের বঙ্গোপসাগর উপকূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দর ছিল _______। VVI
উত্তর: তাম্রলিপ্ত (বর্তমান তমলুক)
৮রোমানদের কাছে ভারতের সবচেয়ে প্রিয় এবং মূল্যবান মশলা ছিল _______। VVI
উত্তর: গোলমরিচ
৯রোমান লেখক _______ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন যে বিলাসবহুল দ্রব্য কেনার জন্য রোমের বিপুল সোনা ভারতে চলে যাচ্ছে। VVI
উত্তর: প্লিনি (Pliny)
১০খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গা ও যমুনা উপত্যকায় নতুন নগরগুলির বিকাশকে ভারতের ইতিহাসে _______ নগরায়ণ বলা হয়। VVI
উত্তর: দ্বিতীয়
১১চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েনের বিবরণ থেকে সমাজের সবচেয়ে নির্যাতিত ও অস্পৃশ্য _______ সম্প্রদায়ের দুঃখজনক অবস্থার কথা জানা যায়। VVI
উত্তর: চণ্ডাল
১২গুপ্ত সম্রাটদের আমলে প্রচলিত প্রধান রুপোর মুদ্রার নাম ছিল _______।
উত্তর: রূপক
১৩দ্বিজ বা উচ্চবর্ণের পুরুষদের জীবনের চারটি পর্যায়কে একত্রে _______ প্রথা বলা হতো।
উত্তর: চতুরাশ্রম
১৪নালন্দা মহাবিহারের সুবিশাল তিনতলা বিশিষ্ট পাঠাগার কমপ্লেক্সটির নাম ছিল _______। VVI
উত্তর: ধর্মগঞ্জ
১৫গান্ধার অঞ্চলের প্রাচীনতম এবং বিখ্যাত উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল _______।
উত্তর: তক্ষশীলা
১প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রধান জীবিকা কী ছিল?
উত্তর: কৃষিকাজ।
২সুদর্শন হ্রদ ভারতের কোন রাজ্যে অবস্থিত? VVI
উত্তর: গুজরাট রাজ্যের কাথিয়াবাড়ের সৌরাষ্ট্রের জুনাগড়ে।
৩কোন শক শাসকের জুনাগড় শিলালিপি থেকে সুদর্শন হ্রদের সংস্কারের কথা জানা যায়? VVI
উত্তর: মহাক্ষত্রপ রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি থেকে।
৪রুদ্রদমন ছাড়া পরবর্তীতে আর কোন গুপ্ত সম্রাট সুদর্শন হ্রদ মেরামত করান?
উত্তর: গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্ত।
৫প্রাচীন ভারতে কৃষকদের উৎপন্ন ফসলের কত অংশ রাজাকে 'ভাগ' হিসেবে দিতে হতো?
উত্তর: এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬ অংশ)।
৬মৌর্য আমলে রাজার নিজস্ব বা খাসজমিকে কী বলা হতো? VVI
উত্তর: সীতা জমি।
৭অগ্রহার ব্যবস্থায় জমি কাদের দান করা হতো? VVI
উত্তর: ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং বৌদ্ধ বা জৈন মঠ-মন্দিরকে।
৮উত্তর ভারতের কোন কোন শহর সুতি ও রেশম বস্ত্র শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল?
উত্তর: কাশী, মথুরা এবং কৌশাম্বী।
৯প্রাচীন বাংলার কোন কোন অঞ্চল উন্নত বস্ত্রশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল?
উত্তর: বঙ্গ এবং পুণ্ড্রবর্ধন।
১০উত্তর ভারতে আবিষ্কৃত বিশেষ চকচকে কালো রঙের মাটির পাত্রকে সংক্ষেপে কী বলা হয়?
উত্তর: NBPW (Northern Black Polished Ware)।
১১সার্থবাহ কাদের বলা হতো? VVI
উত্তর: প্রাচীন ভারতে ভ্রমণকারী বণিক কাফেলার প্রধান বা পথপ্রদর্শককে।
১২প্রাচীন ভারতের একই পেশার কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সংঘকে কী বলা হতো? VVI
উত্তর: শ্রেণি বা গিল্ড।
১৩পশ্চিম উপকূলের প্রধান বন্দর ভারুকচ্ছ বর্তমান ভারতের কোন রাজ্যে অবস্থিত?
উত্তর: গুজরাট রাজ্যে (বর্তমান ভারুচ)।
১৪রোমানরা ভারতীয় গোলমরিচকে কী নামে অভিহিত করত? VVI
উত্তর: 'যবনপ্রিয়'।
১৫'পেরিফ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি' বইটি কোন ভাষায় রচিত?
উত্তর: গ্রিক ভাষায়।
১৬বৈদিক যুগে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত দুটি মুদ্রাসদৃশ অলঙ্কারের নাম লেখো।
উত্তর: নিষ্ক এবং মনা।
১৭প্রাচীন ভারতে তামার পাতে সিলমোহর মেরে তৈরি আদিম মুদ্রাকে কী বলা হয়?
উত্তর: আহত মুদ্রা (Punch-marked coins)।
১৮খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় নগরায়ণ কোন নদী উপত্যকায় কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল? VVI
উত্তর: গঙ্গা ও যমুনা নদী উপত্যকায়।
১৯চণ্ডালরা শহরে ঢোকার সময় কেন কাঠের টুকরো ঠুকে শব্দ করত? VVI
উত্তর: যাতে উচ্চবর্ণের মানুষ তাদের স্পর্শ ও দৃষ্টি এড়িয়ে দূরে সরে যেতে পারে।
২০নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারের তিনটি ভবনের নাম কী কী ছিল? VVI
উত্তর: রত্নসাগর, রত্নোদধি এবং রত্নরঞ্জক।
১ প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষিকাজের প্রধান ভিত্তি কী ছিল এবং প্রধান ফসলগুলি কী কী ছিল? মান ২
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে নদীমাতৃক উপত্যকার উর্বর পলিমাটি এবং উন্নত লোহার লাঙল ও বলদের ব্যবহার কৃষিকাজের মূল ভিত্তি ছিল। এই সময়ের প্রধান ফসল ছিল ধান (যেমন—শালি ও ব্রীহি ধান)। ধান ছাড়াও গম, যব, বিভিন্ন ডাল, আখ, তুলো, নীল ও তৈলবীজের ব্যাপক চাষ হতো।
২ প্রাচীন ভারতে কৃত্রিম সেচব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? মান ২
উত্তর:
বৃষ্টির জলের অনিশ্চয়তা দূর করে সারা বছর নির্বিঘ্নে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কৃত্রিম সেচব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এই উদ্দেশ্যে নদী থেকে খাল কেটে, পুকুর ও কূপ খনন করে এবং পাহাড়ি নদীর জল আটকে বাঁধ দিয়ে কৃত্রিম হ্রদ ও জলাশয় তৈরি করা হতো।
৩ সুদর্শন হ্রদ কে এবং কেন তৈরি করেছিলেন? VVI মান ২
উত্তর:
মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে তাঁর সৌরাষ্ট্রের প্রাদেশিক শাসক পুষ্যগুপ্ত বৈশ্য গুজরাটের জুনাগড়ে সুদর্শন হ্রদ তৈরি করেছিলেন। সৌরাষ্ট্রের শুষ্ক ও বৃষ্টিহীন অঞ্চলে কৃষিকাজের সুবিধার্থে জল ধরে রাখা এবং সেচ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হ্রদটি নির্মাণ করা হয়।
৪ শক ক্ষত্রপ রুদ্রদমন কীভাবে সুদর্শন হ্রদের সংস্কার করেছিলেন? VVI মান ২
উত্তর:
১৫০ খ্রিস্টাব্দে এক ভয়াবহ ঝড়ে সুদর্শন হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে শক শাসক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদমন তা সংস্কার করেন। তিনি প্রজাদের ওপর কোনো বাড়তি কর বা বাধ্যতামূলক শ্রম না চাপিয়ে নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে তাঁর মন্ত্রী সুবিশাখের মাধ্যমে বাঁধটি পুনরায় মজবুত করে তৈরি করান।
৫ মৌর্য আমলে রাজারা কৃষকদের থেকে কী কী কর আদায় করতেন? মান ২
উত্তর:
মৌর্য আমলে কৃষকদের কাছ থেকে প্রধান কর হিসেবে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ 'ভাগ' আদায় করা হতো। এছাড়া বিশেষ ধর্মীয় কর 'বলি', সরকারি জলাশয় ব্যবহারের জন্য জলকর 'উদকভাগ', নগদ অর্থে প্রদেয় কর 'হিরণ্য' এবং সমগ্র গ্রামের ওপর সমষ্টিগত কর 'পিণ্ডকর' ধার্য হতো।
৬ অগ্রহার ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো? VVI মান ২
উত্তর:
গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের এবং বৌদ্ধ বা জৈন মঠ-মন্দিরকে নিষ্ক নিষ্কর জমি দান করার প্রথাকে অগ্রহার ব্যবস্থা বলা হতো। এই জমির মালিকেরা বংশানুক্রমিকভাবে জমি ভোগ করতেন এবং ওই অঞ্চলের প্রজাদের থেকে রাজস্ব আদায় করতেন, কিন্তু রাজাকে কোনো কর দিতে হতো না।
৭ প্রাচীন ভারতের বস্ত্রশিল্পের সমৃদ্ধির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। মান ২
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের সবচেয়ে উন্নত ও প্রধান হস্তশিল্প ছিল সুতি ও রেশম বস্ত্র শিল্প। সূক্ষ্ম ও মসৃণ কাপড়ের জন্য কাশী, মথুরা, কৌশাম্বী এবং অবিভক্ত বাংলার বঙ্গ ও পুণ্ড্রবর্ধন বিশ্ববিখ্যাত ছিল। বাংলার মসলিনের খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে রোমান সাম্রাজ্য ও দূরপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৮ প্রাচীন ভারতের প্রধান দুটি স্থলপথ বাণিজ্যের সড়কের পরিচয় দাও। মান ২
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের প্রধান দুটি স্থল বাণিজ্য পথ ছিল—(১) উত্তরাপথ: এটি উত্তর-পশ্চিমের তক্ষশীলা থেকে পাটলিপুত্র হয়ে পূর্ব উপকূলের তাম্রলিপ্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। (২) দক্ষিণাপথ: এটি উত্তর ভারত থেকে বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করে দাক্ষিণাত্যের প্রতিষ্ঠান ও পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত প্রসারিত ছিল।
৯ সার্থ ও সার্থবাহ কাদের বলা হতো? VVI মান ২
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে দূরদূরান্তে পণ্য কেনাবেচা করার উদ্দেশ্যে কাফেলা তৈরি করে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ানো বণিকদের 'সার্থ' বলা হতো। এই ভ্রমণকারী বণিক দলের দলনেতা বা প্রধান পথপ্রদর্শককে বলা হতো 'সার্থবাহ'।
১০ রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান দ্রব্যগুলি কী ছিল? VVI মান ২
উত্তর:
ভারত থেকে রোমান সাম্রাজ্যে মূলত গোলমরিচ, সুতি বস্ত্র, রেশম, হাতির দাঁত, সুগন্ধি দ্রব্য, মূল্যবান পাথর ও ময়ূর রপ্তানি হতো। এর পরিবর্তে রোম থেকে ভারতে আসত প্রচুর সোনার ও রুপোর মুদ্রা, উন্নত মানের সুরা (মদ), সুদৃশ্য কাঁচের পাত্র ও প্রবাল।
১১ রোমান লেখক প্লিনি ভারত-রোম বাণিজ্যের বিষয়ে কী আক্ষেপ করেছিলেন? VVI মান ২
উত্তর:
রোমান পণ্ডিত প্লিনি তাঁর 'ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া' গ্রন্থে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন যে, ভারতীয় বিলাসবহুল পণ্য ও মসলা কেনার জন্য রোমান সাম্রাজ্যের বিপুল পরিমাণ সোনা প্রতি বছর ভারতে চলে যাচ্ছে। এর ফলে রোমান সাম্রাজ্যের রাজকোষ ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
১২ প্রাচীন ভারতের কারিগর ও ব্যবসায়ীদের শ্রেণি বা গিল্ডের দুটি প্রধান কাজ উল্লেখ করো। VVI মান ২
উত্তর:
শ্রেণি বা গিল্ডের দুটি প্রধান কাজ ছিল: (১) উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ করা এবং তার ন্যায্য বিক্রয়মূল্য নির্দিষ্ট করা। (২) আধুনিক ব্যাঙ্কের মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আমানত রাখা, নির্দিষ্ট সুদে ঋণ দেওয়া এবং ধর্মীয় ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে দান করা।
১৩ ভারতীয় ইতিহাসে 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলতে কী বোঝো? VVI মান ২
উত্তর:
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে লোহার হাতিয়ারের ব্যবহার বৃদ্ধি, উদ্বৃত্ত কৃষিজ ফসল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির ফলে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় পাটলিপুত্র, বারাণসী, কৌশাম্বী, শ্রাবস্তী প্রভৃতি নতুন নগরগুলির পুনরুত্থান ঘটে। হরপ্পা সভ্যতার পর এটি ছিল ভারতের নগরায়ণের দ্বিতীয় ধাপ, তাই একে 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলা হয়।
১৪ প্রাচীন ভারতীয় সমাজে চণ্ডালদের অবস্থান কেমন ছিল? VVI মান ২
উত্তর:
প্রাচীন সমাজে চণ্ডালদের অস্পৃশ্য এবং চরম অপবিত্র বিবেচনা করা হতো। তাদের মূল জনবসতি বা শহরের বাইরে থাকতে হতো। মৃতদেহ সৎকার ও নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার ছিল তাদের কাজ এবং শহরে প্রবেশের সময় তাদের কাঠের শব্দ করে নিজের উপস্থিতি জানাতে হতো।
১৫ চতুরাশ্রম প্রথা বলতে কী বোঝো? মান ২
উত্তর:
পরবর্তী বৈদিক যুগে উচ্চবর্ণের (দ্বিজ) পুরুষদের সম্পূর্ণ জীবনকালকে সুশৃঙ্খলভাবে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছিল। এই চারটি স্তর হলো—ব্রহ্মচর্য (ছাত্রাবস্থায় বিদ্যালাভ), গার্হস্থ্য (সংসার জীবন), বানপ্রস্থ (অরণ্যে তপস্যা) এবং সন্ন্যাস (মোক্ষ লাভের উদ্দেশ্যে সর্বস্ব ত্যাগ)।
১৬ কুষাণদের আগমনের ফলে ভারতীয় পোশাক-পরিচ্ছদে কী নতুন পরিবর্তন এসেছিল? VVI মান ২
উত্তর:
কুষাণরা মধ্য এশিয়া থেকে আসার ফলে ভারতীয় সমাজে সেলাই করা জামাকাপড়ের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। এই সময় থেকে ভারতীয়রা শরীরের মাপ অনুযায়ী কুর্তা, পাজামা বা ট্রাউজার, লম্বা জোব্বা কোট, টুপি এবং শক্ত চামড়ার বুট জুতো ব্যবহার করতে শুরু করে।
১৭ নালন্দা মহাবিহারে ছাত্র ভর্তির পদ্ধতি কেমন ছিল? VVI মান ২
উত্তর:
নালন্দা মহাবিহারে ছাত্র ভর্তির পরীক্ষা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বা দ্বারে 'দ্বারপণ্ডিত' নামক বিশিষ্ট আচার্যরা ছাত্রদের গভীর শাস্ত্রীয় পরীক্ষা নিতেন; কেবল সফল বিশ থেকে তিরিশ শতাংশ ছাত্রই সেখানে বিনামূল্যে পাঠগ্রহণের সুযোগ পেত।
১ প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে কৃষিকাজের অগ্রগতির পেছনে কী কী অনুকূল কারণ বিদ্যমান ছিল? VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে বিশেষ করে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে কৃষিকাজের অভূতপূর্ব অগ্রগতির প্রধান কারণগুলি ছিল:
উর্বর পলল ভূমি ও নদ-নদীর সান্নিধ্য: গঙ্গা, যমুনা ও সিন্ধু অববাহিকার উর্বর পলিমাটি চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল এবং নদীর জল সহজলভ্য ছিল।
লোহার প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার: ভারী লোহার ফালযুক্ত লাঙল ও কুড়ুল ব্যবহারের ফলে গভীর চাষ এবং দুর্ভেদ্য বনভূমি কেটে দ্রুত নতুন কৃষিজমি তৈরি করা সম্ভব হয়।
উন্নত কৃত্রিম সেচ ও বলদের শক্তি: বৃষ্টির অনিশ্চয়তা দূর করতে খাল, পুকুর ও কূপ খনন এবং হালচাষে বলদের ব্যবহারের ফলে কৃষিতে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের উৎপাদন নিশ্চিত হয়েছিল।
২ মৌর্য আমলে কৃষকদের ওপর ধার্য বিভিন্ন ধরনের কর বা রাজস্বের পরিচয় দাও। VVI মান ৩
উত্তর:
মৌর্য সাম্রাজ্যের অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর হওয়ায় কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কর আদায় করা হতো:
ভাগ (প্রধান ভূমিকর): উৎপন্ন ফসলের সাধারণ এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) ভাগ রাষ্ট্রের প্রধান রাজস্ব হিসেবে কৃষকদের দিতে হতো।
বলি ও উদকভাগ: 'বলি' ছিল প্রাচীন ধর্মীয় বা বাধ্যতামূলক কর; আর সরকারি খাল ও জলাশয় ব্যবহারের বিনিময়ে উৎপন্ন ফসলের এক অংশ 'উদকভাগ' বা জলকর হিসেবে নেওয়া হতো।
হিরণ্য ও পিণ্ডকর: কৃষকদের নগদ অর্থে প্রদেয় করকে বলা হতো 'হিরণ্য' এবং সমগ্র গ্রামের অধিবাসীদের ওপর যৌথভাবে আরোপিত শস্যকরকে 'পিণ্ডকর' বলা হতো।
৩ প্রাচীন ভারতে কারিগর ও ব্যবসায়ীদের গিল্ড বা শ্রেণি গড়ে ওঠার প্রধান কারণ ও সুবিধাগুলি কী ছিল? VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন যুগে কারিগর ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থরক্ষার তাগিদে 'শ্রেণি' বা গিল্ড গড়ে তুলেছিল:
নিরাপত্তা ও কাঁচামাল সংগ্রহ: একাকী ব্যবসা করার ঝুঁকি কমাতে, নিয়মিত কাঁচামাল নিশ্চিত করতে এবং দূরপাল্লার বাণিজ্যে দস্যুদের হাত থেকে পণ্য রক্ষা করতে তারা সংঘবদ্ধ হয়।
পণ্যের মান ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ: শ্রেণি উৎপাদিত দ্রব্যের মান পরীক্ষা করত এবং নির্দিষ্ট বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ও ঠকাঠকি রোধ করত।
স্বায়ত্তশাসন ও ব্যাঙ্কিং সুবিধা: রাজারা শ্রেণির অভ্যন্তরীণ নিয়মে হস্তক্ষেপ করতেন না। উপরন্তু শ্রেণি সাধারণ মানুষের টাকা আমানত রাখত ও নির্দিষ্ট সুদে ঋণ দিয়ে মহাজনের কাজ করত।
৪ প্রাচীন ভারতীয় বাণিজ্যে তাম্রলিপ্ত বন্দরের ভূমিকা ও ভৌগোলিক গুরুত্ব সংক্ষেপে লেখো। VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন পূর্ব ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর ছিল অবিভক্ত বাংলার তাম্রলিপ্ত (বর্তমান তমলুক):
বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার: রূপনারায়ণ নদের তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি গঙ্গার নৌপথ এবং উত্তরাপথের দীর্ঘ সড়কপথের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
দূরপাল্লার সামুদ্রিক বাণিজ্য: তাম্রলিপ্ত থেকে ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ সিংহল (শ্রীলঙ্কা), সুমাত্রা, জাভা, বলি, মায়ানমার এবং সুদূর চীনে যাতায়াত করত।
পণ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান: এখান থেকে উৎকৃষ্ট সুতি বস্ত্র, রেশম, তামা ও খাদ্যশস্য বিদেশে পাঠানো হতো এবং ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের মতো বিখ্যাত পরিব্রাজকরা এই বন্দর ব্যবহার করেছিলেন।
৫ রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতীয় বণিকরা কীভাবে লাভবান হয়েছিল তা ব্যাখ্যা করো। VVI মান ৩
উত্তর:
খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য ভারতের সম্পূর্ণ অনুকূলে ছিল:
ভারতীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া চাহিদা: রোমের ধনী ও অভিজাতদের মধ্যে ভারতীয় গোলমরিচ ('যবনপ্রিয়'), সূক্ষ্ম মসলিন, রেশম, মুক্তো ও হাতির দাঁতের বিলাসপণ্যের প্রবল চাহিদা ছিল।
সোনার বিপুল আমদানি: ভারতীয় দ্রব্যের বিনিময়ে রোমানরা জাহাজে করে লক্ষ লক্ষ সোনার ও রুপোর মুদ্রা ভারতে পাঠাতে বাধ্য হতো।
প্লিনির আক্ষেপ ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি: রোমান লেখক প্লিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন যে রোমের সঞ্চিত সোনা ভারতে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত রোমান মুদ্রা এই লাভজনক বাণিজ্যের প্রমাণ।
৬ ভারতীয় উপমহাদেশের 'দ্বিতীয় নগরায়ণ'-এর পেছনে লোহার প্রযুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল? VVI মান ৩
উত্তর:
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গা ও যমুনা উপত্যকায় নগরগুলির নতুন করে উত্থানে লোহার ব্যবহারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম:
অরণ্য ধ্বংস ও কৃষিজমির বিস্তার: শক্ত লোহার কুড়ুল দিয়ে গাঙ্গেয় উপত্যকার ঘন ও দুর্ভেদ্য জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে বিশাল কৃষিজমি তৈরি করা সম্ভব হয়।
উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন: ভারী লোহার ফালযুক্ত লাঙল দিয়ে মাটির গভীর চাষের ফলে জমিতে প্রচুর উদ্বৃত্ত ফসল উৎপন্ন হতে শুরু করে।
অকৃষি পেশা ও নগরের জন্ম: উদ্বৃত্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকায় একদল মানুষ চাষাবাদ ছেড়ে কারিগরি, বাণিজ্য ও প্রশাসনে যুক্ত হয়, যা পাটলিপুত্র, কৌশাম্বী ও বারাণসীর মতো নগর গড়ে তোলে।
৭ প্রাচীন ভারতীয় সমাজে চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা কীভাবে কালক্রমে অনমনীয় জাতিভেদ প্রথায় রূপ নিল? মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসে সময়ের সাথে সাথে গভীর রূপান্তর ঘটেছিল:
কর্মভিত্তিক থেকে জন্মভিত্তিক: আদি বৈদিক যুগে বর্ণ নির্ধারিত হতো ব্যক্তির গুণ ও কাজের ওপর ভিত্তি করে, কিন্তু পরবর্তী যুগে তা কঠোর জন্মসূত্রে নির্ধারিত হতে থাকে।
সংকর জাতির উৎপত্তি: বিভিন্ন বর্ণের নারী ও পুরুষের মধ্যে অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহের ফলে সমাজে অসংখ্য নতুন বা 'সংকর জাতি'-র উৎপত্তি হয়।
কঠোর অনুশাসন ও দূরত্ব: ব্রাহ্মণ শাস্ত্রকাররা বিভিন্ন জাতির মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ও একপাতে খাওয়া নিষিদ্ধ করেন এবং সমাজের এক বিরাট অংশকে 'অস্পৃশ্য' ঘোষণা করে সামাজিক ভেদাভেদ অনমনীয় করে তোলেন।
৮ প্রাচীন ভারতীয় সমাজে যৌথ পরিবারে নারীদের অবস্থান ও মর্যাদা কেমন ছিল? মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় সমাজের ভিত্তি ছিল যৌথ পরিবার, যেখানে নারীদের সামাজিক অবস্থানে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন আসে:
পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ব: পরিবার ছিল পুরুষপ্রধান, যেখানে গৃহপতি বা পিতার সিদ্ধান্তই ছিল সর্বোচ্চ। নারীদের আজীবন পিতা, স্বামী বা পুত্রের অভিভাবকত্বে থাকতে হতো।
স্বাধীনতার সংকোচন ও বাল্যবিবাহ: বৈদিক যুগের তুলনায় পরবর্তী যুগে মেয়েদের বেদপাঠে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং সমাজে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রচলন বৃদ্ধি পায়।
স্ত্রীধন ও বিকল্প আশ্রয়: মেয়েরা পৈতৃক সম্পত্তির অংশ না পেলেও বিয়ের সময় পাওয়া অলঙ্কার ও উপহার বা 'স্ত্রীধন'-এর ওপর তাদের সম্পূর্ণ স্বত্ব থাকত। তাছাড়া বৌদ্ধ ও জৈন সংঘে নারীরা ভিক্ষুণী হয়ে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা করতে পারতেন।
৯ প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুকুল প্রথা এবং গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের স্বরূপ ব্যাখ্যা করো। মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে শিক্ষাদানের মূল ঐতিহ্য ছিল আশ্রম বা গুরুকুল কেন্দ্রিক:
গুরুগৃহে বাস ও চরিত্র গঠন: শিষ্যরা নিজের বাড়ি ছেড়ে গুরুর কুটিরে অবস্থান করত এবং বিদ্যালাভের পাশাপাশি কঠোর সংযম, ব্রহ্মচর্য ও বিনম্র আচরণ শিখত।
মৌখিক ঐতিহ্য ও শ্রুতি: সে যুগে শুনে শুনে মনে রাখার প্রথা ছিল প্রবল, তাই বেদের অপর নাম 'শ্রুতি'। তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে সাথে গুরুগৃহের গৃহস্থালি কাজ ও সেবা করতে হতো।
পবিত্র সম্পর্ক ও গুরুদক্ষিণা: গুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক ছিল পিতা-পুত্রের মতো গভীর ও স্নেহপূর্ণ। শিক্ষা সমাপ্ত হলে শিষ্য সামর্থ্য অনুযায়ী স্বেচ্ছায় গুরুদক্ষিণা প্রদান করে সংসারে প্রবেশ করত।
১০ তক্ষশীলা মহাবিহারের শিক্ষা পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ছিল? VVI মান ৩
উত্তর:
গান্ধার অঞ্চলের তক্ষশীলা ছিল প্রাচীন ভারতের প্রথম সারির এক সুবিখ্যাত উচ্চ বিদ্যাপীঠ:
উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র: প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে প্রায় ১৬ বছর বয়সে দেশ-বিদেশের রাজপুত্র ও মেধাবী ছাত্ররা এখানে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সমবেত হতো।
পেশাভিত্তিক ও প্রায়োগিক পাঠক্রম: এখানে কেবল ধর্মশাস্ত্র নয়—চিকিৎসাবিদ্যা (আয়ুর্বেদ), ধনুর্বিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যা, হস্তীচালনা, ব্যাকরণ, জ্যোতিষ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে শেখানো হতো।
কৃতী ব্যক্তিত্বদের পীঠস্থান: মহান রাজনীতিক চাণক্য (কৌটিল্য), চিকিৎসক জীবক এবং পাণিনির মতো ভারতখ্যাত মনীষীরা এই তক্ষশীলার সাথেই গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
১১ প্রাচীন ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অহিংসার আদর্শ কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল? মান ৩
উত্তর:
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের ফলে ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসে লক্ষণীয় রূপান্তর দেখা দেয়:
যজ্ঞীয় পশুবলি হ্রাস: বৈদিক যুগে যাগযজ্ঞ উপলক্ষে ব্যাপক পশুবলি ও মাংস খাওয়ার রেওয়াজ ছিল, যা বুদ্ধ ও মহাবীরের অহিংস বাণীর প্রভাবে সমাজে নিন্দনীয় হয়ে ওঠে।
নিরামিষ আহারের সার্বজনীনতা: সাধারণ মানুষ প্রাণিহত্যা বর্জন করে শাকসবজি, দুধ, দই, ঘি, বিভিন্ন ডাল ও ফলমূলকে প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
আয়ুর্বেদে সুষম পথ্য: চরক ও সুশ্রুতের মতো তৎকালীন চিকিৎসকরাও সাত্ত্বিক ও লঘুপাক নিরামিষ খাদ্যকে সুস্থ দেহ ও দীর্ঘ জীবনের শ্রেষ্ঠ পথ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
১২ প্রাচীন ভারতের সেচব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যৌথ উদ্যোগ কেমন ছিল? মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে সেচব্যবস্থা সরকারি ও বেসরকারি উভয় যৌথ উদ্যোগেই সুদৃঢ় ভিত্তি পেয়েছিল:
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব: প্রজাদের দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচাতে ও রাজস্ব বাড়াতে মৌর্য ও গুপ্ত রাজারা নদী থেকে বড় বড় খাল কাটা ও সুদর্শন হ্রদের মতো বিশাল বাঁধ নির্মাণ করাতেন।
গ্রামীণ সমবায় ও কায়িক শ্রম: সাধারণ কৃষকরা দলবেঁধে নিজেদের জমিতে নদী থেকে ছোট নালা কাটত এবং যৌথ উদ্যোগে কুয়ো ও পুকুর খনন করত।
রক্ষণাবেক্ষণের অনুশাসন: অর্থশাস্ত্রে স্পষ্ট নিয়ম ছিল যে সেচনালা পরিষ্কার রাখা প্রতিটি কৃষকের অবশ্যকর্তব্য; যৌথ সেচে কেউ দায়িত্ব অবহেলা করলে তাকে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতো।
১৩ কুষাণ শাসনকালে ভারতীয় সংস্কৃতি ও পোশাকে কীভাবে বহিরাগত মধ্য এশিয়ার মিশ্রণ ঘটেছিল? মান ৩
উত্তর:
মধ্য এশিয়া থেকে আগত কুষাণদের শাসনামলে ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীবনে নতুন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে:
সেলাই করা পোশাকের সূচনা: আগে ভারতীয়রা মূলত সেলাইহীন ধুতি ও চাদর পরত; কুষাণদের হাত ধরে সেলাই করা কুর্তা, পাজামা বা ট্রাউজার এবং লম্বা কোট পরা শুরু হয়।
টুপি ও বুট জুতোর ব্যবহার: শরীরের মাপমতো পোশাক ছাড়াও বিভিন্ন নকশার টুপি এবং শক্ত চামড়ার বুট জুতো পরিধানের রেওয়াজ চালু হয়।
ভাস্কর্য ও মুদ্রার প্রভাব: কুষাণ ভাস্কর্যে রাজাদের এই আধুনিক বিদেশি পোশাকে দেখা যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপযোগী নিখুঁত দিনার স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ঘটে।
১৪ গুপ্ত যুগে জমি অনুদান বা অগ্রহার ব্যবস্থার ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে কী কী প্রভাব পড়েছিল? VVI মান ৩
উত্তর:
গুপ্ত আমলে ধর্মীয় কারণে নিষ্কর জমি দানের ফলে ভারতীয় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর ঘটে:
নতুন ভূস্বামী শ্রেণির সৃষ্টি: ব্রাহ্মণ ও মঠের সন্ন্যাসীরা কেবল ধর্মযাজক থাকেননি, বরং প্রজাদের থেকে কর আদায়কারী ক্ষমতাবান ভূস্বামীতে পরিণত হন।
প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ: দান করা গ্রামের ওপর রাজার সরাসরি শাসন বা বিচারক্ষমতা থাকত না, ফলে রাজার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে।
সামন্ততন্ত্রের পদধ্বনি: স্বাধীন কৃষকরা ক্রমে স্থানীয় ভূস্বামীদের অধীনস্থ প্রজায় পরিণত হয়, যা ভারতে পরবর্তী যুগের সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।
১৫ টীকা লেখো: সুদর্শন হ্রদ VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের সেচব্যবস্থার শ্রেষ্ঠ ও প্রামাণ্য নিদর্শন হলো গুজরাটের কাথিয়াবাড়ের সৌরাষ্ট্রের জুনাগড়ে অবস্থিত সুদর্শন হ্রদ।
নির্মাণ ও প্রসার: মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রাদেশিক শাসক পুষ্যগুপ্ত বৈশ্য পাহাড়ি নদীর জল আটকে এই কৃত্রিম জলাশয় নির্মাণ করেন। পরে সম্রাট অশোকের আমলে যবনরাজ তুষাস্প সেচের জন্য হ্রদ থেকে একাধিক খাল খনন করেন।
সংস্কার ও গুরুত্ব: ১৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রবল ঝড়ে বাঁধ ভেঙে গেলে শক মহাক্ষত্রপ রুদ্রদমন প্রজাদের ওপর বাড়তি কর না চাপিয়ে ব্যক্তিগত অর্থে তাঁর পহ্লব মন্ত্রী সুবিশাখের দ্বারা বাঁধটি মেরামত করান। পরবর্তীতে গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্তের প্রাদেশিক শাসক পর্ণদত্ত ও তাঁর পুত্র চক্রপালিত বাঁধটি পুনরায় সংস্কার করেন। রুদ্রদামনের জুনাগড় শিলালিপি থেকে এই হ্রদের দীর্ঘ চার শতাব্দীর ইতিহাস জানা যায়।
১৬ টীকা লেখো: অগ্রহার ব্যবস্থা VVI মান ৩
উত্তর:
গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নিষ্কর (করমুক্ত) জমি বা সম্পূর্ণ গ্রাম চিরতরে দান করার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রথাকে 'অগ্রহার ব্যবস্থা' বলা হতো।
গ্রহীতা ও অধিকার: সাধারণত বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত এবং বৌদ্ধ বা জৈন মঠ-মন্দিরকে এই জমি দান করা হতো। জমি প্রাপকরা বংশানুক্রমিকভাবে ওই জমি ভোগ করার এবং স্থানীয় কৃষকদের থেকে রাজস্ব আদায় করার পূর্ণ অধিকার পেতেন।
সামাজিক প্রভাব: অগ্রহার জমির ওপর রাজার সরাসরি কোনো শাসন বা রাজস্ব অধিকার থাকত না। এর ফলে গ্রামীণ সমাজে এক নতুন মধ্যস্বত্বভোগী ভূস্বামী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে এবং ভারতীয় সমাজে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা ত্বরান্বিত হয়।
১৭ টীকা লেখো: প্রাচীন ভারতের গিল্ড বা 'শ্রেণি' VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে একই পেশার কারিগর ও ব্যবসায়ীদের নিজস্ব পেশাগত স্বশাসিত সংস্থাকে 'শ্রেণি' বা গিল্ড বলা হতো (যেমন—তাঁতি, কুমোর, চামড়ার কারিগর ও বণিক শ্রেণি)।
কার্যাবলি ও নিয়ন্ত্রণ: প্রতিটি শ্রেণির নিজস্ব নিয়মকানুন ছিল। এরা কাঁচামাল সংগ্রহ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিক্রয়মূল্য স্থির করত। রাজারা এদের অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ করতেন না। শ্রেণির প্রধানকে বলা হতো 'জেঠক' বা 'শ্রেষ্ঠী'।
ব্যাঙ্কিং ভূমিকা: শ্রেণিগুলি আধুনিক ব্যাঙ্কের মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আমানত রাখত, নির্দিষ্ট সুদে ঋণ দিত এবং লভ্যাংশ থেকে মঠ-মন্দির ও সমাজকল্যাণমূলক কাজে অর্থ দান করত।
১৮ টীকা লেখো: সার্থবাহ VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যে দলবেঁধে বা কাফেলা নিয়ে ভ্রমণকারী বণিক দলকে 'সার্থ' এবং এই দলের প্রধান পথপ্রদর্শক ও নায়ককে 'সার্থবাহ' বলা হতো।
দায়িত্ব ও ভূমিকা: প্রাচীনকালে দুর্গম পর্বতমালা, ঘন অরণ্য ও জলদস্যু বা চোর-ডাকাতের হাত থেকে পণ্যভর্তি গাড়ি ও বণিকদের রক্ষা করার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করতেন সার্থবাহরা। তারা নতুন বাণিজ্যিক পথ ও বিশ্রামের নিরাপদ স্থান নির্বাচন করতেন।
ঐতিহাসিক প্রমাণ: বৌদ্ধ জাতকের গল্প এবং প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে (যেমন—বৃহৎকথা, দশকুমারচরিত) সার্থবাহদের অসাধারণ সাহসিকতা, বাণিজ্য জ্ঞান ও নেতৃত্বের অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
১৯ টীকা লেখো: 'পেরিফ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি' VVI মান ৩
উত্তর:
'পেরিফ্লাস অফ দ্য এরিথ্রিয়ান সি' (Periplus of the Erythraean Sea) হলো খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রচিত এক অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিকের লেখা সমুদ্র বাণিজ্যের অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।
গ্রন্থের অর্থ ও বিষয়: 'পেরিফ্লাস' শব্দের অর্থ উপকূল প্রদক্ষিণ বা সমুদ্রযাত্রা এবং 'এরিথ্রিয়ান সি' বলতে তখনকার লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের জলভাগকে বোঝানো হতো।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই বই থেকে প্রাচীন ভারতের প্রধান প্রধান সমুদ্র বন্দর (যেমন—পশ্চিমের ভারুকচ্ছ ও মুজিরিস এবং পূর্বের তাম্রলিপ্ত ও আরিকামেডু) এবং রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ভারতের সোনা, মশলা, সুতি বস্ত্র ও রেশম বাণিজ্যের বিশদ ও প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়।
২০ টীকা লেখো: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের মুদ্রা VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হলো সে যুগের নানা ধাতুর মুদ্রা।
আহত মুদ্রা ও প্রাচীন মাধ্যম: বৈদিক যুগে নিষ্ক ও মনা নামে সোনা বা অলঙ্কার বিনিময় মাধ্যম ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে রূপো ও তামার পাতে প্রতীক বা ছাপ মেরে ভারতের আদিমতম 'আহত মুদ্রা' (Punch-marked coins) এবং কার্যাপণ প্রচলিত হয়।
কুষাণ ও গুপ্তদের মুদ্রা: কুষাণ আমলে রোমান মুদ্রার অনুকরণে উচ্চমানের সোনার মুদ্রা 'দিনার' ও 'সুবর্ণ' ব্যাপকভাবে চালু হয়। গুপ্ত যুগেও সোনার দিনার ও সুবর্ণের পাশাপাশি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে উন্নত রুপোর মুদ্রা 'রূপক' চালু করা হয়েছিল।
২১ টীকা লেখো: ফা-হিয়েনের চোখে চণ্ডালদের অবস্থা VVI মান ৩
উত্তর:
গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে (খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক) ভারত ভ্রমণকারী চীনা বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী ফা-হিয়েন সমাজের নিম্নবর্গীয় চণ্ডালদের চরম সামাজিক বঞ্চনার কথা উল্লেখ করেছেন।
অস্পৃশ্যতার রূপ: সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষ চণ্ডালদের চরম অপবিত্র ও অস্পৃশ্য মনে করত। শবদাহ করা, ময়লা আবর্জনা ফেলা ও শিকারের কাজ করত তারা। তাদের গ্রামের বা মূল শহরের সীমানার বাইরে আলাদাভাবে বসবাস করতে হতো।
সতর্ক সংকেত: ফা-হিয়েন লিখেছেন, চণ্ডালরা যখন শহরে বা বাজারে কোনো কাজে প্রবেশ করত, তখন তাদের কাঠের টুকরো ঠুকে ঠুকে শব্দ করতে হতো, যাতে সেই শব্দ শুনে উচ্চবর্ণের মানুষ সতর্ক হয়ে দূরে সরে যেতে পারে এবং তাদের অপবিত্র না হতে হয়।
২২ টীকা লেখো: দ্বিতীয় নগরায়ণ VVI মান ৩
উত্তর:
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গা ও যমুনা উপত্যকাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় উপমহাদেশে নতুন নতুন নগরের বিকাশ ও বিস্তারকে 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলা হয়।
উত্থানের কারণ: লোহার কুড়ুল ও লাঙলের ব্যবহারের ফলে ঘন জঙ্গল কেটে কৃষিজমির বিস্তার ঘটে, খাদ্যশস্যের বিপুল উদ্বৃত্ত তৈরি হয় এবং কারিগরি শিল্প ও দূরপাল্লার বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
প্রধান নগরসমূহ: এই যুগে পাটলিপুত্র, রাজগৃহ, কৌশাম্বী, বারাণসী, শ্রাবস্তী, বৈশালী, চম্পা এবং উজ্জয়িনী সুরক্ষিত প্রাচীর ঘেরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। হরপ্পার প্রথম নগরায়ণের পর এটি ছিল প্রাচীন ভারতের দ্বিতীয় নগর বিপ্লব।
২৩ টীকা লেখো: প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত বন্দরসমূহ (তাম্রলিপ্ত ও ভারুকচ্ছ) VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য প্রধানত দুটি সমুদ্র উপকূলের বিখ্যাত বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
পূর্ব উপকূলের তাম্রলিপ্ত: অবিভক্ত বাংলার রূপনারায়ণ নদীর তীরে অবস্থিত তাম্রলিপ্ত (বর্তমান তমলুক) ছিল বঙ্গোপসাগরের প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর। এখান থেকে শ্রীলঙ্কা (সিংহল), মায়ানমার, সুমাত্রা, জাভা এবং চীনের সঙ্গে জাহাজ যাতায়াত করত।
পশ্চিম উপকূলের ভারুকচ্ছ: গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনায় অবস্থিত প্রাচীন ভারুকচ্ছ (বা ভৃগুকচ্ছ) ছিল আরব সাগরের প্রবেশদ্বার। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগর, আরব দেশ, মিশর এবং সুদূর রোমান সাম্রাজ্যের সাথে মসলা, রত্ন ও বস্ত্রের নিয়মিত বাণিজ্য চলত।
২৪ টীকা লেখো: 'যবনপ্রিয়' ও ভারত-রোম বাণিজ্য VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে গ্রিক ও রোমান বিদেশিদের 'যবন' বলা হতো। রোমানদের কাছে ভারতীয় গোলমরিচ অত্যন্ত সুস্বাদু ও মহার্ঘ বস্তু হওয়ায় সংস্কৃতে গোলমরিচের নাম দেওয়া হয় 'যবনপ্রিয়'।
রোমের চাহিদা: রোমের অভিজাত সমাজে ভারতীয় গোলমরিচ, সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়, রেশম, মুক্তো ও সুগন্ধি দ্রব্যের বিপুল কদর ছিল। কেরলের মুজিরিস ও আরিকামেডু বন্দর থেকে জাহাজে করে এসব পণ্য রোমে পাঠানো হতো।
বাণিজ্যিক ভারসাম্য: পণ্যের বিনিময়ে রোমানরা জাহাজে করে লক্ষ লক্ষ সোনার ও রুপোর মুদ্রা ভারতে পাঠাত। দক্ষিণ ভারতের বহু প্রত্নক্ষেত্রে প্রাচীন রোমান মুদ্রার ভাণ্ডার এই রমরমা বাণিজ্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
২৫ টীকা লেখো: চতুরাশ্রম প্রথা মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন হিন্দু সমাজে উচ্চবর্ণের পুরুষদের সম্পূর্ণ পার্থিব ও পারমার্থিক জীবনকে সুশৃঙ্খলভাবে চারটি পর্যায়ে ভাগ করার নিয়মকে চতুরাশ্রম বলা হতো।
চারটি পর্যায়: (১) ব্রহ্মচর্য: ছাত্রাবস্থায় গুরুগৃহে থেকে কঠোর সংযম সহকারে বেদ ও শাস্ত্র অধ্যয়ন। (২) গার্হস্থ্য: বিবাহ করে সংসার ধর্ম পালন, সন্তান পালন ও অতিথিসেবা। (৩) বানপ্রস্থ: পরিণত বয়সে সংসারের মায়া কাটিয়ে অরণ্যে গিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করা। (৪) সন্ন্যাস: জীবনের শেষভাগে সমস্ত জাগতিক মোহ ছিন্ন করে মোক্ষলাভের উদ্দেশ্যে পরিব্রাজক সন্ন্যাসী জীবনযাপন।
২৬ টীকা লেখো: প্রাচীন ভারতীয় বস্ত্রশিল্প মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় কারিগরি শিল্পের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রধান ও বৈচিত্র্যময় ছিল বস্ত্রশিল্প। ভারতে সুতি (কার্পাস), রেশম এবং ক্ষৌম (তিসির আঁশ থেকে প্রস্তুত) বস্ত্র তৈরি হতো।
বিখ্যাত কেন্দ্রসমূহ: উত্তর ভারতের কাশী রেশমি ও সুতি কাপড়ের জন্য, মথুরা উৎকৃষ্ট কার্পাসের জন্য এবং অবিভক্ত বাংলা (বঙ্গ ও পুণ্ড্রবর্ধন) তার অসামান্য সূক্ষ্ম মসলিনের জন্য জগৎখ্যাত ছিল।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি: প্রাচীন গ্রিক ও রোমান পর্যটকরা লিখেছিলেন যে ভারতীয় বস্ত্র ছিল মাকড়সার জালের মতো সূক্ষ্ম ও বাতাসের মতো হালকা, যা প্রাচীন বিশ্বের বাজারে সবচেয়ে বহুমূল্য পণ্য হিসেবে পরিগণিত হতো।
২৭ টীকা লেখো: নালন্দা মহাবিহার VVI মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল নালন্দা মহাবিহার, যা আধুনিক বিহার রাজ্যের রাজগৃহ ও পাটনার কাছে অবস্থিত।
প্রতিষ্ঠা ও ব্যাপ্তি: খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে হর্ষবর্ধন ও পাল রাজারা এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এখানে প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী এবং দেড় হাজার প্রখ্যাত পণ্ডিত আচার্য বসবাস করতেন।
আন্তর্জাতিক পরিচিতি: ভারত ছাড়াও চীন, তিব্বত, কোরিয়া, জাপান ও সুমাত্রা থেকে ছাত্ররা এখানে বৌদ্ধ দর্শন, তর্কশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়তে আসত। কঠোর প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রাজকীয় অর্থে পরিচালিত হতো।
২৮ টীকা লেখো: হিউয়েন সাঙ-এর চোখে নালন্দা মহাবিহার VVI মান ৩
উত্তর:
চীনা বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতকে রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ভারতে এসে পাঁচ বছর নালন্দায় অবস্থান করেন এবং অধ্যক্ষ আচার্য শীলভদ্রের কাছে যোগশাস্ত্র ও বৌদ্ধ দর্শন অধ্যয়ন করেন।
উচ্চমানের পাঠ ও শৃঙ্খলা: হিউয়েন সাঙ লিখেছেন, নালন্দার শিক্ষার্থীদের মেধা, জ্ঞান এবং কঠোর নৈতিক শৃঙ্খলা ছিল অতুলনীয়। সেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শাস্ত্রীয় আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক চলত।
বিশাল গ্রন্থাগার: তিনি নালন্দার 'ধর্মগঞ্জ' নামক সুবিশাল নয়তলা বিশিষ্ট পাঠাগারের তিনটি ভবন—রত্নসাগর, রত্নোদধি ও রত্নরঞ্জকের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যেখানে দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ অমূল্য পুঁথি সংরক্ষিত ছিল।
২৯ টীকা লেখো: প্রাচীন ভারতের চিকিৎসা ও খাদ্য সংস্কৃতি মান ৩
উত্তর:
প্রাচীন ভারতে স্বাস্থ্যরক্ষা এবং খাদ্যাভ্যাস একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যার প্রমাণ মেলে আয়ুর্বেদের মহান গ্রন্থ 'চরক সংহিতা' ও 'সুশ্রুত সংহিতা'-য়।
পথ্য ও খাদ্যবিচার: চিকিৎসকদের মতে রোগ নিরাময়ের মূল ভিত্তি ছিল উপযুক্ত ও সুষম আহার। ঋতু অনুযায়ী আহার পরিবর্তন, লঘুপাক খাদ্য গ্রহণ এবং বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার ছিল চিকিৎসার অঙ্গ।
অহিংসার প্রভাব: প্রাচীন ভারতে ভাত, রুটি, দুধ, ঘি, ডাল ও ফলমূলের পাশাপাশি প্রথম দিকে মাংস খাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অহিংসার আদর্শের প্রভাবে ভারতীয় সমাজে নিরামিষ আহারের বিস্তার ঘটেছিল।
১ প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষিব্যবস্থা এবং উন্নত সেচব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দাও। VVI মান ৫
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনৈতিক জীবনের মেরুদণ্ড ছিল কৃষিকাজ। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকায় কৃষিব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক উন্নতি দেখা যায়:
১. লোহার অস্ত্রের ব্যবহার ও ফসল উৎপাদন: লোহার ভারী ফালযুক্ত লাঙল এবং বলদের ব্যবহারের ফলে গভীর চাষাবাদ সম্ভব হয়। প্রধান ফসল ছিল ধান (যেমন—শালি ও ব্রীহি ধান)। গাঙ্গেয় উপত্যকা ছাড়াও অন্যান্য অঞ্চলে গম, যব, বিভিন্ন ডাল, আখ, তুলো, নীল এবং সর্ষে ও তিলের মতো তৈলবীজ প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হতো।
২. কৃত্রিম সেচব্যবস্থার বিকাশ: ভারতে কৃষিকাজ সম্পূর্ণ বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। মৌর্য ও গুপ্ত যুগে সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে নদী থেকে খাল খনন, পুষ্করিণী ও কূপ নির্মাণ করা হতো। সেচের জন্য রাষ্ট্র 'উদকভাগ' নামে জলকর আদায় করত।
৩. সুদর্শন হ্রদের ঐতিহাসিক প্রকল্প: গুজরাটের সৌরাষ্ট্রের শুষ্ক অঞ্চলে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে প্রাদেশিক শাসক পুষ্যগুপ্ত বৈশ্য পাহাড়ি নদীর জল আটকে বিখ্যাত সুদর্শন হ্রদ তৈরি করেন। পরে অশোকের আমলে খাল কাটা হয় এবং শক শাসক রুদ্রদমন ও গুপ্ত সম্রাট স্কন্দগুপ্তের আমলে এটি বারবার সংস্কার করে চাষের জল নিশ্চিত করা হয়।
৪. রাজস্ব ও সামাজিক স্থায়িত্ব: কৃষকদের কাছ থেকে উৎপন্ন ফসলের এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) সাধারণ কর হিসেবে আদায় হতো। উন্নত সেচব্যবস্থা ও উর্বর পলল মাটির প্রাচুর্যের কারণে ভারত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, যা প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছিল।
২ প্রাচীন ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিচয় দাও। VVI মান ৫
উত্তর:
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকে ভারতীয় উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছিল:
১. বাণিজ্য পথ ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য: স্থলপথে উত্তরাপথ (তক্ষশীলা থেকে তাম্রলিপ্ত) এবং দক্ষিণাপথ ছিল প্রধান সড়ক। বণিকরা দলবেঁধে সার্থবাহের নেতৃত্বে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য পরিবহন করত। একই পেশার বণিকরা 'শ্রেণি' গঠন করে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত।
২. প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর: পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরের মুখে তাম্রলিপ্ত এবং পশ্চিম উপকূলে আরব সাগরের মুখে ভারুকচ্ছ ও মুজিরিস বন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য চলত।
৩. রোমানদের সঙ্গে লাভজনক বাণিজ্য: খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের সাথে ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্য শীর্ষে পৌঁছায়। ভারত থেকে গোলমরিচ (যার রোমান নাম ছিল 'যবনপ্রিয়'), সূক্ষ্ম মসলিন, রেশম, হাতির দাঁত, দামি পাথর ও ঔষধ রোমে রপ্তানি করা হতো।
৪. সোনার আমদানি ও প্লিনির আক্ষেপ: রোমানরা ভারতীয় বিলাসবহুল পণ্যের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ সোনার ও রুপোর মুদ্রা ভারতে পাঠাত। রোমান পণ্ডিত প্লিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন যে, বিলাসব্যসনে মেতে থাকার কারণে রোমের বিপুল স্বর্ণভাণ্ডার ভারতবর্ষে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত রোমান স্বর্ণমুদ্রা এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ।
৩ প্রাচীন ভারতীয় সমাজে বর্ণব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের (বিশেষত চণ্ডালদের) জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরো। VVI মান ৫
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ছিল চতুর্বর্ণ ও বহুবিধ জাতির জটিল কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত:
১. বর্ণভেদ প্রথার কঠোরতা: সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চারটি প্রধান বর্ণে বিভক্ত ছিল। কালক্রমে গুণ ও কর্মভিত্তিক বর্ণব্যবস্থা জন্মভিত্তিক অনমনীয় জাতিভেদ প্রথায় পরিণত হয় এবং বহু সংকর জাতির উৎপত্তি হয়। উচ্চবর্ণের দ্বিজরা সমস্ত সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত।
২. চতুরাশ্রম ও পারিবারিক জীবন: উচ্চবর্ণের পুরুষদের জীবন ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস—এই চার স্তরে বিন্যস্ত ছিল। পরিবার ছিল যৌথ এবং পুরুষতান্ত্রিক। নারীদের স্বাধীনতা বৈদিক যুগের তুলনায় হ্রাস পায় এবং বাল্যবিবাহের প্রচলন বৃদ্ধি পায়।
৩. অস্পৃশ্যতা ও চণ্ডালদের দুরবস্থা: সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরে ছিল চণ্ডাল, নিষাদ ও শবর সম্প্রদায়। এদের অপবিত্র ও অস্পৃশ্য মনে করা হতো। চণ্ডালদের গ্রামের বা শহরের বাইরে আলাদা বস্তিতে থাকতে হতো এবং তারা শ্মশান পাহারা ও আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করত।
৪. ফা-হিয়েনের বিবরণ: পঞ্চম শতকে গুপ্ত যুগে ভারত ভ্রমণকারী চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন লিখেছেন, চণ্ডালরা শহরে বা বাজারে ঢুকলে কাঠে কাঠ ঠুকে শব্দ করে উচ্চবর্ণের মানুষকে সতর্ক করত, যাতে তাদের ছোঁয়া না লাগে। এই চিত্র থেকে বোঝা যায় প্রাচীন যুগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি সমাজে চরম শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্য বিদ্যমান ছিল।
৪ নালন্দা মহাবিহারের শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠক্রম, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এবং খ্যাতির কারণ আলোচনা করো। VVI মান ৫
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার শ্রেষ্ঠ স্মারক ছিল বিহারে অবস্থিত আন্তর্জাতিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা মহাবিহার:
১. প্রতিষ্ঠা ও বিশালত্ব: খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্ত এটি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে হর্ষবর্ধন এবং পাল রাজাদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় এটি বিকশিত হয়। এখানে দেশ-বিদেশের প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী এবং দেড় হাজার প্রখ্যাত পণ্ডিত আচার্য বিদ্যাচর্চা করতেন।
২. কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষা: নালন্দায় ভর্তি হওয়া সহজ ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের তোরণে উপস্থিত 'দ্বারপণ্ডিত' কঠিন শাস্ত্রীয় পরীক্ষা নিতেন। মাত্র কুড়ি থেকে তিরিশ শতাংশ ছাত্র এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তির সুযোগ পেত।
৩. বহুমুখী পাঠক্রম: এখানে কেবল বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন নয়—বেদ, তর্কশাস্ত্র, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্র সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হতো। চীনা পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ এখানে অধ্যক্ষ আচার্য শীলভদ্রের কাছে জ্ঞানার্জন করেছিলেন।
৪. আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও 'ধর্মগঞ্জ': নালন্দার সুবিশাল পাঠাগার 'ধর্মগঞ্জ'-এর তিনটি বহুতল ভবন—রত্নসাগর, রত্নোদধি ও রত্নরঞ্জকে লক্ষাধিক দুর্লভ পুঁথি সংরক্ষিত ছিল। পার্শ্ববর্তী এক থেকে দুইশত গ্রামের করমুক্ত রাজস্ব দিয়ে ছাত্রদের থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত হতো, যা নালন্দাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে পরিণত করেছিল।
৫ মৌর্য ও গুপ্ত আমলের অর্থনৈতিক ও ভূমি ব্যবস্থার একটি তুলনামূলক আলোচনা করো। মান ৫
উত্তর:
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে মৌর্য আমল এবং গুপ্ত আমলের অর্থনৈতিক ও ভূমি ব্যবস্থার মধ্যে কয়েকটি সুস্পষ্ট রূপান্তর ও পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়:
১. কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বিকেন্দ্রীকরণ: মৌর্য আমলে রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং জমির ওপর সম্রাটের একচ্ছত্র কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল। 'সীতাধ্যক্ষ'-এর অধীনে রাজকীয় খাসজমিতে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চাষাবাদ পরিচালিত হতো। কিন্তু গুপ্ত আমলে ভূমি ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে।
২. অগ্রহার ব্যবস্থার বিস্তার: মৌর্য যুগে ধর্মীয় জমিদানের প্রথা ছিল সীমিত। কিন্তু গুপ্ত যুগে ব্যাপক আকারে ব্রাহ্মণ এবং বৌদ্ধ-জৈন মঠকে করমুক্ত নিষ্কর জমি বা আস্ত গ্রাম দান করা শুরু হয়, যাকে 'অগ্রহার ব্যবস্থা' বলা হতো। এর ফলে জমি প্রাপকরা বংশানুক্রমিক স্বাধীন ভূস্বামীতে পরিণত হয়।
৩. কর ব্যবস্থা ও রাজস্ব: উভয় আমলেই কৃষকদের কাছ থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ সাধারণ রাজস্ব (ভাগ) এবং উদকভাগ (জলকর) আদায় হতো। তবে মৌর্য আমলে নগদ কর (হিরণ্য) ও উৎপন্ন পণ্যে কড়াকড়ি বেশি ছিল, গুপ্ত যুগে কৃষকদের স্থানীয় ভূস্বামীদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে।
৪. মুদ্রার ব্যবহার: মৌর্য যুগে প্রধানত রুপো ও তামার পাতে সিল মারা 'আহত মুদ্রা' এবং কার্যাপণ ব্যবহৃত হতো। কিন্তু গুপ্ত যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধার জন্য রোমান মুদ্রার আদলে উচ্চমানের প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা (দিনার, সুবর্ণ) এবং রুপোর মুদ্রা (রূপক) প্রচলিত ছিল। গুপ্ত আমলের ভূমিদান প্রথা ভারতে পরবর্তীকালের সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
৬ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের 'দ্বিতীয় নগরায়ণ'-এর পটভূমি এবং প্রাচীন ভারতের নগর জীবন ও বিনোদনের রূপরেখা আলোচনা করো। VVI মান ৫
উত্তর:
হরপ্পা সভ্যতার পতনের প্রায় এক সহস্রাব্দ পর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গঙ্গা ও যমুনা নদী উপত্যকায় নতুন নগরগুলির যে জোয়ার দেখা যায়, তাকে 'দ্বিতীয় নগরায়ণ' বলা হয়:
১. উত্থানের অনুকূল কারণ: দ্বিতীয় নগরায়ণের মূল চালিকাশক্তি ছিল লোহার অস্ত্রের ব্যাপক প্রয়োগ, যার ফলে জঙ্গল কেটে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তৈরি হয়। উৎপন্ন উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য অকৃষি পেশার (কারিগর, বণিক, শাসক ও সেনা) বিকাশ ঘটায়। ফলস্বরূপ পাটলিপুত্র, রাজগৃহ, বারাণসী, কৌশাম্বী, শ্রাবস্তী ও উজ্জয়িনীর মতো সুরক্ষিত মহানগরী গড়ে ওঠে।
২. গিল্ড বা শ্রেণির বিকাশ: নগরগুলিতে তাঁতি, কামার, কুমোর ও স্বর্ণকারদের সুসংগঠিত ব্যবসায়িক সমিতি বা 'শ্রেণি' কাজ করত। এরা পণ্যের মান নির্ধারণ করত এবং আধুনিক ব্যাঙ্কের ভূমিকা পালন করে নগর অর্থনীতিকে চাঙা রাখত।
৩. নগর জীবনের বিনোদন ও সংস্কৃতি: নগরবাসী ও সাধারণ মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য নাটক অভিনয়, সংগীত, নৃত্যকলা ও আবৃত্তির প্রচলন ছিল। পাশা খেলা, রথ চালনা ও মৃগয়া বা শিকার ছিল উচ্চবিত্তদের প্রধান বিনোদন।
৪. মেলা ও সামাজিক উৎসব: বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক ও ধর্মীয় মেলা আয়োজিত হতো। 'সমাজ' নামক আনন্দমেলায় নানা ধরনের নাচ-গান ও খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে সর্বস্তরের নাগরিকরা আনন্দ উপভোগ করত। দ্বিতীয় নগরায়ণ ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিভূমিকে আধুনিক রূপ দিয়েছিল।
৭ প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের নরনারীর পোশাক-পরিচ্ছদ, অলঙ্কার এবং খাদ্যাভ্যাসের বিস্তারিত বিবরণ দাও। মান ৫
উত্তর:
প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো মানুষের পরিধেয় বস্ত্র, গয়না এবং রুচিশীল খাদ্যাভ্যাস:
১. ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও কুষাণদের প্রভাব: সাধারণ ভারতীয় নরনারীর প্রধান পোশাক ছিল শরীরের নিম্নাংশে পরিহিত 'অন্তরীয়' (ধুতি বা শাড়ির মতো বস্ত্র) এবং ঊর্দ্ধাঙ্গে জড়ানো 'উত্তরীয়' (চাদর)। সুতি, ক্ষৌম ও রেশমের পোশাক পরা হতো। পরবর্তীতে মধ্য এশিয়া থেকে কুষাণরা ভারতে আসার পর সেলাই করা জামা, পাজামা বা ট্রাউজার, লম্বা কোট বা কুর্তা, টুপি এবং চামড়ার শক্ত বুট জুতোর প্রচলন শুরু হয়।
২. অলঙ্কারের ব্যবহার: প্রাচীন ভারতীয় নারী ও পুরুষ উভয়েই অলঙ্কারপ্রিয় ছিল। সোনা, রূপো, তামা, ব্রোঞ্জ, মুক্তো ও হাতির দাঁত দিয়ে নানা অলঙ্কার তৈরি হতো। কণ্ঠহার, কঙ্কণ (বালা), কুণ্ডল (কানের দুল), মেখলা (কোমরবন্ধনী) ও নূপুর ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
৩. প্রধান খাদ্য ও পানীয়: প্রধান খাদ্য ছিল ধান থেকে প্রস্তুত ভাত এবং গম ও যব থেকে তৈরি রুটি। সঙ্গে থাকত দুধ, দই, মাখন, ঘি, বিভিন্ন ডাল ও শাকসবজি। গুড় ও মধু দিয়ে তৈরি নানারকম মিষ্টান্ন জনপ্রিয় ছিল। পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো সোমরস, সুরা ও ফলের রস।
৪. নিরামিষ আহারের বিস্তার ও চিকিৎসা পথ্য: প্রথমদিকে মাছ ও মাংসের ব্যাপক প্রচলন থাকলেও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের অহিংসার আদর্শের প্রভাবে বৃহৎ জনগোষ্ঠী নিরামিষাশী হয়ে ওঠে। চরক ও সুশ্রুতের আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী সুষম ও ঋতুভিত্তিক লঘুপাক খাদ্য গ্রহণ ছিল প্রাচীন ভারতীয় জীবনযাত্রার আদর্শ।