WBBSE Class 7 History Chapter 7 Question Answer | সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস সপ্তম অধ্যায় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবই 'অতীত ও ঐতিহ্য'-এর সপ্তম অধ্যায়: জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি : সুলতানি ও মুঘল যুগ-এর সম্পূর্ণ অধ্যায়ভিত্তিক ও পাঠ্যবইয়ের সমস্ত প্রশ্নোত্তর এখানে সুবিন্যস্তভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো। সুলতানি ও মুঘল যুগের মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজ, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক, ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ আন্দোলন (অলভার ও নায়নার সাধক, কবীর, নানক, মীরাবাঈ, শ্রীচৈতন্যদেব, শঙ্করদেব), দীন-ই ইলাহি, ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যরীতি ও সৌধনির্মাণ (সুলতানি আমল, মুঘল আমল ও আঞ্চলিক স্থাপত্য—বাংলা, পান্ডুয়া, গৌড়, গুজরাট, বিজাপুর), মুঘল চিত্রশিল্প ও অলংকরণ, হিন্দুস্তানি সংগীত ও বাদ্যযন্ত্র (আমির খসরু, তানসেন), মণিপুরী নৃত্যশৈলী, ফারসি সাহিত্য ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিকাশ (অনুবাদ সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্যজীবনী, নাথ সাহিত্য) এবং সামরিক ও কৃষি প্রযুক্তির যুগান্তকারী পরিবর্তন সংক্রান্ত সমস্ত সঠিক উত্তর নির্বাচন (MCQ), এক কথায় সম্পূর্ণ বাক্যে উত্তর (VSA), ঠিক বা ভুল নির্ণয়, বিবৃতি ও ব্যাখ্যা নির্বাচন, বেমানান শব্দ নির্ণয়, ‘ক’ স্তম্ভের সাথে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও, দু-তিনটি বাক্যে সংক্ষিপ্ত উত্তর (মান ২), ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর (মান ৩) এবং রচনাধর্মী বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর (মান ৫)-এর নিখুঁত ও পরীক্ষামুখী সমাধান দেওয়া হলো।
১ সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো
২ একটি সম্পূর্ণ বাক্যে উত্তর দাও
৩ ঠিক বা ভুল নির্ণয় করো
৪ বিবৃতি ও সঠিক ব্যাখ্যা নির্বাচন করো
৫ বেমানান শব্দটি খুঁজে বের করো
৬ ‘ক’ স্তম্ভের সাথে ‘খ’ স্তম্ভ মেলাও
প্রশ্ন স্তম্ভ (মেলানোর জন্য):
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (১) আলাই দরওয়াজা | (ক) মহম্মদ আদিল শাহ |
| (২) বুলন্দ দরওয়াজা | (খ) সিকান্দর শাহ |
| (৩) বিজাপুরের গোল গুম্বদ | (গ) বরবক শাহ |
| (৪) পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ | (ঘ) আলাউদ্দিন খলজি |
| (৫) গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা | (ঙ) সম্রাট আকবর |
| ‘ক’ স্তম্ভ | সঠিক মেলবন্ধন | ‘খ’ স্তম্ভের সঠিক উত্তর |
|---|---|---|
| (১) আলাই দরওয়াজা | (১) - (ঘ) | আলাউদ্দিন খলজি |
| (২) বুলন্দ দরওয়াজা | (২) - (ঙ) | সম্রাট আকবর |
| (৩) বিজাপুরের গোল গুম্বদ | (৩) - (ক) | মহম্মদ আদিল শাহ |
| (৪) পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ | (৪) - (খ) | সিকান্দর শাহ |
| (৫) গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা | (৫) - (গ) | বরবক শাহ |
প্রশ্ন স্তম্ভ (মেলানোর জন্য):
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (১) তুতিনামা | (ক) আবুল ফজল |
| (২) তাজ-উল মাসির | (খ) অল বিরুনি |
| (৩) আইন-ই আকবরি | (গ) জিয়া নকশাবি |
| (৪) মুন্তাখাব-উৎ তওয়ারিখ | (ঘ) হাসান নিজামি |
| (৫) কিতাব-অল হিন্দ | (ঙ) বদাউনি |
| ‘ক’ স্তম্ভ | সঠিক মেলবন্ধন | ‘খ’ স্তম্ভের সঠিক উত্তর |
|---|---|---|
| (১) তুতিনামা | (১) - (গ) | জিয়া নকশাবি |
| (২) তাজ-উল মাসির | (২) - (ঘ) | হাসান নিজামি |
| (৩) আইন-ই আকবরি | (৩) - (ক) | আবুল ফজল |
| (৪) মুন্তাখাব-উৎ তওয়ারিখ | (৪) - (ঙ) | বদাউনি |
| (৫) কিতাব-অল হিন্দ | (৫) - (খ) | অল বিরুনি |
প্রশ্ন স্তম্ভ (মেলানোর জন্য):
| ‘ক’ স্তম্ভ | ‘খ’ স্তম্ভ |
|---|---|
| (১) শ্রীকৃষ্ণকীর্তন | (ক) সৈয়দ আলাওল |
| (২) শ্রীকৃষ্ণবিজয় | (খ) কৃষ্ণদাস কবিরাজ |
| (৩) চৈতন্যচরিতামৃত | (গ) কাশীরাম দাস |
| (৪) পদ্মাবতী | (ঘ) বড়ু চণ্ডীদাস |
| (৫) মহাভারতের বাংলা অনুবাদ | (ঙ) মালাধর বসু |
| ‘ক’ স্তম্ভ | সঠিক মেলবন্ধন | ‘খ’ স্তম্ভের সঠিক উত্তর |
|---|---|---|
| (১) শ্রীকৃষ্ণকীর্তন | (১) - (ঘ) | বড়ু চণ্ডীদাস |
| (২) শ্রীকৃষ্ণবিজয় | (২) - (ঙ) | মালাধর বসু |
| (৩) চৈতন্যচরিতামৃত | (৩) - (খ) | কৃষ্ণদাস কবিরাজ |
| (৪) পদ্মাবতী | (৪) - (ক) | সৈয়দ আলাওল |
| (৫) মহাভারতের বাংলা অনুবাদ | (৫) - (গ) | কাশীরাম দাস |
৭ দু - তিনটি বাক্যে উত্তর দাও (সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্নোত্তর)
সুলতানি ও মুঘল যুগে শস্যের মধ্যে গম, যব, ধান, ডাল এবং মসুরের চাষ হতো। গাঙ্গেয় সমভূমিতে উৎপন্ন ফসলের মধ্যে আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি ছিল; এছাড়া আঙুর, খেজুর, জাম, কলা, কাঁঠাল ও নারকেলের চাষ হতো। সবজি ও মশলার মধ্যে শাক, পটোল, বেগুন, মোচা, লঙ্কা, আদা এবং চন্দনকাঠ ও ঘৃতকুমারীর চাষ হতো।
সেকালে সমস্ত দিন-রাতকে আটটি ‘প্রহর’ (ফারসিতে ‘পাস’)-এ ভাগ করা হতো, যার একেকটি প্রহর আজকের হিসাবে প্রায় তিনঘণ্টা। আটটি প্রহর আবার ষাটটি ‘ঘড়ি’তে (এক ঘড়ি সমান চব্বিশ মিনিট) এবং প্রতিটি ঘড়ি ষাটটি ‘পল’-এ (মোট তিনহাজার ছশো পল) বিভক্ত ছিল। পাঁজি ও জলঘড়ি দেখে সময় নির্ধারণ করা হতো।
মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণেরা সমাজের অন্যান্য শ্রেণিদের সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকারের উপর নানা নিষেধ আরোপ করত। অব্রাহ্মণদের পবিত্র ধর্মীয়গ্রন্থ পাঠের স্বাধীনতা কিংবা সমানভাবে মন্দিরে যাওয়ার অধিকার ছিল না। অন্য জাতি বা বর্ণের মধ্যে একসঙ্গে খাওয়া বা বিয়ে করাও নিষিদ্ধ ছিল।
খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকের গোড়ায় দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদ জনপ্রিয় করেছিলেন অলভার এবং নায়নার সাধকরা। পরবর্তীকালে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতকে নামদেব, জ্ঞানেশ্বর, তুকারাম, রামানন্দ, কবীর, গুরু নানক, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, শ্রীচৈতন্যদেব এবং সাধিকা মীরাবাঈ প্রমুখ ভারতের নানাদিকে ভক্তিবাদের প্রচার করেছিলেন।
হিন্দি ভাষায় দুই পংক্তির কবিতাকে ‘দোহা’ বলে। ভক্তিসাধক কবীরের দোহার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষ ঈশ্বরকে পাওয়ার কথা শুনত। কারখানার মজুর, চাষি, গ্রামের মোড়ল—সবার মুখের ভাষাই ছিল কবীরের দোহার ভাষা।
সুফি সাধকদের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে ‘সিলসিলা’ বলা হয় (যেমন চিশতি ও সুহরাবর্দি গোষ্ঠী)। চিশতি সুফিদের জীবন ছিল খোলামেলা; তাঁরা ধর্ম, অর্থ বা ক্ষমতার মাপকাঠিতে মানুষকে বিচার করতেন না। তাঁরা রাজনীতি ও রাজদরবার থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতেন।
সুফি সাধন ধারায় গুরুকে বলা হতো ‘পির’ এবং শিষ্যকে বলা হতো ‘মুরিদ’। সুফি সিলসিলার প্রধান সাধক বা পির তাঁর মুরিদদের সঙ্গে ‘খানকা’য় বা আশ্রমে থাকতেন এবং বেছে নেওয়া ‘খলিফা’ বা উত্তরাধিকারীদের তাঁদের ধর্মভাবনা ও দর্শন দিয়ে যেতেন।
সুফিরা প্রধানত দুই প্রকারের ছিল—‘বা-শরা’ এবং ‘বে-শরা’। যাঁরা ইসলামীয় আইন (শরা) মেনে চলত তাঁদের ‘বা-শরা’ বলা হতো, যেমন চিশতি এবং সুহরাবর্দিরা। আর যে সুফিরা এই ইসলামীয় আইন মানত না তাঁদের ‘বে-শরা’ বলা হতো, যেমন যাযাবর সুফি সম্প্রদায় কালানদার।
শ্রীচৈতন্য কীর্তনগানকে জনসংযোগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে দু-রকমের কীর্তন সংগঠিত করেন—নামকীর্তন ও নগরকীর্তন। ‘নামকীর্তন’ ঘরে বসেই সবার পক্ষে গাওয়া সম্ভব ছিল। আর ‘নগরকীর্তন’ নগরে বিশাল শোভাযাত্রা করে, দু-হাত তুলে নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে গাওয়া হতো।
শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবে শ্রীচৈতন্যের জীবন ও আদর্শ এবং সমকালীন সমাজের কথা তুলে ধরার জন্যই তাঁর অনুগামী বৈষ্ণব কবিদের হাতে বাংলায় জীবনী সাহিত্য লেখার ধারা বিকশিত হয়েছিল।
যিনি দীন-ই ইলাহি গ্রহণ করতেন, তিনি শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের শুরুতে তাঁর জীবন (জান), সম্পত্তি (মাল), ধর্ম (দীন) ও সম্মান (নামুস) বিসর্জন (কুরবান) দেওয়ার শপথ নিতেন। মুরিদ বা শিষ্যের মতো তাঁকে বাদশাহের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে হতো। অনুষ্ঠান শেষে বাদশাহ তাঁকে একটি নতুন পাগড়ি, সূর্যের একটি পদক ও বাদশাহের নিজের ছোটো একটি ছবি দিতেন।
সুলতানি শাসনের আগেই ভারতে খিলান ও গম্বুজের মতো আরবি বা ইসলামীয় স্থাপত্যশিল্প এসেছিল। সুলতানি শাসন জারি হওয়ার পর ভারতীয় কারিগর এবং তুর্কি স্থপতিদের কাজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ও ইসলামীয় শিল্প মিলেমিশে গিয়ে ‘ইন্দো-ইসলামীয় শিল্পরীতি’ তৈরি হয়।
তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়ের পর কুতুবউদ্দিন আইবক এদেশের লোক যাতে তাঁকে শাসক বলে মেনে নেয় তার জন্য ‘কুয়াত-উল ইসলাম’ মসজিদ বানাতে শুরু করেন। আশপাশের সাতাশটি হিন্দু এবং জৈন মন্দিরের ভাঙা অংশ ব্যবহার করায় এই মসজিদে হিন্দু, জৈন ও ইসলামীয় স্থাপত্য শিল্পের মিলমিশ দেখা যায়।
সুলতান আলাউদ্দিন খলজির আমলে দিল্লির কুতুব-চত্বরে লাল বেলে পাথর দিয়ে আলাই দরওয়াজা তৈরি হয়। খিলান ও গম্বুজযুক্ত ইন্দো-ইসলামীয় স্থাপত্যশিল্পের এই অসাধারণ নমুনাটির গায়ে আল্লাহ-র কথা নয়, সুলতান হিসাবে আলাউদ্দিনের ক্ষমতার প্রশংসা খোদাই করা হয়েছিল।
মুঘল আমলে একটি বাগানকে জল দিয়ে চারটি সমান আয়তনের বর্গে ভাগ করে যে সাজানো বাগান বানানো হতো, তাকে ফারসিতে ‘চাহার বাগ’ বলে। আর জাহাঙ্গিরের সময়ে শ্বেতপাথরে রত্ন বসিয়ে কারুকার্য করার যে চল দেখা যায়, তাকে ‘পিয়েত্রা দুরা’ বলে (যেমন ইতিমাদ-উদ্ দৌলার সমাধি সৌধে)।
সম্রাট শাহজাহানের সময়ে নির্মিত চারটি বিখ্যাত স্থাপত্য হলো—আগ্রার তাজমহল (মুঘল স্থাপত্যশিল্পের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ), দিল্লির লালকেল্লা, জামি মসজিদ এবং আগ্রা দুর্গের ভিতরে মোতি মসজিদ।
বাংলায় বেশি বৃষ্টিতে যাতে জল দাঁড়াতে না পারে সেজন্য ইট দিয়ে বাড়ি ও মন্দির ঢালু ধাঁচে তৈরি করার বিশেষ নির্মাণ পদ্ধতির নাম ‘বাংলা’। এই ধাঁচের দুটি কাঠামো পাশাপাশি জুড়ে দিলে তাকে ‘জোড়-বাংলা’ বলা হতো (যেমন বিষ্ণুপুরের জোড়-বাংলা মন্দির)।
মন্দিরের মাথায় ক-টি চালা আছে সেই হিসাবে তৈরি একচালা, দো-চালা বা আট-চালা মন্দিরকে ‘চালা’ ভিত্তিক মন্দির বলে। আর সাধারণ আয়তক্ষেত্রাকার কাঠামোর উপর এক বা একাধিক চূড়া দিয়ে তৈরি মন্দিরকে ‘রত্ন’ মন্দির বলে (যেমন একটি চূড়া থাকলে একরত্ন এবং পাঁচটি চূড়া থাকলে পঞ্চরত্ন মন্দির)।
ছাপাখানা না থাকার যুগে হাতে লেখা বইগুলিতে সুন্দর হাতের লেখার শিল্পকে ইংরেজিতে ‘ক্যালিগ্রাফি’ (Calligraphy) বা বাংলায় হস্তলিপিবিদ্যা বলা হয়। আর তুতিনামা, রজমনামা প্রভৃতি বইয়ের পৃষ্ঠা সাজানোর জন্য আকার এবং আয়তনে ছোটো যে সূক্ষ্ম ছবিগুলি আঁকা হতো সেগুলিকে ‘মিনিয়েচার’ (Miniature) বা অণুচিত্র বলা হয়।
খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে বাংলায় রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ বা দেবদেবীর মহিমার যে লেখাগুলি সুর করে গাওয়া হতো, সেগুলিকে ‘পাঁচালি’ বলা হয়। আর ভক্তিধর্মের প্রভাবে রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে পদ-কবিতা লেখার ধারাকে বলা হয় ‘পদাবলি সাহিত্য’।
চণ্ডী, মনসা, ধর্ম প্রভৃতি লৌকিক দেব-দেবীর পুজো করলে ভালো বা ‘মঙ্গল’ হবে—এই বিশ্বাসে পুজোর সময় গাওয়া গানের গল্পগুলোকে ধরে যে সাহিত্য লেখা হয় সেগুলোকেই ‘মঙ্গলকাব্য’ বলে। তিনটি মঙ্গলকাব্য হলো—চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল এবং ধর্মমঙ্গল।
পুরাণে শিব বিষয়ে যে কাহিনি তার সঙ্গে গরিব শিব-দুর্গার ঘর-সংসারের কথা জুড়ে লেখা সাহিত্যকে ‘শিবায়ন’ বলে। এই লেখাগুলিতে শিব চাষবাস করে রোজগারের চেষ্টা করে এবং এর মধ্য দিয়ে সেই সময়ের বাংলার গরিব কৃষক পরিবারের অভাবের জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়।
বাংলার নাথ-যোগী ধর্ম সম্প্রদায়ের (যাদের দেবতা শিব) ধর্ম-কর্ম ও আচার-আচরণ নিয়ে লেখা সাহিত্যকে ‘নাথ সাহিত্য’ বলে (যেমন ময়নামতীর কথা ও গোপীচন্দ্রর গান)। এই লেখাগুলিতে সন্ন্যাস-জীবন যাপনের উপরে জোর দেওয়া হয়েছে।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে চিনে প্রথম কাগজ আবিষ্কৃত হয়। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়ার মোঙ্গলরা চিন থেকে ভারতে কাগজ তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে আসলে লেখাপড়ার কাজ সহজ হয়। চতুর্দশ শতকে ভারতে কাগজ এতটাই সস্তা হয়েছিল যে, ময়রা মিষ্টি দেবার জন্য কাগজ ব্যবহার করত।
একাদশ শতকে ভারতে তুলো বুনবার যন্ত্র ‘চরখি’ ও কাপড় বুনবার ‘তাঁত’ এবং ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে সুতো বোনবার ‘চরকা’ আসে। চতুর্দশ শতক থেকে কাপড়ে ‘ব্লক’ ছাপাইয়ের আরম্ভ হয় এবং ষোড়শ শতক নাগাদ ভারতের ‘ছিট’ (Chintz) কাপড় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি করা হতো।
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে পারস্যদেশ থেকে ভারতে আসা বেল্ট এবং গিয়ার-লাগানো ছোটো নাগরদোলার মতো দেখতে কাঠের তৈরি যন্ত্রকে ‘সাকিয়া’ বা ‘পারসিক চক্র’ (Persian Wheel) বলে, যা দিয়ে পশুশক্তির সাহায্যে কুয়ো বা খাল থেকে জল তোলা যেত। তবে যন্ত্রটি দামি হওয়ায় ভারতীয় কৃষকসমাজে এটি খুব বেশি জনপ্রিয় হয়নি।
৮ নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (ব্যাখ্যামূলক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর)
মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গিরের সময়ের একজন ওলন্দাজ বণিকের লেখা থেকে জানা যায় যে, সে যুগের গরিব কৃষকরা মাংসের স্বাদ প্রায় জানতই না। তাদের রোজের খাবার ছিল একঘেয়ে খিচুড়ি এবং সারাদিনে একবার মাত্র বিকেলবেলায় তা খেয়েই তারা খালি পেট ভরাত। পরবার যথেষ্ট পোশাক ছিল না; একজোড়া খাটিয়া, রান্নার দু-একখানা বাসন এবং গায়ে দেওয়া ও পাতার জন্য একটি বা দুটি বিছানার চাদরই ছিল তাদের ঘর-গৃহস্থালি, যা নিয়ে শীতে তাদের ভীষণ কষ্ট হতো।
ব্রাহ্মণ্যধর্ম, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্ম অযথা রীতিনীতির উপর জোর দেওয়ায় এবং চূড়ান্তভাবে অ-সাংসারিক জীবনযাপন করতে বলায় মানুষের জীবনে অচল হয়ে পড়েছিল। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণরাও অব্রাহ্মণদের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকারে নিষেধ আরোপ করত। এরকম অবস্থায় সপ্তম শতকে দক্ষিণ ভারতে অলভার ও নায়নার সাধকরা সরল তামিল ভাষায় ভক্তিবাদ প্রচার করেন এবং ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে তুর্কি আক্রমণে রাজপুত রাজা ও ব্রাহ্মণদের দাপট কমে গেলে উত্তর ও পূর্ব ভারতেও ভক্তিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
গুরু নানক (১৪৬৯–১৫৩৮ খ্রি.) কোনোরকম ভেদাভেদ না মেনে সমস্ত মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁর সময়েই শিখ গুরুদ্বারে ‘লঙ্গরখানা’ চালু হয়, যেখানে সব ধরনের মানুষ একসঙ্গে খেতে বসত। নানকের দর্শন ও বাণীর উপর নির্ভর করেই পরবর্তীকালে শিখ ধর্ম গড়ে ওঠে এবং দশজন শিখ গুরুর বাণী গুরমুখি লিপিতে লেখা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘গুরুগ্রন্থসাহিব’-এ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
সাধিকা মীরাবাঈ (১৪৯৮–১৫৪৪ খ্রি.) রাজস্থানের এক ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং মেওয়াড়ের শাসককুলে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি সাংসারিক বন্ধনে আটকে না থেকে গুজরাটের দ্বারকায় জীবনের অনেকটা সময় কাটান এবং সমস্ত আচার ছেড়ে শ্রীকৃষ্ণ বা গিরিধারীর প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তিতে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর রচিত পাঁচশোরও বেশি ভক্তিগীতি ভারতীয় সংগীত ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
গুরু নানক এবং কবীর প্রচলিত ধর্মের জটিল আচার-অনুষ্ঠান ও জাতপাতের ভেদাভেদ ত্যাগ করে সরাসরি মনের ভক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে ডাকার সহজ কথা বলেছিলেন। তাছাড়া তাঁরা পণ্ডিতদের ভাষার বদলে কারখানার মজুর, চাষি ও গ্রামের মোড়লের মতো সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাতেই (যেমন কবীরের হিন্দি দোহা ও গানে) তাঁদের বাণী প্রচার করতেন। এই কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা সহজে বুঝতে পারতেন।
দিল্লি ও দোয়াব অঞ্চলের চিশতি সুফিদের জীবন ছিল খোলামেলা ও দারিদ্র্যপূর্ণ; কিন্তু সিন্ধু ও পাঞ্জাবের সুহরাবর্দি সুফিরা অনেকেই দারিদ্র্যের বদলে আরামের জীবন বেছে নিয়েছিল। চিশতি সুফিরা বিশ্বাস করতেন রাজ্য পরিচালনায় জড়িয়ে পড়লে ঈশ্বরসাধনা সম্ভব নয়, তাই তাঁরা রাজনীতি ও রাজদরবার থেকে দূরে থাকতেন। অন্যদিকে সুহরাবর্দিদের সুলতানের কাছ থেকে উপহার নিতে বা রাজ্যে ধর্মীয় উচ্চপদ গ্রহণ করতে কোনো সংকোচ হতো না।
বৃন্দাবন দাসের বিবরণ অনুযায়ী চৈতন্যের সময়ে নবদ্বীপে অব্রাহ্মণরাই সংখ্যায় বেশি ছিলেন এবং শাঁখারি, মালাকার, তাঁতি, গোয়ালা, গন্ধবণিক, তাম্বুলি, বাদ্যকর, চিকিৎসক ও বণিকের মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বিভিন্ন পাড়ায় বাস করত। হোসেনশাহি রাজত্বে ব্রাহ্মণদের প্রভাব কমে কায়স্থদের প্রতিপত্তি বেড়েছিল, তবে শাসক-আমলাদের অত্যাচার ও গোঁড়া ব্রাহ্মণ ‘ভট্টাচার্য’-দের দাপটে সাধারণ মানুষ প্রচলিত হিন্দুধর্মে মুক্তির পথ না পেয়ে অনেকেই ইসলাম ধর্ম বা তান্ত্রিক ও লৌকিক দেবদেবীর (মনসা, চণ্ডী, ধর্ম) পুজোর দিকে ঝুঁকেছিল।
শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভক্তি প্রচারের পরিকল্পিত কাঠামোয় কোনো জাতবিচার ছিল না; উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি নীচু জাতির মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন। তিনি ঘরে ঘরে নামগান, বিশাল শোভাযাত্রা করে নগরকীর্তন, বৈষ্ণবীয় নাটক অভিনয় এবং জনগণের মুখের বাংলা ভাষায় ভক্তি প্রচারের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি তিনি ও নিত্যানন্দ জগাই-মাধাইয়ের অত্যাচার, গোঁড়া ব্রাহ্মণ এবং কীর্তন-বিরোধী নবদ্বীপের কাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করেন।
পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে অসমে শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের নেতৃত্বে একেশ্বরবাদী ‘নাম ধর্ম’ বা কৃষ্ণের নাম গান ও সংকীর্তন প্রসার লাভ করে। তিনি ভাগবত পুরাণের এক অংশ অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করেন, কৃষ্ণের বাল্যলীলাকে গুরুত্ব দেন এবং ভক্তদের জমায়েতের জন্য ‘সত্র’ (যার মধ্যে ‘নাম ঘর’ ও ‘কীর্তন ঘর’ থাকত) গড়ে তোলেন। ব্রহ্মপুত্র নদের দু-পাড়ের কৃষক ও ছোটো ব্যবসায়ীদের কাছে এই ভক্তি জনপ্রিয় হয় এবং অসমের সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে।
মুঘল রাজসভায় আসা প্রথম ইংরেজ দূত টমাস রো কিছু না জেনেই জাহাঙ্গিরের দরবারে দীন-ই ইলাহিতে শামিল হওয়ার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফেলেন। জাহাঙ্গির আসফ খানের মাধ্যমে টমাস রো-কে সোনার জলে আঁকা বাদশাহের ছবি ও মুক্তো লাগানো একটি সোনার হার পরিয়ে দেন। সভাসদরা তাঁকে এদেশের প্রথা অনুযায়ী হাঁটু গেড়ে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ‘সিজদা’ করতে বললেও, বাদশাহ জাহাঙ্গির তাঁদের জোর করতে নিষেধ করেন এবং ইংরেজ প্রথায় জানানো ধন্যবাদই গ্রহণ করেন।
গুজরাটের স্থাপত্যে ইসলামীয়, হিন্দু ও জৈন নির্মাণশৈলীর মিলমিশ দেখা যায়, যার অন্যতম উদাহরণ আহমেদাবাদের জামি মসজিদ। দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্যে গুলবর্গা দুর্গ (১৩১৮ খ্রি.), বিদরের ইরানি দেয়ালচিত্রযুক্ত দুর্গ ও প্রাসাদ এবং আহমেদনগরের আটকোণা চাঁদ বিবির প্রাসাদ বিখ্যাত। এছাড়া বিজাপুরে মহম্মদ আদিল শাহ নির্মিত ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড়ো গম্বুজযুক্ত ‘গোল গুম্বদ’, কুতুবশাহি আমলের হায়দরাবাদের ‘চারমিনার’ (১৫৯১ খ্রি.) এবং বিজয়নগরের রাজধানী হাম্পির স্থাপত্য (যেমন বিঠল মন্দিরের পাথরের রথ) অতুলনীয়।
আবুল ফজলের ‘আইন-ই আকবরি’ থেকে জানা যায়, সাদা ও কালো রঙের মিশ্রণে নানা রং তৈরি হতো এবং বাদশাহ আকবর প্রতি সপ্তাহে চিত্রকরদের আঁকা ‘তসভির’ দেখে পুরস্কার বা মাস মাইনে বাড়িয়ে দিতেন। পালকি বাহকের ছেলে দসবন্ত দেওয়ালের গায়েও ছবি আঁকত এবং আকবরের সুনজরে পড়ে আঁকার দক্ষতায় সবাইকে ছাড়িয়ে যায়। অন্যদিকে ছবির পটভূমিকা, অবয়ব, রঙের ব্যবহার ও প্রতিকৃতি আঁকাতে বসওয়ানের দক্ষতা ছিল অসাধারণ।
মুঘল দরবারি চিত্রশিল্পের পাশাপাশি দাক্ষিণাত্যে বিজাপুরের সুলতান দ্বিতীয় ইব্রাহিম আদিল শাহ এবং রাজস্থান ও পাহাড়ি অঞ্চলে (জম্মু, কাশ্মীর, কাংড়া প্রভৃতি) মুঘল রীতি ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের মিলনে নতুন চিত্ররীতি গড়ে ওঠে। পৌরাণিক নানা দৃশ্য এবং রাধা-কৃষ্ণ ছিল এই ছবিগুলির মূল বিষয়বস্তু (যেমন কাংড়া চিত্র)। পাশাপাশি রাজপুত রাজা ও জমিদাররা বাস্তবঘেঁষা পটভূমিতে নিজেদের ও সভার প্রতিকৃতি আঁকাতেন।
সুলতানি আমলে আমির খসরু হিন্দুস্তানি ও ইরানি সংগীতের মিলন ঘটান এবং কর্ণাটকী শিল্পীদের কাছে প্রাচীন সংগীত ব্যাকরণ শেখেন। খেয়াল, তরানা, কওয়ালি সংগীতরীতি এবং সেতার, তবলা ও পাখোয়াজ বাদ্যযন্ত্রগুলি তাঁর সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। আর মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের ছত্রিশজন সংগীতশিল্পীর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন তানসেন (১৫৫৫–১৬১০ খ্রি.), যাঁর সৃষ্টি দীপক ও মেঘমল্লার রাগ।
ভারতের ছ-টি ধ্রুপদী নাচের মধ্যে নবীনতম হলো মণিপুরী নৃত্যশৈলী। অষ্টাদশ শতকে মণিপুরী সংস্কৃতিতে ভক্তি ও বৈষ্ণব পদাবলির প্রবল প্রভাবে তাদের আদি নৃত্যধারার সঙ্গে ভক্তিরস যুক্ত হয়ে সংকীর্তন এবং রাধা-কৃষ্ণকেন্দ্রিক রাসলীলার সৃষ্টি হয়। মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্রের হাতেই রাসলীলার ধারা ও নাচের ‘কুমিল’ পোশাক তৈরি হয় এবং সংকীর্তনে পুঙ্গ নামের ঢোল বাজিয়ে মূলত ছেলেরাই নাচে।
সম্রাট আকবরের নিজের উৎসাহে ফারসি অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। কয়েকজন লেখক মহাভারতের নানান অংশ ফারসিতে অনুবাদ করেন, যা ‘রজমনামা’ নামে বিখ্যাত। এছাড়া বদাউনি রামায়ণের, হাজি ইব্রাহিম সিন্ধি বেদের এবং রাজা টোডরমল ভাগবৎপুরাণের ফারসি অনুবাদ করেন; এমনকি গ্রিক ভাষায় লেখা বেশ কিছু বইও ফারসিতে অনুবাদ করা হয়েছিল।
সুলতানি আমলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের উন্নতিতে ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লিতে উঁচু মিনারের উপর মানমন্দির ও সূর্যঘড়ি বসান এবং অষ্টাদশ শতকে রাজা সওয়াই জয় সিংহ দিল্লি, জয়পুর, উজ্জয়িনী, মথুরা ও বারাণসীতে মানমন্দির তৈরি করেন। ত্রয়োদশ শতকে সমুদ্রে চৈনিক চৌম্বক কম্পাসের ব্যবহার শুরু হয় এবং আকবর ও জাহাঙ্গির বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে প্রাচীন আয়ুর্বেদী চিকিৎসার পাশাপাশি সুলতানি আমলে গ্রিকো-আরবি ধারার ‘ইউনানি’ চিকিৎসা এবং সপ্তদশ শতকে ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের মতো পর্যটকদের হাত ধরে ইউরোপীয় চিকিৎসা-পদ্ধতি ভারতে আসে।
পারস্য ও মধ্য-এশিয়া থেকে মুঘলদের আনা কৌশলে একটি বাগানকে জল দিয়ে চারটি সমান আয়তনের বর্গে ভাগ করে ফুল-ফলের গাছ লাগিয়ে যে মনোরম বাগান তৈরি করা হতো, তাকে ফারসিতে ‘চাহার বাগ’ (হিন্দিতে চার বাগ) বলে। বাবর, জাহাঙ্গির ও শাহজাহানের উৎসাহে লাহোরের শালিমার বাগ, কাশ্মীরের নিসাত বাগ, হুমায়ুনের সমাধি ও তাজমহলে চাহার বাগ নির্মিত হয়। সপ্তদশ শতকে মুঘলদের বাগিচাশিল্প এবং পোর্তুগিজদের ইউরোপীয় প্রযুক্তির প্রভাবে কলমপ্রথার উন্নতি ঘটায় ভারতের ফলমূলের গুণগত মান উন্নত হয়েছিল।
৯ দশ - বারোটি বাক্যের মধ্যে উত্তর দাও (রচনাধর্মী বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর)
মধ্য যুগের ভারতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা:
সুলতানি ও মুঘল যুগে দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামেই যৌথ পরিবারে বাস করতেন। পাতকুয়া বা পুকুরের ধারে কয়েকটি গাছের গুঁড়ি ও খড়ের চাল দিয়েই গরিব মানুষ মাথা গোঁজবার ঠাঁই করে নিত। আম, আঙুর, কলা, ধান, গম ও মশলার চাষ হতো, আর গ্রামে চিনি ও সুগন্ধি আতর শিল্প এবং নদীর ধারে বস্ত্র, ধাতু, পাথর ও কাগজ শিল্প গড়ে উঠেছিল। শাসকরা ফসলের মোটা অংশ খাজনা হিসেবে নেওয়ায় কৃষকের হাতে সামান্য ফসলই থাকত। ইব্রাহিম লোদি বা মহম্মদ বিন তুঘলকের সময়ে বাংলায় জিনিসপত্র সস্তা হলেও, দুর্ভিক্ষ বা যুদ্ধে দাম বাড়ত। জাহাঙ্গিরের সময়ের ওলন্দাজ বণিকের বিবরণ অনুযায়ী, গরিবরা মাংসের স্বাদ প্রায় জানতই না; সারাদিনে একবার বিকেলবেলায় একঘেয়ে খিচুড়ি খেয়েই তারা পেট ভরাত। একজোড়া খাটিয়া, দু-একখানা বাসন ও একটি-দুটি চাদরই ছিল তাদের সম্বল। সমাজে পর্দা ও ঘোমটার প্রচলন থাকলেও গরিব কৃষক পরিবারে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খামারে পরিশ্রম করত। কুস্তি, তির-ধনুক, সাঁতার, বাংলার বাঁটুল ছোঁড়া, লোকগান, নাচ ও বাজিকরের খেলা ছিল সাধারণ মানুষের আনন্দের উপকরণ। শাসক বদলালেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম আর অভাবের সংসারই ছিল সে যুগের গরিব কৃষক-শ্রমিকের জীবন।
কবীরের ভক্তি ভাবনায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষের ঐক্য:
বারাণসীতে এক মুসলিম জোলাহা (তাঁতি) পরিবারে পালিত পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের বিখ্যাত ভক্তিসাধক কবীরের চিন্তায় ইসলামের একেশ্বরবাদের সঙ্গে বৈষ্ণব, নাথ-যোগী এবং তান্ত্রিক বিশ্বাস এসে মিশেছিল। তাঁর কাছে সব ধর্মই ছিল এক এবং সব ভগবানই সমান। তাই কবীরের মতে রাম, হরি, গোবিন্দ, আল্লাহ, সাঁই, সাহিব ইত্যাদি ছিল এক ঈশ্বরেরই বিভিন্ন নাম। কবীর বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ তার ভক্তি দিয়ে নিজের মনেই ঈশ্বর খুঁজে পাবে; তার জন্য মন্দিরে-মসজিদে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। মূর্তিপুজো, গঙ্গাস্নান বা নামাজ পড়া তাঁর কাছে ছিল অর্থহীন ও লোক-দেখানো আচার। কারখানার মজুর, চাষি ও গ্রামের মোড়লের মুখের হিন্দি ভাষায় রচিত কবীরের দুই পংক্তির কবিতা বা ‘দোহা’ সাধারণ মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করত। পাঁচশোরও বেশি কবীরের দোহা শিখদের ‘গুরুগ্রন্থসাহিব’-এর অংশ এবং শিখ ও অন্যান্য ধর্মের মানুষের কাছে তাঁর আসন দশজন শিখগুরুর পাশেই। লোকমুখে শোনা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর হিন্দু ও মুসলিম ভক্তরা তাঁর দেহ দাহ না গোর দেওয়া হবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়লে দেহের বদলে পাওয়া এক মুঠো লাল গোলাপ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এভাবেই কবীরের ভক্তিভাবনা সব ধর্মের মানুষকে এক করে তাঁকে শান্তি ও সাম্যের প্রতীক করে তুলেছিল।
মধ্যযুগের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ভক্তিসাধক এবং সুফিসন্তদের অবদান:
মধ্যযুগে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলির আচারসর্বস্বতা এবং জাতপাতের কড়াকড়ির বিরুদ্ধে ভক্তিসাধক ও সুফিসন্তরা এক নতুন লোকায়ত ধর্মীয় ভাবনার জন্ম দেন। অলভার ও নায়নার সাধক এবং পরে রামানন্দ, কবীর, নানক, মীরাবাঈ, চৈতন্যদেব ও শঙ্করদেব প্রচার করেন যে, কোনো ভেদাভেদ না করে ও আচার ছেড়ে শুধু মনের ভক্তি দিয়েই ঈশ্বরকে পাওয়া সম্ভব। একইভাবে মইনউদ্দিন চিশতি, নিজামউদ্দিন আউলিয়া, বখতিয়ার কাকি ও বদরউদ্দিন জাকারিয়ার মতো সুফি সাধকরা তাঁদের খোলামেলা জীবন ও শান্তির বাণীর মধ্য দিয়ে সব মানুষকে একসঙ্গে রাখার চেষ্টা করেন। সুলতানি শাসনে বাস করা অ-মুসলমান মানুষরা সুফিদের মানবদরদী কথায় অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। নানকের লঙ্গরখানা, চৈতন্যের নগরকীর্তন বা শঙ্করদেবের সত্র সমাজের নীচুতলার মানুষকে মর্যাদা ও ঐক্য দিয়েছিল। সংস্কৃতির উপরেও এই সাধকরা গভীর ছাপ রেখেছিলেন। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় রচিত কবীরের দোহা, মীরাবাঈয়ের ভক্তিগীতি, সুফিদের ‘সমা’ গান, বাংলার বৈষ্ণব পদাবলি ও কীর্তন এবং মণিপুরী রাসলীলা ও নৃত্যশৈলীর বিকাশ ঘটেছিল এই ভক্তি ও সুফি আন্দোলনের হাত ধরেই।
বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ভক্তি প্রচারের পদ্ধতি ও ফলাফল:
খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে নবদ্বীপকে কেন্দ্র করে শ্রীচৈতন্য এবং তাঁর সঙ্গীরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদের বিরুদ্ধে বৈষ্ণব ভক্তিবাদের প্রচার করেন। চৈতন্যদেব উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ হয়েও নীচু জাতির মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং ঘরে ঘরে নামগান ও বিশাল শোভাযাত্রা করে নগরকীর্তনের ব্যবস্থা করেন। তিনি জনগণের মুখের বাংলা ভাষায় ভক্তি প্রচার করেন, বৈষ্ণবীয় নাটকে অভিনয় করেন এবং জগাই-মাধাইয়ের অত্যাচার, গোঁড়া ব্রাহ্মণ ও কীর্তন-বিরোধী নবদ্বীপের কাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করেন। এই আন্দোলনের ফলে সপ্তদশ শতকে সমাজ থেকে জাতিভেদ পুরো দূর না হলেও, জ্ঞানের বদলে ভক্তি দিয়ে যে সব ভেদাভেদকে তুচ্ছ করা যায়—সেই বার্তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। নামকীর্তন, নগরকীর্তন ও কথকথার মাধ্যমে বাংলায় এক নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়। এর প্রভাবে রাধা-কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে বাংলা পদাবলি সাহিত্য এবং শ্রীচৈতন্যকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় জীবনী সাহিত্য (চৈতন্যজীবনীকাব্য) লেখার ধারা বিকশিত হয়। বহু মুসলমান কবিও বৈষ্ণব গান-কবিতা লেখেন এবং ঘাঁটু, পটুয়া, রাসলীলা ও পৌষ-পার্বণের গানে বৈষ্ণব প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে।
বাদশাহ আকবরের দীন-ই ইলাহি:
খ্রিস্টীয় ১৫৭০-এর দশকে বাদশাহ আকবর গোঁড়া ইসলামের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে প্রকাশ্যে নামাজ পড়া বন্ধ করেন এবং সূর্যপ্রণাম ও সূর্যের নাম জপের মতো প্রথা শুরু করেন। ফতেহপুর সিকরিতে উলেমা এবং নানান ধর্মের গুরুদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন ধর্ম থেকে যুক্তিগ্রাহ্য বৈশিষ্ট্য বেছে নিয়ে ‘দীন-ই ইলাহি’ নামে এক নতুন মতাদর্শ চালু করেন। আকবর কখনো ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেননি এবং দীন-ই ইলাহি কোনো আলাদা নতুন ধর্মও ছিল না। এটি আসলে ছিল আকবরের প্রতি চূড়ান্ত অনুগত কয়েকজন অভিজাতদের মধ্যে প্রচারিত এক আদর্শ, যেখানে বাদশাহ ও অভিজাতদের মধ্যে পির-মুরিদের মতো গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ছিল। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সদস্যরা তাঁদের জীবন (জান), সম্পত্তি (মাল), ধর্ম (দীন) ও সম্মান (নামুস) বাদশাহের জন্য বিসর্জন (কুরবান) দেওয়ার শপথ নিতেন এবং বাদশাহের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেন। বাদশাহ তাঁদের নতুন পাগড়ি, সূর্যের পদক ও নিজের ছোটো ছবি দিতেন। আকবরের পুত্র জাহাঙ্গিরও এটি চালু রাখেন। বহু ধর্ম ও জাতির ভারতবর্ষে উলেমাদের বাইরে গিয়ে পারস্যদেশীয়, হিন্দু রাজপুত ও ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে এক বিশ্বস্ত অনুগামী দল গড়ে নিজের শাসনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই ছিল আকবরের দীন-ই ইলাহির মূল উদ্দেশ্য।
সুলতানি ও মুঘল আমলে স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ:
খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে দিল্লি সুলতানি শাসন জারি হওয়ার পর ভারতীয় কারিগর ও ইসলামীয় খিলান-গম্বুজ রীতির মিলনে ‘ইন্দো-ইসলামীয় শিল্পরীতি’ গড়ে ওঠে। কুতুবউদ্দিন আইবক কুয়াত-উল ইসলাম মসজিদ ও কুতুব মিনার তৈরি শুরু করেন, যা ইলতুৎমিশ শেষ করেন। আলাউদ্দিন খলজির লাল বেলে পাথরের আলাই দরওয়াজা, তুঘলকদের দৌলতাবাদ ও ফিরোজাবাদ দুর্গ-শহর, গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের ঢালু দেয়ালের সমাধি এবং লোদি সুলতানদের বাগানঘেরা আটকোণা সমাধি সুলতানি স্থাপত্যের প্রধান নিদর্শন। মুঘল আমলে স্থাপত্যশিল্পের বিরাট বদল ঘটে। বাবরের ‘চাহার বাগ’ বাগান, হুমায়ুনের দীন পনাহ শহর এবং সাসারামে শের শাহের সমাধি সৌধের পর আকবরের আমলে আগ্রা দুর্গ, ফতেহপুর সিকরি ও বুলন্দ দরওয়াজা নির্মিত হয়। জাহাঙ্গিরের আমলে ইতিমাদ-উদ্ দৌলার সমাধিতে শ্বেতপাথরে রত্ন বসানো ‘পিয়েত্রা দুরা’ কারুকার্য শুরু হয়। শাহজাহানের সময়ে মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তাজমহল, লালকেল্লা, জামি মসজিদ ও আগ্রার মোতি মসজিদ তৈরি হয়। ঔরঙ্গজেবের সময়ে লালকেল্লার মোতি মসজিদ এবং ঔরঙ্গাবাদে বিবি-কা মকবারা নির্মিত হয়। পাশাপাশি বাংলা, গুজরাট ও দক্ষিণ ভারতেও (চারমিনার, গোল গুম্বদ, হাম্পি) আঞ্চলিক স্থাপত্যের বিকাশ ঘটেছিল।
মুঘল সম্রাটদের আমলে বাগান তৈরি এবং দুর্গনির্মাণ:
মুঘল সম্রাটরা সাম্রাজ্য সুরক্ষা এবং সৌন্দর্যবোধের কারণে দুর্গনির্মাণ ও বাগান তৈরিতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকে মুঘলরা পারস্য ও মধ্য-এশিয়া থেকে একটি বাগানকে জল দিয়ে চারটি সমান বর্গে ভাগ করে ফুল-ফলের গাছ লাগানোর ‘চাহার বাগ’ (চার বাগ) রীতি ভারতে নিয়ে আসে। সম্রাট বাবরের বাগানের খুব শখ ছিল এবং জাহাঙ্গির তাঁর ‘তুজুক-ই জাহাঙ্গিরি’ বইতে আগ্রা ও কাশ্মীরের বাগানের কথা লিখেছেন। বাবর, জাহাঙ্গির ও শাহজাহানের উৎসাহে লাহোরের শালিমার বাগ, কাশ্মীরের নিসাত বাগ, দিল্লিতে হুমায়ুনের সমাধি ও আগ্রার তাজমহলে চাহার বাগের অপূর্ব নিদর্শন গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, সাম্রাজ্যকে সুরক্ষিত করার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর দুর্গ ও দুর্গ-শহর বানানোয় মনোযোগী ছিলেন। আকবরের সময়ে আগ্রা দুর্গ এবং আজমির, লাহোর, কাশ্মীর ও এলাহাবাদে দুর্গ তৈরি করা হয়। গুজরাট জয়ের স্মৃতিতে আকবর বুলন্দ দরওয়াজা এবং ভারতের নানা প্রদেশের স্থাপত্যরীতির মিশ্রণে ফতেহপুর সিকরি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে সম্রাট শাহজাহান দিল্লিতে বিখ্যাত লালকেল্লা এবং আগ্রা দুর্গের ভিতরে মোতি মসজিদ নির্মাণ করে মুঘল দুর্গ-স্থাপত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
মধ্য যুগের বাংলার স্থাপত্যরীতির পর্যায়গুলির মূল বৈশিষ্ট্য:
মধ্যযুগে বাংলায় ইটের ব্যবহার, বেশি বৃষ্টিতে জল না দাঁড়ানোর জন্য ঢালু চালের ‘বাংলা’ ও ‘জোড়-বাংলা’ রীতি, একচালা বা আট-চালার মতো ‘চালা’ রীতি এবং চূড়াভিত্তিক ‘রত্ন’ (একরত্ন, পঞ্চরত্ন) মন্দির ও পোড়ামাটির বা টেরাকোটার কাজ ছিল প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইসলামি কাঠামো ও বাংলার লৌকিক কারুকার্যের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার স্থাপত্যকে তিনটি মূল পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে (১২০১–১৩৩৯ খ্রি.) বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়; ত্রিবেণীতে জাফর খানের সমাধির ভগ্নাবশেষ এবং বসিরহাটে ছড়িয়ে থাকা কিছু স্তূপ ছাড়া এ সময়কার কোনো স্থাপত্য আজ আর নেই। দ্বিতীয় পর্যায়ে (১৩৩৯–১৪৪২ খ্রি.) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য হলো মালদহের পান্ডুয়ায় সিকান্দর শাহের বানানো আদিনা মসজিদ; এছাড়া হুগলির ছোটো-পান্ডুয়ার মিনার ও মসজিদ এবং গৌড়ের শেখ আকি সিরাজের সমাধি উল্লেখযোগ্য। তৃতীয় পর্যায়ে (১৪৪২–১৫৩৯ খ্রি.) বাংলায় ইন্দো-ইসলামি রীতির স্থাপত্য সবচেয়ে উন্নত হয়। পান্ডুয়ায় সুলতান জালালউদ্দিন মহম্মদ শাহর (যদু) টেরাকোটার অর্ধগোল গম্বুজযুক্ত ‘একলাখি সমাধি’, বরবক শাহের আমলে গৌড়ের দাখিল দরওয়াজা, তাঁতিপাড়া মসজিদ, গুম্মত ও লোটান মসজিদ, নীল-সাদা চকচকে টালি ও টেরাকোটার কাজের ২৬ মিটার উঁচু ফিরোজ মিনার (১৪৮৮ খ্রি.) এবং গৌড়ের সবচেয়ে বড়ো ‘বড়ো সোনা মসজিদ’ (১৫২৬ খ্রি.) এই পর্যায়ের সেরা নিদর্শন।
মুঘল চিত্রশিল্পের উন্নতিতে মুঘল বাদশাহদের ভূমিকা:
বইতে ছবি আঁকার বা অলংকরণের প্রথা সম্রাট বাবরের সময়েও দেখা যায়। সম্রাট হুমায়ুন ইরান ও আফগানিস্তান থেকে মির সঈদ আলি ও আবদুস সমাদকে (‘শিরিন কলম’) নিয়ে দিল্লিতে মুঘল কারখানা খোলেন এবং ‘হমজানামা’ বইয়ের অলংকরণের কাজ শুরু করেন। সম্রাট আকবরের আমলে তুতিনামা, রজমনামা, আকবরনামা প্রভৃতি বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা সূক্ষ্ম হস্তলিপি (ক্যালিগ্রাফি), সোনার রং এবং আকারে ছোটো ‘মিনিয়েচার’ (অণুচিত্র) দিয়ে সাজানো হতো। আকবরের সময় থেকেই ‘তসভির’ বা প্রতিকৃতি আঁকা শুরু হয় এবং তিনি দসবন্ত ও বসওয়ানের মতো শিল্পীদের কাজের গুণ বিচার করে পুরস্কার ও মাস মাইনে বাড়িয়ে দিতেন। সম্রাট জাহাঙ্গিরের আমলে প্রতিকৃতি আঁকার প্রভূত উন্নতি হয় এবং ইউরোপীয় ছবির প্রভাবে মুঘল চিত্রে বাস্তবতা ও প্রকৃতিবাদ (উদ্ভিদ ও প্রাণী) ফুটে ওঠে। জাহাঙ্গিরের আমলেই শিল্পীরা প্রথম ছবিতে স্বাক্ষর (সই) করতে শুরু করেন এবং তিনি ফারুক হোসেনকে ‘নাদির আল-অস্ত্র’ উপাধি দেন। সম্রাট শাহজাহানের সময়ে ছবির মধ্যে কাছে-দূরে বোঝানোর পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয় এবং ‘পাদশাহনামা’ গ্রন্থের বিখ্যাত অলংকরণ করা হয়। তবে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময়ে দরবারি শিল্পীদের কাজ ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিল্পী মুঘল দরবার ছেড়ে আঞ্চলিক শাসকদের দরবারে চলে যান।
মধ্য যুগের ভারতে ফারসি ভাষার ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি:
দশম শতাব্দীতে তুর্কিদের আগমনের সাথে এবং সুলতানি শাসনের হাত ধরে ভারতে প্রশাসনিক ও সাহিত্যের ভাষা হিসেবে ফারসির প্রচলন ঘটে। কুতুবউদ্দিন আইবক, ইলতুৎমিশ ও খলজি আমলে লাহোর শহর ফারসি ভাষাচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কবি আমির খসরু ফারসি সাহিত্যের নতুন রচনাশৈলী ‘সবক-ই হিন্দ’ আবিষ্কার করেন এবং মিনহাজ-ই সিরাজ, ইসামি ও জিয়াউদ্দিন বারনি ফারসিতে ইতিহাস লেখেন। জিয়া নকশাবির ‘তুতিনামা’ এবং কাশ্মীরের সুলতান জৈন-উল আবেদিনের উৎসাহে রাজতরঙ্গিনী ও মহাভারত ফারসিতে অনূদিত হয়। মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তর ও বাহমনি সুলতানদের আগ্রহে দক্ষিণ ভারতের দৌলতাবাদ, গুলবর্গা ও বিদরেও ফারসি চর্চা ছড়িয়ে পড়ে। মুঘল আমলে পারস্যের সফাবি সাম্রাজ্যের পতনের মুখে বহু কবি ভারতে আসেন এবং হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গির ও শাহজাহানের পৃষ্ঠপোষকতায় ফারসির জনপ্রিয়তা শীর্ষে পৌঁছায়। আকবরের আমলে ফারসি রচনা তিন ভাগে উন্নত হয়—১) ইতিহাস (আবুল ফজলের আকবরনামা ও আইন-ই আকবরি, বদাউনির মুন্তাখাব-উৎ তওয়ারিখ, নিজামউদ্দিন আহমেদের তবকাত-ই আকবরি), ২) অনুবাদ সাহিত্য (রজমনামা, রামায়ণ, বেদ ও ভাগবৎপুরাণ) এবং ৩) কবিতা (ফৈজি, উরফি, নাজিরি)। এমনকি ঈশ্বরদাস নাগর, চন্দ্রভান ব্রাহ্মণ ও ভীমসেন বুরহানপুরির মতো হিন্দু লেখকরাও ফারসি ভাষায় পটু ছিলেন।
খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ:
সুলতানি আমলের গোড়ায় বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ পুঁথির পর খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে ইলিয়াসশাহি শাসন থেকে বাংলা ভাষায় লেখালেখির ধারা জোরদার হয়, যা সুর করে গাওয়া হতো বলে অনেক রচনাকে ‘পাঁচালি’ বলা হয়। এই সময়ের বাংলা সাহিত্য কয়েকটি প্রধান ধারায় বিকশিত হয়েছিল:
অনুবাদ সাহিত্য: কৃত্তিবাস ওঝা রামায়ণ, কাশীরাম দাস মহাভারত এবং মালাধর বসু ভাগবতের অংশ ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ নামে সরল বাংলায় অনুবাদ করেন, যাতে সেকালের বাংলার সমাজের ছবি ফুটে উঠেছে।
বৈষ্ণব পদাবলি ও জীবনীকাব্য: শ্রীচৈতন্যের ভক্তিধর্মের প্রভাবে রাধা-কৃষ্ণকে নিয়ে ‘পদাবলি সাহিত্য’ এবং চৈতন্যদেবের জীবন ও সমকালীন সমাজ নিয়ে বাংলায় ‘চৈতন্যজীবনীকাব্য’ (যেমন বৃন্দাবন দাসের রচনা ও কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত) লেখার ধারা শুরু হয়।
মঙ্গলকাব্য ও শিবায়ন: লৌকিক দেবী চণ্ডী, মনসা ও ধর্মঠাকুরের পুজোর মহিমা ও সাধারণ গরিব মানুষের জীবন নিয়ে চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল কাব্য এবং গরিব কৃষকরূপী শিব-দুর্গার সংসার নিয়ে ‘শিবায়ন’ কাব্য রচিত হয়।
নাথ সাহিত্য ও আরবি-ফারসি মিশ্রিত কাব্য: শিবের উপাসক নাথ-যোগীদের সন্ন্যাস-জীবন নিয়ে ‘নাথ সাহিত্য’ (ময়নামতীর কথা ও গোপীচন্দ্রর গান) এবং আরবি-ফারসির সঙ্গে বাংলা ভাষার মিলমিশ ঘটিয়ে দৌলত কাজি ও সৈয়দ আলাওল (‘পদ্মাবতী’ কাব্য) সাহিত্য রচনা করেন।
সুলতানি ও মুঘল আমলে সামরিক এবং কৃষি প্রযুক্তিতে পরিবর্তন:
সুলতানি ও মুঘল যুগে চিন, পারস্য ও ইউরোপ থেকে আসা নানা প্রযুক্তির প্রভাবে সামরিক এবং কৃষি ক্ষেত্রে বড়ো পরিবর্তন ঘটেছিল:
সামরিক প্রযুক্তিতে পরিবর্তন: ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের সময় ঘোড়ার দু-পাশে সৈনিকের পা রাখার জন্য পাদানির (রেকাব) ব্যবহার তুর্কি বাহিনীকে বাড়তি সুবিধা দিত। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে চিন থেকে মোঙ্গলদের হাত ঘুরে বারুদ-ব্যবহারকারী আগ্নেয়াস্ত্র ও বারুদচালিত রকেটের ব্যবহার ভারতে শুরু হয়। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে চিন ও মিশর থেকে বন্দুকের প্রযুক্তি আসে; ষোড়শ শতকে পোর্তুগিজরা দক্ষিণ ভারতে এবং মুঘলরা উত্তর ভারতে যুদ্ধে ব্যাপকহারে বন্দুক ও কামানের ব্যবহার চালু করে। ফলে অশ্বারোহী, পদাতিক ও রণহস্তীর পাশাপাশি সৈন্যবাহিনীতে কামান-চালক ও বন্দুকধারী সৈন্যরা জায়গা করে নেয়।
কৃষি প্রযুক্তিতে পরিবর্তন: খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতকে পারস্যদেশ থেকে বেল্ট ও গিয়ার-লাগানো কাঠের তৈরি ‘সাকিয়া’ বা ‘পারসিক চক্র’ (Persian Wheel) আসে, যা দিয়ে পশুশক্তির সাহায্যে কুয়ো বা খাল থেকে জল তোলা যেত। কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো উন্নতি ছিল সেচব্যবস্থার প্রসার—দক্ষিণ ভারতের পাথুরে জমিতে বিজয়নগর শাসকরা বড়ো জলাধার খনন করে নালার মাধ্যমে এবং উত্তর ভারতে ফিরোজ শাহ তুঘলক ও মুঘল বাদশাহরা নদী থেকে খালের মাধ্যমে চাষের জমিতে জল পৌঁছে দিতেন। এছাড়া মুঘল বাগিচাশিল্প ও পোর্তুগিজদের প্রযুক্তিতে কলমপ্রথার উন্নতি ঘটায় ফলমূলের মান উন্নত হয়েছিল।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
Loading comments...