অধ্যায় ৪ : পদার্থের গঠন ও ধর্ম • উপ-অধ্যায় ৪.১
WBBSE Class 9 Physical Science Chapter 4 (উপ-অধ্যায় ৪.১) পরমাণুর গঠন : সম্পূর্ণ পাঠ্যবই অনুশীলনী সমাধান ও প্রশ্নোত্তর
September 23, 2026
0 Views
0 Likes
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) নির্ধারিত নবম শ্রেণির ভৌতবিজ্ঞান ও পরিবেশ পাঠ্যবইয়ের চতুর্থ অধ্যায়: পদার্থের পরমাণুর গঠন ও পদার্থের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মসমূহ-এর অন্তর্গত উপ-অধ্যায় ৪.১: 'পরমাণুর গঠন' (Atomic Structure)-এর পাঠ্যবই অনুশীলনীর সমস্ত প্রশ্নোত্তর এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমাধান করা হয়েছে।
অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত প্রধান বিষয়বস্তু যেমন—ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন কণার আবিষ্কার, রাদারফোর্ডের ঐতিহাসিক আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা ও তার সীমাবদ্ধতা, নীলস বোরের কোয়ান্টাম পরমাণু মডেল, বিভিন্ন কক্ষপথে ইলেকট্রন বিন্যাস (বোর-বারি স্কিম), পারমাণবিক সংখ্যা ও ভরসংখ্যা, আইসোটোপ, আইসোবার, আইসোটোন সংক্রান্ত সমস্ত গাণিতিক সমস্যা ও তত্ত্বমূলক প্রশ্নের মানসম্মত সমাধান স্পষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক রঙিন ডায়াগ্রাম সহযোগে উপস্থাপন করা হলো।
১নিউট্রন আবিষ্কার করেন —
(a) থমসন
(b) রাদারফোর্ড
(c) চ্যাডউইক
(d) গোল্ডস্টাইন
সঠিক উত্তর: (c) চ্যাডউইক
ব্যাখ্যা: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস চ্যাডউইক (James Chadwick) বেরিলিয়াম ($\text{Be}$) ধাতুর ওপর তীব্র গতিসম্পন্ন আলফা কণা ($\alpha$) আঘাত করে একটি আধানহীন বা নিস্তড়িৎ মৌলিক কণা আবিষ্কার করেন, যার নাম দেওয়া হয় 'নিউট্রন' ($^{1}_{0}\text{n}$)। বিক্রিয়াটি হলো: $^{9}_{4}\text{Be} + ^{4}_{2}\alpha \rightarrow ^{12}_{6}\text{C} + ^{1}_{0}\text{n}$।
২পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকে —
(a) প্রোটন
(b) ইলেকট্রন
(c) নিউট্রন
(d) প্রোটন ও নিউট্রন
সঠিক উত্তর: (d) প্রোটন ও নিউট্রন
ব্যাখ্যা: পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অঞ্চলে ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন এবং আধানহীন নিউট্রন অবস্থান করে। এই কণা দুটিকে একত্রে নিউক্লিয়ন (Nucleon) বলা হয়। ঋণাত্মক তড়িৎগ্রস্ত ইলেকট্রনগুলি নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন অনুমোদিত কক্ষপথে আবর্তন করে। (ব্যতিক্রম: সাধারণ হাইড্রোজেনে কোনো নিউট্রন থাকে না)।
৩ক্লোরিন পরমাণুর সবচেয়ে বাইরের কক্ষের ইলেকট্রন সংখ্যা —
(a) 1টি
(b) 7টি
(c) 8টি
(d) 2টি
সঠিক উত্তর: (b) 7টি
ব্যাখ্যা: ক্লোরিনের ($\text{Cl}$) পারমাণবিক সংখ্যা ১৭। বোর-বারি স্কিম অনুসারে ক্লোরিনের ১৭টি ইলেকট্রনের বিন্যাস হলো— K কক্ষে ২ টি, L কক্ষে ৮ টি এবং M কক্ষে ৭ টি ($2, 8, 7$)। সুতরাং ক্লোরিন পরমাণুর সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথ (M কক্ষ)-এ ইলেকট্রন সংখ্যা ৭টি।
৪নিউট্রনবিহীন একটি পরমাণু হল —
(a) প্রোটিয়াম
(b) ডয়টেরিয়াম
(c) ট্রাইটিয়াম
(d) হিলিয়াম
সঠিক উত্তর: (a) প্রোটিয়াম
ব্যাখ্যা: সাধারণ হাইড্রোজেন বা প্রোটিয়ামের ($^{1}_{1}\text{H}$) পারমাণবিক সংখ্যা ১ এবং ভরসংখ্যা ১। নিউট্রন সংখ্যা = ভরসংখ্যা - পারমাণবিক সংখ্যা = $1 - 1 = 0$। তাই প্রোটিয়ামের নিউক্লিয়াসে কেবল ১টি প্রোটন থাকে, কোনো নিউট্রন থাকে না। অন্যপক্ষে ডয়টেরিয়ামে ১টি ও ট্রাইটিয়ামে ২টি নিউট্রন থাকে।
৫$^{12}_{\ 6}\text{X}$-এর আইসোটোপ হল —
(a) $^{12}_{\ 7}\text{X}$
(b) $^{12}_{\ 5}\text{X}$
(c) $^{13}_{\ 6}\text{X}$
(d) $^{14}_{\ 8}\text{X}$
সঠিক উত্তর: (c) $^{13}_{\ 6}\text{X}$
ব্যাখ্যা: আইসোটোপের সংজ্ঞায় পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যা (চিহ্নের নিচে বামপাশে লেখা সংখ্যা $Z$) সমান হতে হবে এবং ভরসংখ্যা (উপরে লেখা সংখ্যা $A$) ভিন্ন হতে হবে। এখানে $^{12}_{\ 6}\text{X}$ এবং $^{13}_{\ 6}\text{X}$-উভয়েরই পারমাণবিক সংখ্যা $6$, কিন্তু ভরসংখ্যা যথাক্রমে $12$ ও $13$, ফলে এরা পরস্পরের আইসোটোপ (যেমন কার্বনের $^{12}_{6}\text{C}$ ও $^{13}_{6}\text{C}$)।
৬নীচের কোন্ আয়নটির ইলেকট্রন বিন্যাস হিলিয়ামের মতো?
(a) $\text{Li}^+$
(b) $\text{Na}^+$
(c) $\text{H}^+$
(d) $\text{Li}^{2+}$
সঠিক উত্তর: (a) $\text{Li}^+$
ব্যাখ্যা: হিলিয়াম ($\text{He}$) পরমাণুতে ২টি ইলেকট্রন থাকে। লিথিয়ামের ($\text{Li}$) পারমাণবিক সংখ্যা ৩, অর্থাৎ এতে ৩টি ইলেকট্রন থাকে। লিথিয়াম পরমাণু ১টি ইলেকট্রন ত্যাগ করে $\text{Li}^+$ ক্যাটায়ন গঠন করলে এতে অবশিষ্ট ইলেকট্রন সংখ্যা হয় $3 - 1 = 2$, যা নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়ামের ইলেকট্রন কাঠামোর অনুরূপ। (উল্লেখ্য: $\text{H}^+$-এ কোনো ইলেকট্রন নেই, $\text{Na}^+$-এ ১০টি এবং $\text{Li}^{2+}$-এ ১টি ইলেকট্রন থাকে)।
৭নীচের কোন্ ক্ষেত্রে আধান/ভর ($e/m$) র মান সর্বোচ্চ হয়?
(a) প্রোটন
(b) নিউট্রন
(c) ইলেকট্রন
(d) $\alpha$-কণা
সঠিক উত্তর: (c) ইলেকট্রন
ব্যাখ্যা: আধান ও ভরের অনুপাত বা আপেক্ষিক আধান হলো $\frac{e}{m}$। যে কণার ভর ($m$) সবচেয়ে কম হবে, তার $\frac{e}{m}$-এর মান তত বেশি হবে। ইলেকট্রনের ভর ($9.109 \times 10^{-28}\text{ g}$) প্রোটন বা আলফা কণার তুলনায় প্রায় ১৮৩৬ গুণ হালকা। তাই ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে $e/m$-এর মান সর্বোচ্চ হয় (প্রায় $1.76 \times 10^{8}\text{ C/g}$)। নিউট্রন আধানহীন হওয়ায় তার $e/m = 0$।
১ইলেকট্রনের ভর একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের ________ অংশ।
উত্তর: $\frac{1}{1837}$ (বা
$\frac{1}{1836}$) অংশ।
ব্যাখ্যা: একটি ইলেকট্রনের স্থির ভর প্রায় $9.10938 \times 10^{-28}\text{ g}$ এবং একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর প্রায় $1.6735 \times 10^{-24}\text{ g}$। এদের অনুপাত করলে দেখা যায় ইলেকট্রন হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের প্রায় $\frac{1}{1837}$ ভাগ।
২পরমাণুর সবচেয়ে সুস্থিত অংশ ________।
উত্তর: নিউক্লিয়াস (বা কেন্দ্রক)।
ব্যাখ্যা: তীব্র স্বল্পপাল্লার আকর্ষণধর্মী নিউক্লীয় বলের (Nuclear Force) উপস্থিতির কারণে পরমাণুর নিউক্লিয়াস রাসায়নিক বিক্রিয়া বা বাহ্যিক আঘাতে সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত ও স্থিতিশীল থাকে।
১সোডিয়াম পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 2।
উত্তর: মিথ্যা
সঠিক ব্যাখ্যা: সোডিয়ামের ($\text{Na}$) পারমাণবিক সংখ্যা হলো ১১। তাই বোর-বারি নিয়ম অনুযায়ী এর সঠিক ইলেকট্রন বিন্যাস হলো $2, 8, 1$ (K=2, L=8, M=1)। $2, 8, 2$ হলো ম্যাগনেসিয়ামের ($\text{Mg}$, পারমাণবিক সংখ্যা ১২) ইলেকট্রন বিন্যাস।
২নিউট্রন নিস্তড়িৎ কণা।
উত্তর: সত্য
সঠিক ব্যাখ্যা: নিউট্রনের ওপর কোনো তড়িৎ আধান বা চার্জ থাকে না। এর আধানের পরিমাণ শূন্য ($0\text{ Coulomb}$)। তাই এটি একটি সম্পূর্ণ নিস্তড়িৎ মৌলিক কণা।
১পরমাণুর কেন্দ্রে কী কী কণা রয়েছে?
উত্তর: প্রোটন ও নিউট্রন (এদের একত্রে নিউক্লিয়ন বলা হয়; সাধারণ হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে শুধু প্রোটন থাকে)।
২একটি নিউট্রনের আধান কত?
উত্তর: শূন্য (০) বা নিস্তড়িৎ।
৩পরমাণুর সবচেয়ে ভারী কণা কোনটি?
উত্তর: নিউট্রন (নিউট্রনের ভর প্রায় $1.675 \times 10^{-24}\text{ g}$, যা প্রোটনের চেয়ে সামান্য বেশি)।
৪কোন্ বল পরমাণুতে কেন্দ্রীয় কণাগুলিকে ধরে রয়েছে?
উত্তর: নিউক্লীয় বল (Nuclear Force)।
৫কোনো পরমাণুতে ইলেকট্রন ও নিউট্রন সংখ্যা যথাক্রমে 6 ও 8; পরমাণুটির ভরসংখ্যা কত?
উত্তর: 14
গণনা: প্রশম পরমাণুতে প্রোটন সংখ্যা = ইলেকট্রন সংখ্যা = 6। অতএব ভরসংখ্যা ($A$) = প্রোটন সংখ্যা + নিউট্রন সংখ্যা = $6 + 8 = 14$ (মৌলটি হলো কার্বনের আইসোটোপ $^{14}_{6}\text{C}$)।
৬একটি মৌলের পরমাণুর ইলেকট্রন বিন্যাস 2, 8, 7; মৌলটির ভরসংখ্যা 37 হলে নিউট্রন সংখ্যা কত?
উত্তর: 20
গণনা: পরমাণুটিতে মোট ইলেকট্রন তথা প্রোটন সংখ্যা ($Z$) = $2 + 8 + 7 = 17$। মৌলটির ভরসংখ্যা ($A$) = 37। সুতরাং নিউট্রন সংখ্যা ($N$) = $A - Z = 37 - 17 = 20$ (এটি হলো ক্লোরিন-37 আইসোটোপ $^{37}_{17}\text{Cl}$)।
৭মৌলের নিউক্লিয়াসের আধানের সঙ্গে পারমাণবিক সংখ্যার সম্পর্ক কী?
উত্তর: নিউক্লিয়াসের মোট ধনাত্মক আধান = পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) $\times$ একটি প্রোটনের আধান ($e$), অর্থাৎ আধান $= +Ze$।
৮নিউট্রনবিহীন একটি মৌলের নাম লেখো।
উত্তর: সাধারণ হাইড্রোজেন বা প্রোটিয়াম ($^{1}_{1}\text{H}$)।
৯একটি পরমাণু থেকে ইলেকট্রন বেরিয়ে গেলে কী উৎপন্ন হয়?
উত্তর: ক্যাটায়ন (বা ধনাত্মক তড়িৎগ্রস্ত আয়ন, যেমন: $\text{Na} - e^- \rightarrow \text{Na}^+$)।
১০পরমাণুর কোন্ অংশে ইলেকট্রনগুলি অবস্থান করে?
উত্তর: নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট বৃত্তাকার অনুমোদিত শক্তিস্তরে বা কক্ষপথে (ইলেকট্রন মহলে)।
১বামস্তম্ভ ও ডানস্তম্ভের সঠিক মিল স্থাপন করো:
| বামস্তম্ভ |
ডানস্তম্ভ |
| (a) ইলেকট্রন | (i) বেকারেল |
| (b) নিউট্রন | (ii) জে. জে. থমসন |
| (c) তেজস্ক্রিয়তা | (iii) গোল্ডস্টাইন |
| (d) প্রোটন | (iv) চ্যাডউইক |
নির্ভুল মিলবন্ধন:
- (a) ইলেকট্রন → (ii) জে. জে. থমসন (১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথোড রশ্মির প্রকৃতি পরীক্ষার মাধ্যমে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন)
- (b) নিউট্রন → (iv) চ্যাডউইক (১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে নিউট্রন আবিষ্কার করেন)
- (c) তেজস্ক্রিয়তা → (i) বেকারেল (১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকারেল স্বতঃস্ফূর্ত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আবিষ্কার করেন)
- (d) প্রোটন → (iii) গোল্ডস্টাইন (১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ধনাত্মক অ্যানোড রশ্মি বা ক্যানাল রশ্মি আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রোটনের সন্ধান দেন)
১ পরমাণুর মৌলিক কণাগুলির নাম লেখো। মান ২
পরমাণুর মূল উপাদান হিসেবে তিনটি প্রধান মৌলিক বা আদি কণা রয়েছে:
১. ইলেকট্রন ($e^-$): এটি পরমাণুর ঋণাত্মক তড়িৎযুক্ত হালকা কণা, যা নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। আবিষ্কারক: জে. জে. থমসন।
২. প্রোটন ($p^+$): এটি পরমাণুর একক ধনাত্মক তড়িৎযুক্ত ভারী কণা, যা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে। আবিষ্কারক: গোল্ডস্টাইন ও রাদারফোর্ড।
৩. নিউট্রন ($n^0$): এটি পরমাণুর আধানহীন বা নিস্তড়িৎ কণা, যা প্রোটনের সাথে নিউক্লিয়াসে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। আবিষ্কারক: জেমস চ্যাডউইক।
২ পরমাণুর নিউক্লিয়াস কাকে বলে? মান ২
পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অতি ক্ষুদ্র আয়তনবিশিষ্ট (ব্যাসার্ধ প্রায় $10^{-13}\text{ cm}$), ধনাত্মক আধানযুক্ত এবং পরমাণুর সমগ্র ভর প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধারণকারী সুদৃঢ় ও সুস্থিত অংশকে পরমাণুর নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক (Atomic Nucleus) বলে।
নিউক্লিয়াস মূলত প্রোটন ও নিউট্রন কণার সমন্বয়ে গঠিত এবং অতি শক্তিশালী স্বল্পপাল্লার নিউক্লীয় বলের দ্বারা সুসংহত থাকে।
৩ নিউক্লীয় বল কাকে বলে? মান ২
পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্থানে (দূরত্ব প্রায় $10^{-15}\text{ m}$ বা ১ ফের্মি) সমজাতীয় ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটন এবং আধানহীন নিউট্রনগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রাখার জন্য যে তীব্র আকর্ষণ বল ক্রিয়া করে, তাকে নিউক্লীয় বল (Nuclear Force) বলে।
বৈশিষ্ট্য: এটি মহাকর্ষ বা কুলম্বীয় বলের মতো কোনো তড়িৎ-চৌম্বকীয় বল নয়; এটি আধান-নিরপেক্ষ, স্বল্পপাল্লার (short-range) এবং প্রাকৃতিক বলগুলির মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী আকর্ষণ বল।
৪ পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনগুলির মধ্যে বিকর্ষণ বল থাকা সত্ত্বেও নিউক্লিয়াস সুস্থিত অবস্থায় থাকে কেন? মান ২
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে সমস্ত প্রোটনই সমধর্মী ধনাত্মক আধানযুক্ত হওয়ায় কুলম্বের সূত্র অনুসারে তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রবল স্থির-তড়িৎ বিকর্ষণ বল কাজ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিউক্লিয়াস ভেঙে না পড়ে সুস্থিত থাকার কারণ হলো:
মেসন কণার আদান-প্রদান: বিজ্ঞানী ইউকাওয়ার তত্ত্বানুসারে নিউক্লিয়াসের মধ্যে মেসন ($\pi$-মেসন) কণার দ্রুত আদান-প্রদানের ফলে প্রোটন ও নিউট্রন অনবরত পরস্পরে রূপান্তরিত হয় ($p \rightleftharpoons n + \pi^+$)।
নিউক্লীয় বলের প্রাধান্য: এই মেসন বিনিময়ের মাধ্যমে নিউক্লিয়াসে এক অতি শক্তিশালী স্বল্পপাল্লার আকর্ষণ বল—‘নিউক্লীয় বল’ সৃষ্টি হয়। এই আকর্ষণ বল প্রোটনগুলির পারস্পরিক তড়িৎ-বিকর্ষণ বলের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। ফলে বিকর্ষণ বল সম্পূর্ণ পরাস্ত হয় এবং নিউক্লিয়াস দৃঢ় ও সুস্থিত অবস্থায় টিকে থাকে।
৫ পারমাণবিক সংখ্যা কাকে বলে? মান ২
কোনো মৌলের একটি প্রশম পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত মোট প্রোটন সংখ্যাকে ওই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা বা পরমাণু ক্রমাঙ্ক (Atomic Number) বলা হয়। একে সাধারণত ইংরেজি $Z$ প্রতীক দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
$\text{পারমাণবিক সংখ্যা } (Z) = \text{নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যা} = \text{পরমাণুর কক্ষপথের মোট ইলেকট্রন সংখ্যা}$
উদাহরণ: অক্সিজেনের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ৮টি প্রোটন থাকায় অক্সিজেনের পারমাণবিক সংখ্যা হলো ৮।
৬ ভরসংখ্যা কাকে বলে? মান ২
কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে অবস্থিত প্রোটন সংখ্যা ও নিউট্রন সংখ্যার মোট সমষ্টিকে সেই পরমাণুটির ভরসংখ্যা (Mass Number) বলে। একে সাধারণত $A$ প্রতীক দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।
$\text{ভরসংখ্যা } (A) = \text{প্রোটন সংখ্যা } (Z) + \text{নিউট্রন সংখ্যা } (N)$
উদাহরণ: সোডিয়ামের নিউক্লিয়াসে ১১টি প্রোটন এবং ১২টি নিউট্রন থাকে, তাই সোডিয়ামের ভরসংখ্যা হলো $11 + 12 = 23$।
৭ ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যার মধ্যে সম্পর্ক কী? মান ২
কোনো মৌলের ভরসংখ্যা ($A$), পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) এবং নিউট্রন সংখ্যার ($N$) মধ্যে মূল সম্পর্কটি হলো:
ভরসংখ্যা ($A$) = পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) + নিউট্রন সংখ্যা ($N$)
বা অন্যভাবে বলা যায়, কোনো পরমাণুর নিউট্রন সংখ্যা গণনা করার সূত্র হলো:
নিউট্রন সংখ্যা ($N$) = ভরসংখ্যা ($A$) - পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$)
উল্লেখ্য: একমাত্র সাধারণ হাইড্রোজেন ($^{1}_{1}\text{H}$) ব্যতীত সমস্ত মৌলের ক্ষেত্রে ভরসংখ্যা সর্বদা পারমাণবিক সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়।
৮ $^{238}_{\ 92}\text{X}$ পরমাণুটিতে প্রোটন, ইলেকট্রন ও নিউট্রন সংখ্যা কত? মান ২
প্রদত্ত পরমাণুর সংকেত হলো $^{238}_{\ 92}\text{X}$। এখানে চিহ্নের পাদদেশে লেখা সংখ্যাটি হলো পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) এবং শীর্ষে লেখা সংখ্যাটি হলো ভরসংখ্যা ($A$)।
প্রোটন সংখ্যা ($Z$): পদতলে থাকা সংখ্যা নির্দেশ করে, অর্থাৎ প্রোটন সংখ্যা = ৯২।
ইলেকট্রন সংখ্যা: যেহেতু পরমাণুটি প্রশম (তড়িৎহীন), তাই ইলেকট্রন সংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা = ৯২।
নিউট্রন সংখ্যা ($N$): $N = \text{ভরসংখ্যা } (A) - \text{পারমাণবিক সংখ্যা } (Z) = 238 - 92 =$ ১৪৬।
উত্তর: প্রোটন সংখ্যা = ৯২, ইলেকট্রন সংখ্যা = ৯২ এবং নিউট্রন সংখ্যা = ১৪৬। (প্রকৃতপক্ষে এটি ইউরেনিয়াম-২৩৮ পরমাণু)।
৯ ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য কী? মান ২
ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যার প্রধান পার্থক্যগুলি নিচে ছকের আকারে দেওয়া হলো:
| পার্থক্যের বিষয় |
পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) |
ভরসংখ্যা ($A$) |
| ১. সংজ্ঞা |
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত মোট প্রোটন সংখ্যাকে পারমাণবিক সংখ্যা বলে। |
পরমাণুর নিউক্লিয়াসে উপস্থিত মোট প্রোটন ও নিউট্রন সংখ্যার সমষ্টিকে ভরসংখ্যা বলে। |
| ২. মৌলের স্বকীয়তা |
এটি মৌলের নিজস্ব মৌলিক চরিত্র নির্ধারণ করে; পারমাণবিক সংখ্যা পরিবর্তিত হলে মৌল পরিবর্তিত হয়। |
একই মৌলের বিভিন্ন পরমাণুর ভরসংখ্যা ভিন্ন হতে পারে (আইসোটোপের ক্ষেত্রে)। |
| ৩. পর্যায় সারণিতে স্থান |
পর্যায় সারণিতে মৌলের স্থান পারমাণবিক সংখ্যার ক্রম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। |
পর্যায় সারণিতে স্থান নির্ধারণের সাথে ভরসংখ্যার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। |
| ৪. সাংখ্যমান |
সাধারণ হাইড্রোজেন ব্যতীত সর্বদা ভরসংখ্যার চেয়ে কম হয় ($Z < A$)। |
সাধারণ হাইড্রোজেন ব্যতীত সর্বদা পারমাণবিক সংখ্যার চেয়ে বেশি হয় ($A > Z$)। |
১০ $^{16}_{\ 8}\text{O}$-এর অর্থ কী? এর ইলেকট্রন বিন্যাস দেখাও। মান ২
১. সংকেতের তাৎপর্য বা অর্থ:
$^{16}_{\ 8}\text{O}$ সংকেতটি অক্সিজেনের একটি সুনির্দিষ্ট পরমাণুকে নির্দেশ করে, যার—
- পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) = ৮, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে প্রোটন সংখ্যা ৮ এবং বাইরে মোট ৮টি ইলেকট্রন রয়েছে।
- ভরসংখ্যা ($A$) = ১৬, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনের মোট সমষ্টি ১৬। ফলে নিউট্রন সংখ্যা = $16 - 8 = 8$।
২. ইলেকট্রন বিন্যাস:
বোর-বারি নীতি অনুযায়ী অক্সিজেনের ৮টি ইলেকট্রন বিভিন্ন শক্তিস্তরে নিম্নরূপে বিন্যস্ত থাকে:
K কক্ষ ($n=1$): ২ টি ইলেকট্রন
L কক্ষ ($n=2$): ৬ টি ইলেকট্রন
সংক্ষেপে ইলেকট্রন বিন্যাস: $2, 6$
১১ আইসোটোপ কাকে বলে? উদাহরণ দাও। মান ২
একই মৌলের ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু যাদের পারমাণবিক সংখ্যা (বা প্রোটন সংখ্যা) একই কিন্তু নিউক্লিয়াসে বিভিন্ন সংখ্যক নিউট্রন থাকার দরুন ভরসংখ্যা আলাদা হয়, তাদের পরস্পরের আইসোটোপ বা সমস্থানিক (Isotopes) বলে।
উদাহরণ: হাইড্রোজেনের তিনটি প্রাকৃতিক আইসোটোপ হলো—
- সাধারণ হাইড্রোজেন বা প্রোটিয়াম ($^{1}_{1}\text{H}$)
- ভারী হাইড্রোজেন বা ডয়টেরিয়াম ($^{2}_{1}\text{H}$ বা $\text{D}$)
- তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন বা ট্রাইটিয়াম ($^{3}_{1}\text{H}$ বা $\text{T}$)
অনুরূপভাবে কার্বনের আইসোটোপগুলি হলো $^{12}_{6}\text{C}, ^{13}_{6}\text{C}$ ও $^{14}_{6}\text{C}$।
১২ আইসোবার কাকে বলে? উদাহরণ দাও। মান ২
ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু যাদের পারমাণবিক সংখ্যা (প্রোটন সংখ্যা) আলাদা কিন্তু ভরসংখ্যা একই, তাদের পরস্পরের আইসোবার বা সমভারী (Isobars) বলে।
উদাহরণ: আর্গন ($^{40}_{18}\text{Ar}$), পটাসিয়াম ($^{40}_{19}\text{K}$) এবং ক্যালসিয়াম ($^{40}_{20}\text{Ca}$) পরমাণুত্রয় পরস্পরের আইসোবার। কারণ এদের প্রত্যেকের ভরসংখ্যা ৪০, কিন্তু পারমাণবিক সংখ্যা যথাক্রমে ১৮, ১৯ এবং ২০। এদের রাসায়নিক ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়।
১৩ আইসোটোন কাকে বলে? উদাহরণ দাও। মান ২
ভিন্ন ভিন্ন মৌলের পরমাণু যাদের পারমাণবিক সংখ্যা ও ভরসংখ্যা উভয়ই ভিন্ন কিন্তু নিউক্লিয়াসে উপস্থিত নিউট্রন সংখ্যা সমান হয়, তাদের পরস্পরের আইসোটোন (Isotones) বলে।
উদাহরণ: সিলিকন ($^{30}_{14}\text{Si}$) ও ফসফরাস ($^{31}_{15}\text{P}$) পরস্পরের আইসোটোন। কারণ—
- সিলিকনের নিউট্রন সংখ্যা = $30 - 14 = 16$
- ফসফরাসের নিউট্রন সংখ্যা = $31 - 15 = 16$
উভয় নিউক্লিয়াসেই ১৬টি করে নিউট্রন বর্তমান। আরেকটি উদাহরণ হলো কার্বন-১৪ ($^{14}_{6}\text{C}$, নিউট্রন = $14 - 6 = 8$) এবং অক্সিজেন-১৬ ($^{16}_{8}\text{O}$, নিউট্রন = $16 - 8 = 8$)।
১ আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা থেকে রাদারফোর্ড কী সিদ্ধান্তে আসেন? মান ৩
বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ১৯১১ সালে একটি অতি পাতলা সোনার পাতের ($0.0004\text{ mm}$ পুরু) ওপর তীব্র গতিসম্পন্ন আলফা ($\alpha$) কণা নিক্ষেপ করে যে পর্যবেক্ষণগুলি পান, তার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলিতে উপনীত হন:
১. পরমাণুর অধিকাংশ স্থান ফাঁকা: পরীক্ষার সময় দেখা যায় প্রায় ৯৯% বা তার বেশি আলফা কণা কোনো রকম পথ পরিবর্তন না করে সরাসরি সোনার পাত ভেদ করে সোজা চলে যায়। এর থেকে রাদারফোর্ড সিদ্ধান্ত নেন যে পরমাণুর ভেতরের অধিকাংশ স্থানই সম্পূর্ণ ফাঁকা বা শূন্য।
২. ধনাত্মক আধানের পুঞ্জীভূত রূপ: খুব কম সংখ্যক আলফা কণা তাদের প্রাথমিক গতিপথ থেকে বিভিন্ন সূক্ষ্ম বা স্থূল কোণে বিচ্যুত হয়। যেহেতু আলফা কণা ধনাত্মক আধানযুক্ত দ্বি-আয়নিত হিলিয়াম ($\text{He}^{2+}$), তাই সমধর্মী আধানের বিকর্ষণের কারণেই এই বিচ্যুতি ঘটে। এ থেকে প্রমাণিত হয় পরমাণুর সমস্ত ধনাত্মক আধান পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অত্যন্ত ক্ষুদ্র জায়গায় পুঞ্জীভূত থাকে।
৩. ভারী নিউক্লিয়াসের অস্তিত্ব: প্রায় ২০,০০০ আলফা কণার মধ্যে মাত্র ১টি কণা যে পথে গিয়েছিল, পাত স্পর্শ করে ঠিক সেই পথেই ($১৮০^\circ$ কোণে) সোজা পেছনের দিকে ফিরে আসে। যেহেতু দ্রুতগামী আলফা কণা যথেষ্ট ভারী, তাই কোনো অতি নিরেট ও ভারী বাধার সম্মুখীন না হলে তার পেছনের দিকে ফিরে আসা অসম্ভব। এর থেকে রাদারফোর্ড সিদ্ধান্ত নেন যে পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অতি ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে পরমাণুর সমগ্র ভর এবং সমস্ত ধনাত্মক আধান কেন্দ্রীভূত থাকে। পরমাণুর এই নিরেট ভারী কেন্দ্রস্থলকে তিনি নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক আখ্যা দেন।
চিত্র ১: রাদারফোর্ডের আলফা (α) কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা এবং নিউক্লিয়াসের আবিষ্কার
২ রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেলের ত্রুটিগুলি উল্লেখ করো। মান ৩
রাদারফোর্ডের সৌরজগতের অনুকরণে তৈরি পরমাণু মডেল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এতে কয়েকটি গুরুতর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দেখা যায়:
১. পরমাণুর স্থায়িত্বের ব্যাখ্যায় ব্যর্থতা: ম্যাক্সওয়েলের চিরায়ত তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব অনুসারে, কোনো আধানযুক্ত কণা (যেমন ইলেকট্রন) বৃত্তাকার ত্বরণযুক্ত গতিতে ঘুরলে তা নিরবচ্ছিন্নভাবে তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ আকারে শক্তি বিকিরণ করবে। শক্তি ক্রমাগত হারাতে থাকলে আবর্তনশীল ইলেকট্রনের কক্ষপথের ব্যাসার্ধ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকবে এবং শেষপর্যন্ত ইলেকট্রনটি সর্পিলাকারে আবর্তিত হয়ে মাত্র প্রায় $10^{-8}$ সেকেন্ডের মধ্যে নিউক্লিয়াসে আছড়ে পড়বে। এর ফলে পরমাণুর অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে পরমাণু অত্যন্ত সুস্থিত; রাদারফোর্ডের মডেল এই স্থায়িত্বের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে না।
২. পারমাণবিক রেখা বর্ণালীর ব্যাখ্যায় ব্যর্থতা: শক্তি যদি ইলেকট্রন থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বের হতে থাকত, তবে পরমাণু থেকে নির্গত আলোর বর্ণালী একটি নিরবচ্ছিন্ন বা ধারাবাহিক বর্ণালী (Continuous spectrum) হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় দেখা যায় পরমাণুর বর্ণালী সর্বদা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি নির্দিষ্ট উজ্জ্বল রেখা দ্বারা গঠিত, যাকে রেখা বর্ণালী (Line spectrum) বলে। রাদারফোর্ডের মডেল এই রেখা বর্ণালীর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না।
৩. কক্ষপথের সুনির্দিষ্ট ধারণা অনুপস্থিত: নিউক্লিয়াসের চারদিকে ইলেকট্রনগুলি কোন্ কোন্ নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করবে এবং প্রতিটি কক্ষে কতগুলি করে ইলেকট্রন অবস্থান করবে, সে সম্পর্কে এই মডেল কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়।
চিত্র ২: ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বানুসারে শক্তি বিকিরণ ও ইলেকট্রনের সর্পিলাকার নিউক্লিয়াসে পতন (রাদারফোর্ড মডেলের ত্রুটি)
৩ $^{235}_{\ 92}\text{X}$ পরমাণুটির ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যা কত? পরমাণুটিতে যদি তিনটি নিউট্রন বেশি থাকত তবে সেটির সংকেত কীভাবে লেখা হত? মান ৩
১ম অংশ: ভরসংখ্যা ও পারমাণবিক সংখ্যা নির্ণয়:
প্রদত্ত পরমাণুর সংকেত হলো $^{235}_{\ 92}\text{X}$।
- চিহ্নের পাদদেশের সংখ্যা মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা নির্দেশ করে, সুতরাং পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) = ৯২।
- চিহ্নের শীর্ষদেশের সংখ্যা মৌলের ভরসংখ্যা নির্দেশ করে, সুতরাং ভরসংখ্যা ($A$) = ২৩৫।
২য় অংশ: তিনটি নিউট্রন বেশি থাকলে নতুন সংকেত গঠন:
- পরমাণুটিতে বর্তমান নিউট্রন সংখ্যা = $\text{ভরসংখ্যা} - \text{পারমাণবিক সংখ্যা} = 235 - 92 = 143$।
- যদি তিনটি নিউট্রন বেশি থাকত, তবে নতুন নিউট্রন সংখ্যা হতো = $143 + 3 = 146$।
- যেহেতু প্রোটন সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে (৯২), তাই মৌলের পারমাণবিক সংখ্যা এবং মৌলের প্রতীক ($\text{X}$) একই থাকবে।
- অতএব নতুন ভরসংখ্যা ($A'$) হবে = প্রোটন সংখ্যা + নতুন নিউট্রন সংখ্যা = $92 + 146 = 238$ (বা সরাসরি $235 + 3 = 238$)।
অতএব পরমাণুটির নতুন সংকেত লেখা হতো: $^{238}_{\ 92}\text{X}$ (এটি মূল পরমাণুর একটি আইসোটোপ)।
৪ $^{35}_{17}\text{Cl}$ পরমাণুর গঠন বর্ণনা করো। মান ৩
$^{35}_{17}\text{Cl}$ হলো ক্লোরিন মৌলের একটি সাধারণ ও স্থায়ী প্রশম পরমাণু। এর গঠন নিম্নরূপ:
১. মৌলিক কণিকাসমূহের সংখ্যা নির্ণয়:
- প্রোটন সংখ্যা ($Z$): পাদদেশে থাকা পারমাণবিক সংখ্যা ১৭, অর্থাৎ ক্লোরিন পরমাণুতে ১৭টি প্রোটন রয়েছে।
- নিউট্রন সংখ্যা ($N$): ভরসংখ্যা ($A$) = ৩৫। নিউট্রন সংখ্যা = $A - Z = 35 - 17 = 18$টি।
- ইলেকট্রন সংখ্যা: প্রশম পরমাণু হওয়ায় মোট ইলেকট্রন সংখ্যা = প্রোটন সংখ্যা = ১৭টি।
২. নিউক্লিয়াসের গঠন:
ক্লোরিন পরমাণুর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অতি ক্ষুদ্র ও ঘন নিউক্লিয়াসে ১৭টি প্রোটন এবং ১৮টি নিউট্রন শক্তিশালী নিউক্লীয় বলের দ্বারা দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকে। নিউক্লিয়াসের মোট ধনাত্মক আধান হলো $+17e$।
৩. ইলেকট্রন বিন্যাস (বোর-বারি নীতি অনুযায়ী):
নিউক্লিয়াসের বাইরে বিভিন্ন অনুমোদিত প্রধান শক্তিস্তরে বা কক্ষপথে ১৭টি ইলেকট্রন নিম্নরূপে সজ্জিত থাকে:
- K কক্ষ ($n=1$): ২ টি ইলেকট্রন ($2 \times 1^2 = 2$)
- L কক্ষ ($n=2$): ৮ টি ইলেকট্রন ($2 \times 2^2 = 8$)
- M কক্ষ ($n=3$): অবশিষ্ট ৭ টি ইলেকট্রন ($17 - (2 + 8) = 7$)
অতএব ক্লোরিনের ইলেকট্রন বিন্যাস হলো $2, 8, 7$। সবচেয়ে বাইরের কক্ষপথ অর্থাৎ M কক্ষে ৭টি ইলেকট্রন থাকে, যা এর যোজ্যতা ইলেকট্রন। অষ্টক পূরণের জন্য ক্লোরিন পরমাণু ১টি ইলেকট্রন গ্রহণ করে স্থায়ী $\text{Cl}^-$ অ্যানায়নে পরিণত হয়।
চিত্র ৩: ক্লোরিন পরমাণুর (³⁵₁₇Cl) নিউক্লিয়াস ও কক্ষপথভিত্তিক ইলেকট্রন বিন্যাস (২, ৮, ৭)
৫ হাইড্রোজেনের আইসোটোপগুলির নিউক্লিয়াসের গঠন বর্ণনা করো। মান ৩
প্রকৃতিতে হাইড্রোজেন মৌলের তিনটি আইসোটোপ পাওয়া যায়। এদের প্রত্যেকের পারমাণবিক সংখ্যা ১ হলেও নিউক্লিয়াসে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক নিউট্রন থাকার কারণে এদের নিউক্লিয়াসের গঠন আলাদা হয়:
১. সাধারণ হাইড্রোজেন বা প্রোটিয়াম ($^{1}_{1}\text{H}$):
এর নিউক্লিয়াসে কেবল ১টি প্রোটন থাকে এবং কোনো নিউট্রন থাকে না ($N = 1 - 1 = 0$)। সমগ্র পর্যায় সারণির মধ্যে এটিই একমাত্র পরমাণু যার নিউক্লিয়াসে কোনো নিউট্রন কণা নেই। নিউক্লিয়াসের আধান $+1e$।
২. ভারী হাইড্রোজেন বা ডয়টেরিয়াম ($^{2}_{1}\text{H}$ বা $\text{D}$):
ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াসে ১টি প্রোটন এবং ১টি নিউট্রন বর্তমান ($N = 2 - 1 = 1$)। প্রোটন ও নিউট্রন পরস্পরের সাথে নিউক্লীয় বল দ্বারা আবদ্ধ থেকে ভারী নিউক্লিয়াস গঠন করে।
৩. তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন বা ট্রাইটিয়াম ($^{3}_{1}\text{H}$ বা $\text{T}$):
ট্রাইটিয়ামের নিউক্লিয়াসে ১টি প্রোটন এবং ২টি নিউট্রন থাকে ($N = 3 - 1 = 2$)। নিউক্লিয়াসে নিউট্রন ও প্রোটনের অনুপাত ($\frac{N}{P} = 2$) অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই নিউক্লিয়াসটি সুস্থিত হতে পারে না এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তেজস্ক্রিয় বিটা ($\beta$) কণা বিকিরণ করে।
উল্লেখ্য: এই তিনটি আইসোটোপেরই নিউক্লিয়াসের বাইরে K-কক্ষে একটিমাত্র ইলেকট্রন আবর্তন করে।
চিত্র ৪: হাইড্রোজেনের তিনটি আইসোটোপের (প্রোটিয়াম, ডয়টেরিয়াম ও ট্রাইটিয়াম) নিউক্লিয়াস ও গঠন তুলনা
৬ কক্ষ থেকে কক্ষান্তরে ইলেকট্রনের গমনের ফলে শক্তির শোষণ বা বিকিরণ কীভাবে হয়? মান ৩
বিজ্ঞানী নীলস বোরের (Niels Bohr) কোয়ান্টাম পরমাণু মডেল অনুসারে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলি নির্দিষ্ট শক্তিযুক্ত অনুমোদিত স্থির কক্ষপথে ঘোরাফেরা করার সময় কোনো শক্তি শোষণ বা বিকিরণ করে না। কিন্তু ইলেকট্রন যখন এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সংক্রমিত হয়, তখন শক্তির শোষণ বা বিকিরণ ঘটে:
১. শক্তির শোষণ (নিম্ন কক্ষ থেকে উচ্চ কক্ষে গমন):
যখন কোনো ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসের নিকটবর্তী অপেক্ষাকৃত কম শক্তিসম্পন্ন নিম্ন কক্ষপথ ($E_1$) থেকে দূরবর্তী অধিক শক্তিসম্পন্ন উচ্চ কক্ষপথে ($E_2$) লাফিয়ে যায়, তখন পরমাণুটি বাইরে থেকে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি ফোটন কণা রূপে শোষণ করে। এই অবস্থাকে পরমাণুর 'উত্তেজিত অবস্থা' (Excited state) বলে।
২. শক্তির বিকিরণ (উচ্চ কক্ষ থেকে নিম্ন কক্ষে প্রত্যাবর্তন):
পরমাণুর উত্তেজিত অবস্থা অস্থায়ী হওয়ায় উচ্চ শক্তিস্তরের ($E_2$) ইলেকট্রনটি যখন পুনরায় নিম্ন শক্তিস্তরে ($E_1$) নেমে আসে, তখন দুই কক্ষপথের শক্তির পার্থক্যের সমান অতিরিক্ত শক্তি তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বা আলোক তরঙ্গাকারে মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। এই বিকিরণের ফলেই পারমাণবিক রেখা বর্ণালী উৎপন্ন হয়।
৩. বোরের কম্পাঙ্ক শর্ত (Bohr's Frequency Condition):
শোষিত বা বিকিরিত শক্তির পরিমাণ দুই কক্ষপথের শক্তির পার্থক্যের সাথে সমান হয়:
$\Delta E = E_2 - E_1 = h\nu$
যেখানে $h$ হলো প্লাঙ্কের ধ্রুবক ($6.626 \times 10^{-27}\text{ erg}\cdot\text{s}$) এবং $\nu$ হলো নির্গত বা শোষিত বিকিরণের কম্পাঙ্ক ($\nu = \frac{c}{\lambda}$)।
চিত্র ৫: নীলস বোরের পরমাণু মডেল এবং কক্ষপথ পরিবর্তনের সময় শক্তির শোষণ ও বিকিরণ প্রক্রিয়া
৭ $^{32}_{16}\text{X}^{2-}$ আয়নটির প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন সংখ্যা গণনা করো। মান ৩
প্রদত্ত আয়নটির প্রতীক হলো: $^{32}_{16}\text{X}^{2-}$।
এখানে মৌলটির পারমাণবিক সংখ্যা $Z = 16$ এবং ভরসংখ্যা $A = 32$। আয়নটি একটি দ্বি-ঋণাত্মক অ্যানায়ন (আধান = $-2$)।
১. প্রোটন সংখ্যা গণনা:
আয়ন সৃষ্টি হয় পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ কক্ষপথ থেকে ইলেকট্রন গ্রহণ বা ত্যাগের ফলে; নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে থাকা প্রোটন সংখ্যা সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে।
অতএব, প্রোটন সংখ্যা = পারমাণবিক সংখ্যা ($Z$) = ১৬।
২. নিউট্রন সংখ্যা গণনা:
নিউট্রন সংখ্যার সূত্রানুযায়ী:
$$\text{নিউট্রন সংখ্যা } (N) = \text{ভরসংখ্যা } (A) - \text{পারমাণবিক সংখ্যা } (Z)$$
$$N = 32 - 16 = \mathbf{16}$$
অতএব, নিউট্রন সংখ্যা = ১৬।
৩. ইলেকট্রন সংখ্যা গণনা:
একটি নিস্তড়িৎ বা প্রশম $\text{X}$ পরমাণুতে ইলেকট্রন সংখ্যা প্রোটন সংখ্যার সমান অর্থাৎ ১৬টি থাকত।
কিন্তু এখানে আয়নটির আধান হলো $-2$, যার অর্থ স্থিতিশীল অষ্টক পূরণের জন্য পরমাণুটি বাইরে থেকে ২টি অতিরিক্ত ইলেকট্রন গ্রহণ করেছে।
$$\text{ইলেকট্রন সংখ্যা} = \text{প্রোটন সংখ্যা} + \text{গৃহীত ইলেকট্রন} = 16 + 2 = \mathbf{18}$$
অতএব, ইলেকট্রন সংখ্যা = ১৮।
সারসংক্ষেপ ফলাফল:
• প্রোটন সংখ্যা = ১৬
• নিউট্রন সংখ্যা = ১৬
• ইলেকট্রন সংখ্যা = ১৮
(উল্লেখ্য: পারমাণবিক সংখ্যা ১৬ বিশিষ্ট মৌলটি হলো সালফার, অর্থাৎ আয়নটি হলো সালফাইড আয়ন $\text{S}^{2-}$ যার ইলেকট্রন বিন্যাস আর্গনের মতো ২, ৮, ৮)।
পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য উত্তরের সাথে পরিচ্ছন্ন চিত্র আঁকা অত্যন্ত জরুরি। নিচে এই উপ-অধ্যায়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক মডেলগুলির স্কেলযোগ্য ভেক্টর চিত্র (SVG) সংকলিত হলো:
চিত্র: রাদারফোর্ডের আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষা ও নিউক্লিয়াসের ধারণা
চিত্র: বোর মডেল ও কোয়ান্টাম শক্তিস্তরের শোষণ-বিকিরণ
চিত্র: ক্লোরিনের (³⁵₁₇Cl) ইলেকট্রন বিন্যাস (K=2, L=8, M=7)
চিত্র: প্রোটিয়াম, ডয়টেরিয়াম ও ট্রাইটিয়ামের নিউক্লিয়াস তুলনা
সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করো: