WBBSE Class 9 History Chapter 5 বিংশ শতকে ইউরোপ : সম্পূর্ণ পাঠ্যবই প্রশ্নোত্তর ও গাইড
September 15, 2026
0 Views
0 Likes
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) নবম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের পঞ্চম অধ্যায়: বিংশ শতকে ইউরোপ (Europe in the 20th Century)-এর 'হাতে কলমে' অনুশীলনী ও সহায়ক পাঠের সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর এখানে নির্ভুলভাবে সমাধান করা হয়েছে। রাশিয়ায় স্বৈরাচারী জারতন্ত্রের অবসান ও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা, উড্রো উইলসনের চোদ্দ দফা নীতি, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ, জার্মানিতে হিটলারের নাৎসিবাদ, ১৯২৯ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধ সংক্রান্ত সমস্ত MCQ, অতিসংক্ষিপ্ত, সংক্ষিপ্ত (মান ২), বিশ্লেষণমূলক (মান ৪) এবং ব্যাখ্যামূলক (মান ৮) প্রশ্নোত্তরের নিখুঁত ব্যাখ্যা ও মডেল উত্তর সংকলিত হয়েছে।
১প্রথম সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় —
(A) ফ্রান্সে
(B) জার্মানিতে
(C) রাশিয়ায়
(D) ইতালিতে
সঠিক উত্তর: (C) রাশিয়ায়
ব্যাখ্যা: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর বিপ্লবের (ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপ্লব) মাধ্যমে ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক বা সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
২সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার পূর্বে রাশিয়ায় কোন্ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল?
(A) স্টুয়ার্ট
(B) রোমানভ
(C) বুরবোঁ
(D) টিউডর
সঠিক উত্তর: (B) রোমানভ
ব্যাখ্যা: রাশিয়ায় ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্বৈরাচারী রোমানভ (Romanov) রাজবংশের জারতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল।
৩রাশিয়ার সমাজব্যবস্থার শীর্ষে ছিল —
(A) অভিজাত সম্প্রদায়
(B) মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়
(C) বুর্জোয়া সম্প্রদায়
(D) শ্রমিক সম্প্রদায়
সঠিক উত্তর: (A) অভিজাত সম্প্রদায়
ব্যাখ্যা: প্রাক-বিপ্লব রাশিয়ার সামন্ততান্ত্রিক পিরামিডাকার সমাজব্যবস্থার শিখরে ছিলেন জার ও অভিজাত ভূস্বামী সম্প্রদায়, যাঁরা যাবতীয় করভারমুক্ত থেকে সমস্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা ভোগ করতেন।
৪রোমানভ বংশের পতন ঘটে কোন্ শাসকের আমলে?
(A) প্রথম নিকোলাস
(B) দ্বিতীয় আলেকজান্ডার
(C) প্রথম আলেকজান্ডার
(D) দ্বিতীয় নিকোলাস
সঠিক উত্তর: (D) দ্বিতীয় নিকোলাস
ব্যাখ্যা: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে (রুশ ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব) শেষ জার দ্বিতীয় নিকোলাসের সিংহাসন ত্যাগের মধ্য দিয়ে রোমানভ বংশের পতন ঘটে।
৫রাশিয়ায় সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন —
(A) লেনিন
(B) হিটলার
(C) লুভর
(D) দ্বিতীয় আলেকজান্ডার
সঠিক উত্তর: (A) লেনিন
ব্যাখ্যা: বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন কেরেনস্কির সাময়িক মেনশেভিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাশিয়ায় বলশেভিক সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।
৬রুশ বিপ্লব হয়েছিল —
(A) 1917 খ্রিস্টাব্দের মার্চে
(B) 1917 খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে
(C) 1917 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে
(D) 1917 খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে
সঠিক উত্তর: (A) 1917 খ্রিস্টাব্দের মার্চে / (C) 1917 খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে
ব্যাখ্যা: ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে (রুশ পঞ্জিকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি / ৮ মার্চ) পেট্রোগ্রাডে প্রথম গণঅভ্যুত্থানের ফলে জারতন্ত্রের পতন ঘটে (মার্চ বিপ্লব)। পরবর্তীতে ২৫শে অক্টোবর (৭ই নভেম্বর) লেনিনের নেতৃত্বে দ্বিতীয় পর্বে ঐতিহাসিক বলশেভিক বিপ্লব বা অক্টোবর বিপ্লব সম্পন্ন হয়। পাঠ্যবই অনুসারে মার্চ বিপ্লব (A) এবং অক্টোবর বিপ্লব (C) উভয়ই রুশ বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য।
৭ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছিল —
(A) রাশিয়ায়
(B) স্পেনে
(C) পর্তুগালে
(D) ইতালিতে
সঠিক উত্তর: (D) ইতালিতে
ব্যাখ্যা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মিত্রপক্ষ কর্তৃক প্রতারিত ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইতালিতে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বেনিটো মুসোলিনির হাত ধরে উগ্র ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের উদ্ভব হয়।
৮মুসোলিনির উপাধি ছিল —
(A) জার
(B) কাইজার
(C) ফ্যুয়েরার
(D) ইল দ্যুচে
সঠিক উত্তর: (D) ইল দ্যুচে
ব্যাখ্যা: ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিটো মুসোলিনি ইতালীয় ভাষায় 'ইল দ্যুচে' (Il Duce বা 'প্রধান রাষ্ট্রনেতা') উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
৯জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে কীসের উদ্ভব হয়েছিল?
(A) সাম্যবাদ
(B) চরম ফ্যাসিবাদ
(C) প্রজাতন্ত্র
(D) নাৎসিবাদ
সঠিক উত্তর: (D) নাৎসিবাদ
ব্যাখ্যা: অ্যাডলফ হিটলারের ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির উগ্র বর্ণবাদী ও একনায়কতান্ত্রিক মতাদর্শ সংক্ষেপে 'নাৎসিবাদ' (Nazism) নামে পরিচিত।
১০‘মেই ক্যাম্পফ’ গ্রন্থটি রচনা করেন —
(A) তুর্গেনিভ
(B) ভলতেয়ার
(C) মুসোলিনি
(D) হিটলার
সঠিক উত্তর: (D) হিটলার
ব্যাখ্যা: ১৯২৩ সালে মিউনিখ অভ্যুত্থানের অভিযোগে কারাবন্দি অবস্থায় হিটলার তাঁর আত্মজীবনীমূলক ও নাৎসিবাদের বাইবেলস্বরূপ গ্রন্থ 'মেই ক্যাম্পফ' (Mein Kampf বা 'আমার সংগ্রাম') রচনা করেন।
১১জার্মানিতে নাৎসি দলের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন —
(A) বিসমার্ক
(B) কাইজার
(C) লেনিন
(D) হিটলার
সঠিক উত্তর: (D) হিটলার
ব্যাখ্যা: ১৯৩৩ সালে জার্মান চ্যান্সেলর নিযুক্ত হয়ে হিটলার ভাইমার প্রজাতন্ত্র ধ্বংস করে রাইখস্ট্যাগ বিলুপ্তির মাধ্যমে নাৎসি দলের সর্বাত্মক একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন।
১২কাদের মধ্যে রোম-বার্লিন অক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?
(A) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স
(B) রাশিয়া ও জার্মানি
(C) ইতালি ও জার্মানি
(D) জার্মানি ও ফ্রান্স
সঠিক উত্তর: (C) ইতালি ও জার্মানি
ব্যাখ্যা: ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ফ্যাসিস্ট ইতালি ও নাৎসি জার্মানির মধ্যে 'রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়, যা পরবর্তীতে জাপানের সংযুক্তির মাধ্যমে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষ চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
১৩স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন —
(A) লেনিন
(B) হিটলার
(C) জেনারেল ফ্রাঙ্কো
(D) তুর্গেনিভ
সঠিক উত্তর: (C) জেনারেল ফ্রাঙ্কো
ব্যাখ্যা: ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধে হিটলার ও মুসোলিনির সামরিক সহায়তায় প্রজাতন্ত্রী সরকারকে হারিয়ে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।
১_____ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছিল।
উত্তর: ১৯১৮ (১১ই নভেম্বর ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে)।
২পশ্চিমি ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন _____ চুক্তি গঠন করেছে।
উত্তর: ওয়ারশ (ন্যাটোর বিপরীতে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত ইউনিয়ন 'ওয়ারশ প্যাক্ট' সামরিক জোট গঠন করে)।
৩জাতিসংঘ _____ খ্রিস্টাব্দে গঠিত হয়েছিল।
উত্তর: ১৯২০ (১০ই জানুয়ারি ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ভার্সাই সন্ধির অঙ্গ হিসেবে লিগ অব নেশনস বা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়)।
৪মুসোলিনির নেতৃত্বে ঐতিহাসিক রোম অভিযান হয়েছিল _____ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে।
উত্তর: ১৯২২ (২৮-২৯শে অক্টোবর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনির কালো কুর্তা বাহিনী রোম অভিযান করে ক্ষমতা দখল করে)।
৫স্পেনের গৃহযুদ্ধ _____ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল।
উত্তর: ১৯৩৬ (১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে সামরিক বিদ্রোহের মাধ্যমে স্পেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়)।
১রুশ বিপ্লব হয়েছিল 1909 খ্রিস্টাব্দে।
উত্তর: ভুল (সঠিক তথ্য: রুশ বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে; এর আগে প্রথম গণবিপ্লব হয়েছিল ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে)
২উড্রো উইলসন তাঁর চোদ্দ দফা নীতি ঘোষণা করেছিলেন 1918 খ্রিস্টাব্দের 8 জানুয়ারি।
উত্তর: ঠিক (মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ৮ই জানুয়ারি ১৯১৮ সালে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৪ দফা নীতি ঘোষণা করেন)
৩1929-এর মহামন্দার প্রভাব গ্রেট ব্রিটেনের ওপর পড়েনি।
উত্তর: ভুল (সঠিক তথ্য: মহামন্দার বিশ্বব্যাপী প্রভাব পড়েছিল এবং ব্রিটেনের রপ্তানি বাণিজ্য ও শিল্প মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছিল)
৪ফ্যাসিস্ট দলের জনক ছিলেন বেনিটো মুসোলিনি।
উত্তর: ঠিক (১৯১৯ সালে মিলান শহরে মুসোলিনি 'ফাসিও দি কমব্যাতিমেন্তো' বা ফ্যাসিস্ট দল গঠন করেন)
৫1933 খ্রিস্টাব্দে হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন।
উত্তর: ঠিক (৩০শে জানুয়ারি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রপতি পল ভন হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত করেন)
৬স্পেনের গৃহযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল ফ্রাঙ্কো।
উত্তর: ঠিক (বিদ্রোহী জাতীয়তাবাদী সেনাবহরের সর্বাধিনায়ক হিসেবে জেনারেল ফ্রাঙ্কো গৃহযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন)
১'ক' স্তম্ভের সাথে 'খ' স্তম্ভ মেলাও:
| 'ক' স্তম্ভ |
'খ' স্তম্ভ |
| (a) ইল দ্যুচে | (i) হিটলার |
| (b) ফ্যাসিবাদ | (ii) জার্মানি |
| (c) নাৎসিবাদ | (iii) ইতালি |
| (d) মেই ক্যাম্পফ | (iv) মুসোলিনি |
সঠিক মিল:
(a) ইল দ্যুচে → (iv) মুসোলিনি
(b) ফ্যাসিবাদ → (iii) ইতালি
(c) নাৎসিবাদ → (ii) জার্মানি
(d) মেই ক্যাম্পফ → (i) হিটলার
২'ক' স্তম্ভের সাথে 'খ' স্তম্ভ মেলাও:
| 'ক' স্তম্ভ |
'খ' স্তম্ভ |
| (a) এপ্রিল থিসিস | (i) হিটলার |
| (b) চোদ্দ দফা দাবি | (ii) মুসোলিনি |
| (c) ইল পপোলো দ্য ইতালিয়া | (iii) লেনিন |
| (d) ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি | (iv) উড্রো উইলসন |
সঠিক মিল:
(a) এপ্রিল থিসিস → (iii) লেনিন
(b) চোদ্দ দফা দাবি → (iv) উড্রো উইলসন
(c) ইল পপোলো দ্য ইতালিয়া → (ii) মুসোলিনি (তাঁর সম্পাদিত জাতীয়তাবাদী পত্রিকা)
(d) ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি → (i) হিটলার
১নীচের বিবৃতিটির সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
বিবৃতি : জার্মানিতে নাৎসিবাদের উদ্ভব ঘটে।
ব্যাখ্যা ১ : বিরোধী শক্তির দুর্বলতার সুযোগে হিটলার জার্মানদের আর্থিক স্থিতিশীলতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
ব্যাখ্যা ২ : ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব ঘটেছিল।
ব্যাখ্যা ৩ : জার্মানিতে তীব্র অর্থসংকট দেখা যায়।
সঠিক উত্তর: ব্যাখ্যা ১ : বিরোধী শক্তির দুর্বলতার সুযোগে হিটলার জার্মানদের আর্থিক স্থিতিশীলতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
কারণ: ভার্সাই সন্ধির চরম জাতীয় অপমান এবং ১৯২৯-এর মহামন্দায় জর্জরিত বেকার জার্মানদের হিটলার কাজ, রুটি ও জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আকৃষ্ট করেছিলেন।
২নীচের বিবৃতিটির সঠিক ব্যাখ্যাটি নির্বাচন করো:
বিবৃতি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে ঋণদানের নীতি বাতিল করে।
ব্যাখ্যা ১ : ইউরোপের বেশিরভাগ দেশই আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
ব্যাখ্যা ২ : মহামন্দার কারণে পুঁজিবাদ ভেঙে পড়েছিল।
ব্যাখ্যা ৩ : মহামন্দার প্রকোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছিল।
সঠিক উত্তর: ব্যাখ্যা ৩ : মহামন্দার প্রকোপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পড়েছিল।
কারণ: ১৯২৯ সালের অক্টোবরে নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারের ভয়াবহ ধসের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাঙ্ক ও প্রতিষ্ঠানগুলি দেউলিয়া হয়ে পড়ায় তারা বিদেশে প্রদত্ত ঋণ প্রত্যাহার করে ও নতুন ঋণদান বন্ধ করে দেয়।
১কোন্ জারের আমলে 1905 খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল?
উত্তর: রোমানভ বংশীয় শেষ রাশিয়ান জার দ্বিতীয় নিকোলাসের (Tsar Nicholas II) আমলে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল।
২বলশেভিক দলের নেতা কে ছিলেন?
উত্তর: রাশিয়ার সামাজিক গণতান্ত্রিক শ্রমিক দলের সংখ্যাগুরু বলশেভিক গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (V. I. Lenin)।
৩দুজন রুশ সাহিত্যিকের নাম লেখো।
উত্তর: দুজন বিশিষ্ট রুশ সাহিত্যিক হলেন ম্যাক্সিম গোর্কি (তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'মা') এবং লিও টলস্টয় (তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'ওয়ার অ্যান্ড পিস')। এছাড়া আন্তন চেখভ ও ইভান তুর্গেনিভের নামও উল্লেখযোগ্য।
৪ব্রেস্টলিটোভস্কের সন্ধি কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?
উত্তর: ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মার্চ বলশেভিক রাশিয়া এবং জার্মানির মধ্যে ব্রেস্টলিটোভস্কের সন্ধি (Treaty of Brest-Litovsk) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার ফলে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরে আসে।
৫'এপ্রিল থিসিস' কে ঘোষণা করেন?
উত্তর: বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন সুইজারল্যান্ড থেকে পেট্রোগ্রাডে ফিরে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই এপ্রিল 'এপ্রিল থিসিস' ঘোষণা করেন।
৬বিশ্বের প্রথম সমাজতন্ত্র কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ফলস্বরূপ রাশিয়ায় (সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
৭কোন্ জারের আমলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: জার দ্বিতীয় নিকোলাসের ক্ষমতাচ্যুতির পর বুর্জোয়া মেনশেভিক সরকারকে অপসারিত করে ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
৮মুসোলিনির উপাধি কী ছিল?
উত্তর: ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিটো মুসোলিনির উপাধি ছিল 'ইল দ্যুচে' (Il Duce), যার অর্থ 'প্রধান নেতা'।
৯মুসোলিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নাম লেখো।
উত্তর: মুসোলিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নাম ছিল ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি (National Fascist Party বা ফ্যাসিস্ট দল)।
১০ফ্যাসিবাদ কোথায় প্রভাব বিস্তার করেছিল?
উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদ প্রধানত ইতালিতে সর্বময় প্রভাব বিস্তার করেছিল ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল।
১১ভাইমার প্রজাতন্ত্র কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
উত্তর: কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের পতনের পর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে গণতান্ত্রিক ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Weimar Republic) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১২নাৎসি দলের নেতা কে ছিলেন?
উত্তর: নাৎসি দলের (National Socialist German Workers' Party) সর্বেসর্বা নেতা ছিলেন অ্যাডলফ হিটলার।
১৩'মেই ক্যাম্পফ' গ্রন্থটি কে রচনা করেন?
উত্তর: 'মেই ক্যাম্পফ' (Mein Kampf) গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন নাৎসি একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার।
১৪হিটলারের উপাধি কী ছিল?
উত্তর: হিটলারের উপাধি ছিল 'ডের ফ্যুয়েরার' (Der Führer), যার অর্থ 'একচ্ছত্র সর্বাধিনায়ক' বা 'পথপ্রদর্শক'।
১৫কার নেতৃত্বে স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়?
উত্তর: জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর (General Francisco Franco) নেতৃত্বে স্পেনের গৃহযুদ্ধে জয়লাভের পর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
১ রুশ বিপ্লবের পশ্চাতে অর্থনৈতিক পটভূমিকা কী ছিল? মান ২
রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) পশ্চাতে প্রধান অর্থনৈতিক পটভূমিকাগুলি ছিল:
কৃষকদের চরম দুর্দশা: ১৮৬১ সালে ভুমিদাসপ্রথা উচ্ছেদ হলেও কৃষকরা জমির মালিকানা পায়নি। 'মির'-এর অধীনে তাদের ওপর অত্যধিক রাজস্ব, ক্ষতিপূরণের কিস্তি ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণ কৃষকদের সর্বস্বান্ত করেছিল।
শ্রমিকদের শোষণ ও যুদ্ধজনিত সংকট: কলকারখানায় শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে দৈনিক ১২-১৬ ঘণ্টা অমানবিক খাটানো হতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার বিপুল আর্থিক অপচয়ে খাদ্যশস্যের মারাত্মক আকাল, মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।
২ নারোদনিক আন্দোলনের কারণ কী ছিল? মান ২
ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে রাশিয়ায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে 'জনগণের কাছে চলো' (Going to the People) ধ্বনি তুলে নারোদনিক আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রধান কারণ ছিল:
জারতন্ত্রের স্বৈরতন্ত্র ও কৃষকদের শোচনীয় দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে গ্রামীণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের বিপ্লবোন্মুখ করে তোলা।
পাশ্চাত্য পুঁজিবাদী শিল্পায়নের পথ পরিহার করে রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পঞ্চায়েত বা 'মির'-এর ভিত্তিতে সরাসরি সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
৩ নাৎসিবাদ বলতে কী বোঝো? মান ২
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে তাঁর রাজনৈতিক দল 'ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি' (নাৎসি দল)-র উগ্র জাতীয়তাবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক মতাদর্শকে নাৎসিবাদ (Nazism) বলা হয়।
এর মূল ভিত্তি ছিল উগ্র জার্মান আর্য রক্তের শ্রেষ্ঠত্ববাদ, তীব্র ইহুদিবিদ্বেষ, গণতন্ত্র ও সাম্যবাদের মূলোৎপাটন এবং যুদ্ধ ও ভূখণ্ড বিস্তারের (Lebensraum) মাধ্যমে বিশ্ব আধিপত্য কায়েম করা।
৪ ফ্যাসিবাদ বলতে কী বোঝো? মান ২
ইতালীয় শব্দ 'Fascio' (যার অর্থ একতাবদ্ধ কাষ্ঠখণ্ড বা শক্তি) থেকে উদ্ভূত ফ্যাসিবাদ হলো বেনিটো মুসোলিনি প্রবর্তিত চরম কর্তৃত্ববাদী, সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী ও যুদ্ধংদেহী এক রাজনৈতিক মতাদর্শ।
মুসোলিনির মতে— "রাষ্ট্রের মধ্যেই সব কিছু, রাষ্ট্রের বাইরে কিছু নেই, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কেউ নয়।" অর্থাৎ ব্যক্তি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার কোনো মূল্য নেই, রাষ্ট্র ও দলনেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্যই ফ্যাসিবাদের সারকথা।
৫ 'বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা' বলতে কী বোঝো? মান ২
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের 'ওয়াল স্ট্রিট' শেয়ার বাজারে ভয়াবহ ধস নামার ফলে পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক স্থবিরতা, শিল্প সংকট, মূল্যহ্রাস ও লক্ষ লক্ষ মানুষের বেকারত্ব দেখা দেয়, তাকে ইতিহাসে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা (Great Depression, 1929–1933) বলা হয়। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ব্যতীত সমগ্র বিশ্ব এই মহামন্দায় আক্রান্ত হয়েছিল।
৬ কুলাক কারা? মান ২
প্রাক-বিপ্লব রাশিয়ার তুলনামূলকভাবে বিত্তবান, অবস্থাপন্ন ও জোতদার কৃষকদের কুলাক (Kulak) বলা হতো। এদের নিজস্ব জমি, ঘোড়া ও খামার থাকত এবং এরা অন্যান্য গরিব কৃষক ও মজুরদের সুদে টাকা ধার দিয়ে ও খাটিয়ে শোষণ করত। বলশেভিক বিপ্লব ও স্টালিনের সমষ্টিকরণ নীতিতে কুলাকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের নিঃশেষ করা হয়।
৭ মির কী? মান ২
জার শাসনাধীন রাশিয়ায় ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসিত স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা গ্রাম পঞ্চায়েতকে মির (Mir) বা 'অবশচিনা' বলা হতো। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ভূমিদাসপ্রথা বিলোপের পর জারের সরকার জমি সরাসরি কৃষকদের না দিয়ে 'মির'-কে অর্পণ করে। 'মির' কৃষকদের মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদে জমি পুনর্বণ্টন করত এবং জারের সমস্ত কর ও ক্ষতিপূরণের কিস্তি আদায়ের যৌথ দায়িত্ব বহন করত।
৮ 'রক্তাক্ত রবিবার' (Bloody Sunday) কী? মান ২
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি (রবিবার) রাশিয়ার পেট্রোগ্রাডে ফাদার গ্যাপনের নেতৃত্বে লক্ষাধিক নিরস্ত্র শ্রমিক রুটির দাবি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আবেদনপত্র নিয়ে জারের উইন্টার প্যালেসের সামনে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের রাজকীয় পুলিশ ও কসাক বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সহস্রাধিক নিরীহ নরনারীকে হত্যা করে। রাশিয়ার ইতিহাসে এই বর্বরোচিত ঘটনাকে 'রক্তাক্ত রবিবার' বলা হয়, যা ১৯০৫-এর বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিল।
৯ রুশীকরণ নীতি কীভাবে 1917 খ্রিস্টাব্দের বিপ্লবের পটভূমি নির্মাণ করেছিল? মান ২
জার তৃতীয় আলেকজান্ডার ও দ্বিতীয় নিকোলাস সাম্রাজ্যের অধীনস্থ অ-রুশ জাতিগুলির (পোল, ফিন, ইউক্রেনীয়, ইহুদি ইত্যাদি) ওপর জোরপূর্বক রুশ ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার যে চরম দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেন, তাকে 'রুশীকরণ নীতি' (Russification Policy) বলা হয়। এই নিপীড়নের ফলে অ-রুশ জনগোষ্ঠী ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে এবং ১৯১৭ সালে লেনিনের বলশেভিক বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়ে জারতন্ত্রের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
১০ 'এপ্রিল থিসিস'-এর মূল বক্তব্য কী? মান ২
১৯১৭ সালের ১৬ই এপ্রিল সুইজারল্যান্ড থেকে পেট্রোগ্রাডে ফিরে বলশেভিক নেতা লেনিন যে যুগান্তকারী দিকনির্দেশনামূলক কর্মসূচি পেশ করেন, তা 'এপ্রিল থিসিস' নামে পরিচিত। এর মূল তিনটি বক্তব্য ছিল:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়ার অবিলম্বে নিঃশর্ত প্রস্থান।
সমস্ত ভূসম্পত্তি ও জমি বাজেয়াপ্ত করে কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে বণ্টন।
বুর্জোয়া সাময়িক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে "সকল ক্ষমতা সোভিয়েতগুলির হাতে দাও" (All Power to the Soviets) নীতি কার্যকর করা।
১১ 'NEP' বলতে কী বোঝো? মান ২
রুশ গৃহযুদ্ধের চরম দুর্দশা ও 'যুদ্ধকালীন সাম্যবাদ' (War Communism)-এর সংকট মোচনে ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে লেনিন যে আপসমূলক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নীতি চালু করেন, তাকে NEP (New Economic Policy বা নতুন অর্থনৈতিক নীতি) বলা হয়। এতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সাময়িকভাবে সীমিত পরিসরে ব্যক্তিগত বাণিজ্য, কৃষিপণ্যের মুক্ত বিক্রি ও ক্ষুদ্র শিল্পের ব্যক্তিগত মালিকানা মেনে নেওয়া হয়েছিল। লেনিনের ভাষায় এটি ছিল— "এক ধাপ পেছানো, যাতে পরে দুই ধাপ এগোনো যায়।"
১২ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেওয়ায় যুদ্ধের গতিধারার কেন পরিবর্তন ঘটে? মান ২
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে জার্মানির বেপরোয়া সাবমেরিন হানার প্রতিবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রপক্ষে যোগ দিলে যুদ্ধের গতিধারা নাটকীয়ভাবে পাল্টে যায়। এর কারণ:
বিপুল মার্কিন তাজা সৈন্য, উন্নত সমরাস্ত্র, বিমান ও খাদ্যের সরবরাহ ক্লান্ত মিত্রশক্তিকে অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করে।
আমেরিকার সীমাহীন আর্থিক ঋণ মিত্রবাহিনীর মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ক্লান্ত ও নিঃস্ব জার্মানি ও কেন্দ্রীয় শক্তির পরাজয় নিশ্চিত করে।
১৩ ভার্সাই সন্ধিকে কেন 'একতরফা চুক্তি' বলা হয়? মান ২
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জুন মিত্রপক্ষ জার্মানির ওপর যে ভার্সাই সন্ধি চাপিয়ে দেয়, তাকে 'একতরফা চুক্তি' বা 'দৃষ্টান্তমূলক সন্ধি' (Dictated Peace) বলা হয়। কারণ:
প্যারিস শান্তি সম্মেলনে পরাজিত জার্মানিকে কোনো আলোচনার অধিকার দেওয়া হয়নি; চুক্তির শর্তাবলী তৈরিতে তাদের কোনো মত নেওয়া হয়নি।
যুদ্ধ ঘোষণার ভীতি দেখিয়ে বলপূর্বক জার্মানিকে অপমানজনক এই সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
১৪ 'হুভার মোরাটোরিয়াম' কী? মান ২
১৯২৯ সালের মহামন্দায় চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়া জার্মানি ও ইউরোপীয় দেশগুলিকে রক্ষা করতে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ২০শে জুন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হার্বার্ট হুভার (Herbert Hoover) আন্তর্জাতিক যুদ্ধঋণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান সাময়িকভাবে এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার যে প্রস্তাব দেন, তাকে ইতিহাসে 'হুভার মোরাটোরিয়াম' (Hoover Moratorium) বলা হয়।
১৫ ভাইমার প্রজাতন্ত্র কী? মান ২
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ও কায়সারের পলায়নের পর সমাজতন্ত্রী নেতা ফ্রেডরিখ এবার্টের নেতৃত্বে ভাইমার শহরে সংবিধান প্রণয়ন করে যে গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সরকার গঠিত হয় (১৯১৯–১৯৩৩), তাকে ভাইমার প্রজাতন্ত্র (Weimar Republic) বলা হয়। ভার্সাই চুক্তির অপমান, তীব্র মূল্যস্ফীতি ও মহামন্দার আঘাত সামলাতে না পেরে ১৯৩৩ সালে হিটলারের নাৎসি অভ্যুত্থানে এই প্রজাতন্ত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
১৬ স্পেনের গৃহযুদ্ধকে কেন 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া' বলা হয়? মান ২
১৯৩৬–৩৯ খ্রিস্টাব্দের স্পেনের গৃহযুদ্ধকে 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া' (Dress Rehearsal for World War II) বলা হয়, কারণ:
এই যুদ্ধে একদিকে ফ্যাসিস্ট অক্ষশক্তি (জার্মানি ও ইতালি) ফ্রাঙ্কোকে এবং অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক ব্রিগেড প্রজাতন্ত্রী বাহিনীকে অস্ত্র ও সেনা দিয়ে সাহায্য করে।
হিটলার তাঁর নতুন আধুনিক ট্যাঙ্ক, ডুবোজাহাজ ও বিধ্বংসী বিমানবহর (যেমন গুয়ের্নিকা শহরে বোমা বর্ষণ) প্রথম এই যুদ্ধে পরীক্ষা করে নেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণকৌশলের পূর্বমহড়া ছিল।
১ জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের পটভূমি বর্ণনা করো। মান ৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে হিটলার ও তাঁর নাৎসি দলের ক্ষমতা দখলের প্রধান কারণগুলি ছিল:
ভার্সাই সন্ধির চরম অপমান: ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে তার সামরিক শক্তি কেড়ে নেওয়া হয় এবং বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপানো হয়। জার্মান জনগণ একে জাতীয় কলঙ্ক মনে করত। হিটলার এই সন্ধি ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয় আবেগকে উজ্জীবিত করেন।
ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতা ও দুর্বলতা: যুদ্ধোত্তর দুর্বল জোট সরকার মুদ্রাস্ফীতি, কমিউনিস্ট বিদ্রোহ ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়। ফলে মানুষ এক দৃঢ় নেতৃত্বের সন্ধান করছিল।
১৯২৯-এর মহামন্দা ও বেকারত্ব: মহামন্দার ফলে জার্মানির কোটি কোটি যুবক বেকার হয়ে পড়ে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। হিটলার "রুটি ও কাজ"-এর নিশ্চয়তা দিয়ে সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজকে আকর্ষণ করেন।
চতুর প্রচার ও পুঁজিবাদীদের সমর্থন: গোয়েবলসের দক্ষ অপপ্রচার, কমিউনিস্ট ভীতির সুযোগ নিয়ে পুঁজিপতি ও শিল্পপতিদের বিপুল অর্থসাহায্য এবং ঝটিকা বাহিনী (SA ও SS)-র সাহায্যে ত্রাস সৃষ্টি করে হিটলার ১৯৩৩ সালে ক্ষমতা দখল করেন।
২ ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের পটভূমি ব্যাখ্যা করো। মান ৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইতালিতে বেনিটো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের উত্থানের প্রধান প্রেক্ষাপট ছিল:
মিত্রপক্ষের প্রতারণা ও জাতীয় অসন্তোষ: ইতালি যুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করেও প্যারিস শান্তি সম্মেলনে প্রতিশ্রুত ফিউমে বা ডালমেশিয়া অঞ্চল পায়নি। এতে ইতালীয়দের মধ্যে জাতীয় হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তীব্র অর্থনৈতিক সংকট: যুদ্ধের পর ইতালিতে ভয়াবহ বেকারত্ব, খাদ্যসংকট ও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। লক্ষ লক্ষ প্রাক্তন সৈনিক কর্মহীন হয়ে পড়ে হতাশাগ্রস্ত হয়।
সাম্যবাদের ভীতি ও গণতান্ত্রিক দুর্বলতা: রাশিয়ার বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় ইতালির কারখানা ও কৃষিক্ষেত্রে ধর্মঘট ও লাল পতাকার বিস্তার ঘটে। এতে আতঙ্কিত পুঁজিপতি, চার্চ ও ভূস্বামীরা মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগায়।
রোম অভিযান ও ক্ষমতা দখল: ১৯২২ সালের অক্টোবরে মুসোলিনির 'কালো কুর্তা' (Blackshirts) বাহিনী রোম অভিযান করলে দুর্বল রাজা ভিক্টর ইমানুয়েল ভীত হয়ে মুসোলিনিকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
৩ রাশিয়ার জারতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রের সূচনার পটভূমি বর্ণনা করো। মান ৪
রাশিয়ার স্বৈরাচারী জারতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে ১৯১৭ সালে সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল বহুবিধ:
স্বৈরাচারী জারতন্ত্র ও রাসপুটিনের কলঙ্ক: দ্বিতীয় নিকোলাসের অযোগ্য শাসন, অদক্ষতা ও দরবারে ভণ্ড সন্ন্যাসী রাসপুটিনের অনৈতিক প্রভাব রাজতন্ত্রের মর্যাদা ধূলিসাৎ করেছিল।
মার্চের বুর্জোয়া বিপ্লব (১৯১৭): খাদ্যাভাব ও ধর্মঘটের মুখে ১৯১৭ সালের মার্চে রোমানভ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং কেরেনস্কির নেতৃত্বে বুর্জোয়া সাময়িক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু তারা যুদ্ধ থামাতে বা জমি বণ্টন করতে ব্যর্থ হয়।
লেনিনের সঠিক রণকৌশল: নির্বাসন থেকে ফিরে লেনিন 'এপ্রিল থিসিস' ঘোষণা করে যুদ্ধবিরতি, জমি ও রুটির বাস্তবমুখী স্লোগান তোলেন এবং জনসমর্থন অর্জন করেন।
অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব: ট্রটস্কির সামরিক বিপ্লবী কমিটির নেতৃত্বে বলশেভিক লাল ফৌজ পেট্রোগ্রাডের উইন্টার প্যালেস দখল করে সাময়িক সরকারকে উৎখাত করে এবং সোভিয়েত সাম্যবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
৪ উড্রো উইলসনের চোদ্দ দফা নীতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করো। মান ৪
১৯১৮ সালের ৮ই জানুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ও ভবিষ্যৎ বিশ্বশান্তি রক্ষার রূপরেখা হিসেবে চোদ্দ দফা নীতি (Fourteen Points) ঘোষণা করেন। এর প্রেক্ষাপট ছিল:
স্থায়ী বিশ্বশান্তি ও ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা: সাম্রাজ্যবাদী গোপন চুক্তি নিষিদ্ধ করে উন্মুক্ত কূটনীতি, সমুদ্রযাত্রার স্বাধীনতা ও নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার: ইউরোপের পরাধীন জাতিগুলিকে (যেমন পোল্যান্ড, বলকান জাতিসমূহ) স্বাধিকার ও স্বাধীনতা প্রদান।
বলশেভিক সমাজতন্ত্রের মোকাবিলা: সোভিয়েত রাশিয়ার লেনিন যুদ্ধবিরোধী শান্তি প্রস্তাব দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমেরিকার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা ও গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা।
আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা: ছোটো-বড়ো সব দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান (জাতিসংঘ বা League of Nations) গঠন করা।
৫ স্পেনের গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবাদ বনাম বিরোধী আদর্শের সংঘাত বর্ণনা করো। মান ৪
১৯৩৬–১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক পপুলার ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে সামরিক বিদ্রোহ শুরু হলে তা বিশ্বজনীন আদর্শিক যুদ্ধে পরিণত হয়:
ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তির আগ্রাসন: নাৎসি জার্মানি ও ফ্যাসিস্ট ইতালি আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে ফ্রাঙ্কোকে সরাসরি যুদ্ধবিমান, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং লক্ষাধিক সৈন্য পাঠায়। গুয়ের্নিকা নগরীতে জার্মান বিমানবাহিনীর নির্মম বোমাবর্ষণ বিশ্বকে স্তম্ভিত করে।
সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ: সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্রী সরকারকে অস্ত্র, বিমান ও খাদ্য দিয়ে সাহায্য করে। বিশ্বজুড়ে ৫৩টি দেশের গণতন্ত্রকামী বুদ্ধিজীবী ও যুবকরা (জর্জ অরওয়েল, হেমিংওয়ে সহ) 'আন্তর্জাতিক ব্রিগেড' (International Brigade) গঠন করে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শামিল হন।
পশ্চিমি তোষণ ও ফ্যাসিবাদের জয়: ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তথাকথিত 'হস্তক্ষেপ না-করার নীতি'র সুযোগ নিয়ে ফ্রাঙ্কো ১৯৩৯ সালে মাদ্রিদ দখল করে সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকে নিশ্চিত করে।
৬ বলশেভিক বিপ্লবের সামাজিক কারণ কী ছিল? মান ৪
১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের সামাজিক কারণগুলি ছিল অত্যন্ত গভীর ও বিস্ফোরক:
তীব্র সামাজিক বৈষম্য: রুশ সমাজে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৫% অভিজাত ও পাদ্রী শ্রেণি সমস্ত ধনসম্পদ ও জমির সিংহভাগ ভোগ করত। অন্যদিকে ৮০% কৃষক ও মেহনতি মানুষ ছিল সম্পূর্ণ অধিকারহীন ও নিঃস্ব।
কৃষক সমাজের চরম দারিদ্র্য: ভূমিদাসপ্রথা লোপ পেলেও কৃষকরা জমির মালিক হতে পারেনি। মিরের অধীনস্থ যৌথ দায়িত্ব, চড়া কর ও কুলাকদের দাদন প্রথা গ্রামীণ সমাজকে ক্ষোভে বিস্ফোরিত করে রেখেছিল।
সর্বহারা শ্রমিকদের শোষণ: বিদেশি পুঁজির মালিকানাধীন রুশ কারখানাগুলিতে শ্রমিকদের কোনো শ্রম আইন, ট্রেড ইউনিয়ন বা সামাজিক সুরক্ষা ছিল না। বস্তি এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন তাদের বিপ্লবোন্মুখ করেছিল।
অ-রুশ জাতিগুলির ওপর পীড়ন: জার সরকারের উগ্র রুশীকরণ নীতির ফলে পোলিশ, ফিনিশ, জর্জিয়ান প্রভৃতি জাতির মানুষ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল, যা সামাজিক সংহতি ধ্বংস করে বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করে।
৭ লেনিনের 'NEP' (নতুন অর্থনৈতিক নীতি)-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? মান ৪
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্জীবনে লেনিন প্রবর্তিত NEP-এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল:
উদ্বৃত্ত শস্য বাজেয়াপ্তকরণ বন্ধ: কৃষকদের থেকে জোরপূর্বক খাদ্যশস্য কেড়ে নেওয়ার প্রথা বাতিল করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শস্য কর হিসেবে ধার্য করা হয়। বাকি উদ্বৃত্ত ফসল খোলা বাজারে বিক্রির স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
ক্ষুদ্র শিল্পের ব্যক্তিগত মালিকানা: ২০ জনের কম শ্রমিকযুক্ত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ব্যক্তিগত মালিকানা ও মুনাফা অর্জনের অনুমতি দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা: ভারী শিল্প, রেলওয়ে, খনিজ সম্পদ, বিদেশি বাণিজ্য ও ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় (কমান্ডিং হাইটস)।
মুদ্রা ও মজুরি ব্যবস্থার সংস্কার: দ্রব্যের বদলে দ্রব্যের বিনিময়ের পরিবর্তে স্থির সোনার মানের রুবেল মুদ্রা চালু করা হয় এবং শ্রমিকদের কাজের গুণগত মান অনুযায়ী নগদ মজুরি প্রদান শুরু হয়।
৮ ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির অর্থনীতিকে কীভাবে পঙ্গু করা হয়েছিল? মান ৪
১৯১৯ সালের ভার্সাই সন্ধি ছিল জার্মানির অর্থনীতির ওপর এক নির্মম মৃত্যুদণ্ডস্বরূপ:
বিপুল ক্ষতিপূরণের বোঝা: ক্ষতিপূরণ কমিশন জার্মানির ওপর প্রায় ৬৬০ কোটি পাউন্ড (বা ১৩২ বিলিয়ন সোনার মার্ক) যুদ্ধক্ষতিপূরণ ধার্য করে, যা জার্মানির জাতীয় আয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অঞ্চল বাজেয়াপ্ত: কয়লা ও লৌহসমৃদ্ধ আলসাস-লোরেন ফ্রান্সকে এবং গুরুত্বপূর্ণ সার কয়লাখনি ১৫ বছরের জন্য লিগ অব নেশনসকে দেওয়া হয়। উচ্চ সাইলেসিয়া পোল্যান্ডকে দেওয়ায় জার্মানি তার ৭৫% লোহা ও ২৬% কয়লা উৎপাদন হারায়।
নৌ ও বাণিজ্যিক বহর কেড়ে নেওয়া: জার্মানির সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ মিত্রশক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। রাইন নদীকে আন্তর্জাতিক জলপথ ঘোষণা করায় শুল্ক আদায়ের পথ রুদ্ধ হয়।
মুদ্রাস্ফীতি ও দেউলিয়াত্ব: এই বহুমুখী শোষণে জার্মান মুদ্রা 'মার্ক'-এর মান শূন্যে নেমে আসে এবং ১৯২৩ সালে জার্মানিতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি (Hyperinflation) দেখা দেয়।
৯ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার কারণকে তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? মান ৪
১৯২৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার প্রধান কারণগুলি ছিল:
অতিরিক্ত উৎপাদন ও চাহিদার ঘাটতি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও ইউরোপের শিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন (Overproduction) ঘটে। কিন্তু শ্রমিকদের নিম্ন মজুরির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত থাকায় পণ্য অবিক্রিত থেকে যায়।
কৃষিপণ্যের মূল্যহ্রাস: বৈশ্বিক কৃষিতে উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ফলে শস্যের দাম ভয়াবহভাবে পড়ে যায়। কৃষকরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে শিল্পজাত দ্রব্য কেনা বন্ধ করে দেয়।
ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারের ধস: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফটকাবাজি ও ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনার হিড়িক চলছিল। ১৯২৯ সালের ২৪শে অক্টোবর (Black Thursday) হঠাৎ শেয়ারের দাম মুখ থুবড়ে পড়লে এক দিনে লক্ষ কোটি ডলারের সম্পদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
আমেরিকান ঋণের প্রত্যাহার: আমেরিকা বিশ্বব্যাপী ঋণদান বন্ধ করে তার পূর্ববর্তী সমস্ত ঋণ প্রত্যাহার করতে শুরু করলে পুরো ইউরোপীয় ব্যাঙ্কিং ও আর্থিক ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
১০ বলশেভিক বিপ্লব বিশ্বরাজনীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে? মান ৪
১৯১৭ সালের রুশ বলশেভিক বিপ্লব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল:
প্রথম সমাজতান্ত্রিক শিবিরের আত্মপ্রকাশ: পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বিশ্বের বুকে এক শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক মহাশক্তির জন্ম হয়, যা ভবিষ্যৎ দ্বিমেরু বিশ্বের ভিত্তি স্থাপন করে।
উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা: এশিয়া ও আফ্রিকার পরাধীন দেশগুলিতে (ভারত, চিন, ভিয়েতনাম) জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম লেনিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তত্ত্বে গভীর অনুপ্রেরণা পায়।
কমিউন্টার্ন প্রতিষ্ঠা: বিশ্বজুড়ে সাম্যবাদী বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৯ সালে মস্কোয় 'কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক' (Comintern) গঠিত হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট দল প্রতিষ্ঠিত হয়।
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণা: সাম্যবাদের প্রসার ঠেকাতে পুঁজিবাদী পশ্চিমি দেশগুলি নিজেদের দেশে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা হ্রাস, ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে বাধ্য হয়।
১ জারতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী? রুশ দার্শনিকদের রচনা কীভাবে জনগণকে প্রভাবিত করেছিল? মান ৩ + ৫ = ৮
(ক) জারতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ : মান ৩
চরম স্বৈরাচার ও ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবি: রুশ জাররা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন। কোনো সংসদ বা প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়া তাঁদের মুখনিঃসৃত বাক্যই ছিল আইন।
আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশি সন্ত্রাস: জনগণের কণ্ঠরোধ করতে 'ওখরানা' নামক কুখ্যাত গুপ্ত পুলিশ বাহিনী ও কসাক সেনাদের লেলিয়ে দেওয়া হতো। বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও প্রতিবাদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ও রুশীকরণ: মুষ্টিমেয় অভিজাত ও অর্থোডক্স চার্চ সমস্ত অধিকার ভোগ করত। সাম্রাজ্যের অ-রুশ জাতিগুলির ওপর জোর করে রুশ ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে চরম নিপীড়ন চালানো হতো।
(খ) রুশ দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের প্রভাব : মান ৫
রাশিয়ার বৈপ্লবিক মানসিকতা গঠনে সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের ভূমিকা ছিল অনবদ্য:
লিও টলস্টয়: তাঁর 'ওয়ার অ্যান্ড পিস' ও 'পুনরুত্থান' উপন্যাসে জারতান্ত্রিক সমাজের ভণ্ডামি, সামন্ততান্ত্রিক শোষণ এবং অর্থহীন যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত হানেন। লেনিন তাঁকে 'রুশ বিপ্লবের দর্পণ' বলে অভিহিত করেছিলেন।
ম্যাক্সিম গোর্কি: তাঁর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস 'মা' (Mother)-এ কারখানার সাধারণ মেহনতি শ্রমিকদের রাজনৈতিক চেতনা ও বিপ্লবে আত্মত্যাগের বাস্তব রূপ তুলে ধরেন, যা সাধারণ যুবকদের বিপ্লবে টেনে এনেছিল।
ইভান তুর্গেনিভ: তাঁর 'ফাদার্স অ্যান্ড সানস' গ্রন্থে পুরাতন রক্ষণশীল মূল্যবোধ ছুড়ে ফেলে 'শূন্যবাদ' (Nihilism)-এর বার্তা দেন, যা তরুণ প্রজন্মকে বিদ্রোহী করে তোলে।
কার্ল মার্ক্স ও প্লেখানভ: প্লেখানভের মাধ্যমে রাশিয়ায় মার্ক্সীয় দর্শনের অনুপ্রবেশ ঘটে। লেনিনের লেখা "কী করিতে হইবে?" (What is to be Done?) পুস্তিকাটি বলশেভিক দল গঠনের রূপরেখা দেয়।
২ মির বলতে কী বোঝো? রাশিয়ায় বিপ্লবের পূর্বে কৃষক অসন্তোষ সম্বন্ধে কী জানো? মান ৩ + ৫ = ৮
(ক) 'মির' (Mir)-এর ধারণা : মান ৩
প্রাক-বিপ্লব রাশিয়ায় গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পঞ্চায়েত বা 'মির'। ১৮৬১ সালে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার যখন ভূমিদাসপ্রথা উচ্ছেদ করেন, তখন ভূস্বামীদের থেকে জমি খাস করে কৃষকদের সরাসরি মালিকানা না দিয়ে 'মির'-এর যৌথ নিয়ন্ত্রণে সমর্পণ করা হয়। মিরের প্রধান কাজ ছিল পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জমি বণ্টন করা এবং সামগ্রিক গ্রামের হয়ে জারের ধার্যকৃত বিপুল রাজস্ব ও ৪৯ বছরের ক্ষতিপূরণের কিস্তি আদায় করা। জমি হস্তান্তরের অধিকার কৃষকের ছিল না, ফলে কৃষকরা বাস্তবে মিরের দাসে পরিণত হয়েছিল।
(খ) প্রাক-বিপ্লব রাশিয়ায় কৃষক অসন্তোষ : মান ৫
জমির তীব্র অপ্রতুলতা: রাশিয়ার ৮৫% মানুষ কৃষিজীবী হলেও মোট আবাদি জমির অর্ধেক ছিল জার ও অভিজাতদের দখলে। কৃষকদের হাতে যে সামান্য অনুর্বর জমি ছিল, তা দিয়ে পরিবারের আহার জুটত না।
অসহনীয় ঋণের দায়: জমি মুক্তির ক্ষতিপূরণের চড়া কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হতো। কিস্তি বাকি পড়লে অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো।
কুলাকদের শোষণ: গ্রামীণ মহাজন ও ধনী কৃষক 'কুলাক'-দের সুদের ফাঁদে পড়ে গরিব কৃষকরা ভূমিহীন সর্বহারা খেতমজুরে পরিণত হয়েছিল।
বারংবার কৃষক বিদ্রোহ: ১৯০২ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত সমগ্র রাশিয়াজুড়ে কৃষকরা ভূস্বামীদের খামারে আগুন দেয় ও শস্যদানা লুট করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খাদ্যসংকট চরমে পৌঁছালে কৃষকরা লেনিনের "জমির অধিকার কৃষকদের" স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
৩ লেনিনের নেতৃত্বে কীভাবে রাশিয়ায় সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়? আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বলশেভিক বিপ্লবের প্রভাব আলোচনা করো। মান ৫ + ৩ = ৮
(ক) লেনিনের নেতৃত্বে সাম্যবাদী সরকার প্রতিষ্ঠা : মান ৫
পটভূমি ও মার্চের বিপ্লব: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার বিপর্যয় ও ভয়াবহ খাদ্যাভাবের মুখে ১৯১৭ সালের মার্চে পেট্রোগ্রাডে গণবিক্ষোভের মুখে জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। প্রিন্স এলভভ ও পরে মেনশেভিক নেতা আলেকজান্ডার কেরেনস্কির নেতৃত্বে সাময়িক বুর্জোয়া সরকার গঠিত হয়। কিন্তু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ও জমি সংস্কার না করায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
লেনিনের প্রত্যাবর্তন ও এপ্রিল থিসিস: ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে নির্বাসন থেকে ফিরে লেনিন তাঁর বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' পেশ করেন। তিনি স্লোগান তোলেন— "শান্তি, জমি ও রুটি" এবং "সকল ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে সমর্পণ করো।"
কর্নিলভ বিদ্রোহ ও বলশেভিকদের উত্থান: আগস্ট মাসে প্রতিক্রিয়াশীল সেনাপতি কর্নিলভ বিদ্রোহ দমন করতে কেরেনস্কি বলশেভিকদের সাহায্য নেন। বলশেভিক লাল ফৌজ বীরত্বের সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করে জনগণের কাছে ত্রাণকর্তার মর্যাদা পায়।
অক্টোবর বিপ্লব ও ক্ষমতা দখল: ট্রটস্কির সভাপতিত্বে গঠিত সামরিক বিপ্লবী কমিটি ১৯১৭ সালের ২৪-২৫শে অক্টোবর (নতুন ক্যালেন্ডারে ৬-৭ নভেম্বর) রাতে এক রক্তপাতহীন অভিযানের মাধ্যমে পেট্রোগ্রাডের ব্যাঙ্ক, টেলিগ্রাফ, রেল স্টেশন ও উইন্টার প্যালেস দখল করে। কেরেনস্কি পালিয়ে যান এবং ৮ই নভেম্বর লেনিনের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম সোভিয়েত সাম্যবাদী সরকার শপথ নেয়।
(খ) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাব : মান ৩
বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ: ধনতান্ত্রিক বিশ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বিশ্বমঞ্চে প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা পরবর্তীকালে 'ঠান্ডা লড়াই'-এর পথ প্রস্তুত করে।
ঔপনিবেশিক মুক্তির প্রেরণা: এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিক নিপীড়িত জনতা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নীতি থেকে অনুপ্রেরণা পায়। ভারতে ও চিনে সাম্যবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে।
শ্রমিক অধিকারের অগ্রগতি: সমাজতন্ত্রের জুজু রুখতে বিশ্বের পুঁজিবাদী দেশগুলি নিজেদের দেশে শ্রমিককল্যাণ আইন ও সামাজিক সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয়।
৪ কোন্ পটভূমিকায় ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়েছিল? মান ৮
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে চরম অরাজকতার সুযোগে বেনিটো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এর প্রধান কারণগুলি ছিল:
১. ভার্সাই সন্ধির হতাশা ও আহত জাতীয়তাবাদ: ইতালি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষে যোগ দিয়ে প্রায় ৭ লক্ষ সৈন্য হারায়। কিন্তু প্যারিস শান্তি সম্মেলনে মিত্রশক্তি ইতালিকে প্রতিশ্রুত ট্রিয়েন্ট, ফিউমে বা অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ দেয়নি। ইতালীয় কবি ডি'আন্নুনজিও একে 'খণ্ডিত বিজয়' (Mutilated Victory) আখ্যা দেন। মুসোলিনি এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে প্রাচীন রোমের গৌরব পুনরুদ্ধারের ডাক দেন।
২. তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব: যুদ্ধঋণের পাহাড়, ঘাটতি বাজেট ও মুদ্রা অবমূল্যায়নের ফলে জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। ২০ লক্ষেরও বেশি যুদ্ধফেরত সৈনিক কর্মহীন হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। মুসোলিনি এদের সংগঠিত করে ফ্যাসিস্ট আধাসামরিক বাহিনী গঠন করেন।
৩. সমাজতন্ত্র ও বলশেভিক বিপ্লবের ভীতি: ১৯১৯-২০ সালে ইতালিতে শ্রমিকরা একের পর এক কারখানা দখল করে ধর্মঘট শুরু করে এবং কৃষকরা জমি দখল করতে থাকে। ইতালিতে যেকোনো দিন রুশ বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি হতে পারে ভেবে পুঁজিপতি, বৃহৎ শিল্পপতি, জমিদার এবং ভ্যাটিকান চার্চ মুসোলিনিকে বিপুল অর্থ দিয়ে সহায়তা করে।
৪. সংসদীয় গণতন্ত্রের দেউলিয়াত্ব: ইতালির দুর্বল সংসদীয় দলগুলির মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে ঘন ঘন সরকারের পতন ঘটত (১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে ৫টি মন্ত্রিসভা বদল হয়)। সাধারণ মানুষ এই অযোগ্য গণতন্ত্রে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এক কঠোর লৌহমানব চেয়েছিল।
৫. মুসোলিনির ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক রোম অভিযান: মুসোলিনির সম্মোহনী বক্তৃতা ও আগ্রাসী ব্যক্তিত্ব তরুণদের মাতিয়ে তোলে। অবশেষে ১৯২২ সালের ২৮শে অক্টোবর তাঁর হাজার হাজার অস্ত্রধারী 'কালো কুর্তা' বাহিনী চারদিক থেকে রোম নগরী ঘেরাও করলে দুর্বল রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল রক্তপাত এড়াতে মুসোলিনিকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন।
৫ স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে কী জানো? এই যুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির ভূমিকা কী ছিল? মান ৩ + ৫ = ৮
(ক) স্পেনের গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬–১৯৩৯) : মান ৩
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে স্পেনে সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্ট ও উদারপন্থীদের যৌথ জোট 'পপুলার ফ্রন্ট' গণতান্ত্রিকভাবে সরকার গঠন করে। ভূমিসংস্কার ও গির্জার ক্ষমতা খর্ব করার প্রতিবাদে রাজতন্ত্রী, চার্চ ও ধনীদের সমর্থনে মরক্কোর সেনাপ্রধান জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো এক সামরিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এর ফলে স্পেনের বৈধ প্রজাতন্ত্রী সরকার এবং বিদ্রোহী জাতীয়তাবাদী ফ্রাঙ্কো বাহিনীর মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বাঁধে (১৯৩৬–১৯৩৯), তাকে স্পেনের গৃহযুদ্ধ বলা হয়। প্রায় তিন বছরব্যাপী এই যুদ্ধে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয় এবং পরিশেষে ফ্রাঙ্কোর একনায়কতন্ত্র কায়েম হয়।
(খ) যুদ্ধে ইতালি ও জার্মানির ভূমিকা : মান ৫
ফ্যাসিস্ট অক্ষশক্তির সক্রিয় মদতেই ফ্রাঙ্কো এই যুদ্ধে জয়ী হতে পেরেছিলেন:
ইতালির ভূমিকা: মুসোলিনি ফ্রাঙ্কোকে জেতাতে প্রায় ৭০,০০০ নিয়মিত পদাতিক সেনা, ৭০০টিরও বেশি সামরিক বিমান, সহস্রাধিক কামান এবং বিপুল পরিমাণ রণসম্ভার পাঠান। ভূমধ্যসাগরে ইতালীয় নৌবাহিনী প্রজাতন্ত্রী সরকারের রসদবাহী জাহাজের ওপর অবরোধ সৃষ্টি করে।
জার্মানির সামরিক রণকৌশল ও 'কন্ডোর লিজিয়ন': হিটলার তাঁর অত্যন্ত আধুনিক বিমানবাহিনী 'কন্ডোর লিজিয়ন' (Condor Legion), ট্যাঙ্ক ডিভিশন ও সেনা বিশেষজ্ঞদের স্পেনে পাঠান। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই হিটলার তাঁর নতুন বিমান ও বিধ্বংসী আগ্নেয়াস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে নেন।
গুয়ের্নিকার নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ: ১৯৩৭ সালের ২৬শে এপ্রিল জার্মান বিমানবাহিনী স্পেনের শান্ত প্রাচীন শহর গুয়ের্নিকা (Guernica)-র ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ও শত শত নিরীহ নাগরিককে হত্যা করে (শিল্পী পাবলো পিকাসো তাঁর অমর চিত্রকলায় এই নির্মমতা ফুটিয়ে তুলেছেন)।
রোম-বার্লিন অক্ষের সংহতি: এই যৌথ সামরিক অভিযানে স্পেনকে বলশেভিকমুক্ত করার নাম করে হিটলার ও মুসোলিনির মৈত্রী গভীর হয় এবং ফ্যাসিবাদী আক্রমণাত্মক অক্ষশক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধানোর দুঃসাহস অর্জন করে।
৬ মহামন্দা (1929 খ্রিস্টাব্দ) কীভাবে আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছিল? মান ৮
১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজার ধসের মাধ্যমে শুরু হওয়া 'মহা অর্থনৈতিক মন্দা' (Great Depression) আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল:
১. আমেরিকার অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব: আমেরিকায় প্রায় ৯ হাজার ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়, হাজার হাজার কলকারখানা তালাবন্ধ হয় এবং দেড় কোটিরও বেশি মানুষ কাজ হারায়। মানুষের বিক্ষোভের মুখে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হুভারের পতন ঘটে এবং ১৯৩২ সালে ডেমোক্র্যাট নেতা ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ক্ষমতায় আসেন। তিনি ঐতিহাসিক 'নিউ ডিল' (New Deal) নীতি কার্যকর করে ব্যাঙ্ক পুনর্গঠন, কৃষি ও শিল্পে সরকারি অর্থ বিনিয়োগ এবং ব্যাপক জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেন।
২. জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থান: মহামন্দার সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত পড়েছিল জার্মানির ওপর। আমেরিকা ডাউস ও ইয়ং পরিকল্পনা অনুযায়ী জার্মানিকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে উলটে পূর্বের ঋণ ফেরত চায়। এর ফলে জার্মানির সমস্ত বড়ো ব্যাঙ্ক ফেল পড়ে, বেকার সংখ্যা ৬০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। ক্ষুধার্ত ও ক্ষুব্ধ জার্মানরা ভাইমার প্রজাতন্ত্রের ওপর আস্থা হারিয়ে হিটলারের নাৎসি দলকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করে, যা স্বৈরাচারী তৃতীয় রাইখের পথ প্রশস্ত করে।
৩. ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের অর্থনৈতিক দুরবস্থা: ব্রিটেনের বিশ্ব বাণিজ্য এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে, কয়লা ও বস্ত্রশিল্পে ভয়াবহ মন্দা দেখা দেয় এবং প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বেকার হয়। বাধ্য হয়ে ব্রিটেন স্বর্ণমান (Gold Standard) ত্যাগ করে এবং রামসে ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে সর্বদলীয় 'জাতীয় সরকার' গঠন করে। ফ্রান্সেও ঘন ঘন মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।
৪. আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বশান্তির পতন: মন্দার ফলে প্রতিটি দেশ নিজেদের স্বার্থরক্ষায় উচ্চ শুল্কপ্রাচীর গড়ে তোলে, যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ভেঙে পড়ে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থা 'জাতিসংঘ' নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। জাপান এশিয়ায় মাঞ্চুরিয়া দখল করে এবং জার্মানি ও ইতালি অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নেমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে।
সহপাঠীদের সাথে শেয়ার করো: