WBBSE Class 10 Geography Chapter 3 বারিমণ্ডল : সম্পূর্ণ অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর | Madhyamik Geography Hydrosphere Solutions
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) নির্ধারিত মাধ্যমিক দশম শ্রেণির ভূগোল ও পরিবেশ পাঠ্যবইয়ের তৃতীয় অধ্যায়: 'বারিমণ্ডল' (Hydrosphere)-এর পাঠ্যবই অনুশীলনী (পৃষ্ঠা ৬২ ও ৬৩)-র সমস্ত প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান এখানে উপস্থাপিত করা হলো।
অধ্যায়ের প্রধান দুটি স্তম্ভ—সমুদ্রস্রোত (Ocean Currents) এবং জোয়ার-ভাটা (Tides) সংক্রান্ত সমস্ত প্রশ্নাবলি যেমন—সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি, উষ্ণ ও শীতল স্রোত, শৈবাল সাগর, মগ্নচড়া, হিমপ্রাচীর, চন্দ্র ও সূর্যের আকর্ষণ বল, সিজিগি (সংযোগ ও প্রতিযোগ), ভরা কোটাল ও মরা কোটাল, পেরিজি ও অ্যাপোজি অবস্থান, বানডাকা এবং মানবজীবনে ও জলবায়ুর ওপর এদের সুদূরপ্রসারী প্রভাবসমূহ বিজ্ঞানসম্মত রঙিন ভেক্টর ডায়াগ্রামের সাহায্যে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
অধ্যায় ৩ : বারিমণ্ডল (Hydrosphere)
A. বহু বিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি [MCQ]
B. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (VSAQ)
▶ শূন্যস্থান পূরণ করো :
▶ শুদ্ধ-অশুদ্ধ নির্বাচন করো :
▶ বামস্তম্ভের সঙ্গে ডানস্তম্ভ মেলাও :
বামস্তম্ভের সঙ্গে ডানস্তম্ভ মেলাও :
| বামস্তম্ভ | ডানস্তম্ভ (সঠিক মিল) |
|---|---|
| ১. ওয়াশিও স্রোত | → d. জাপান |
| ২. বেঙ্গুয়েলা স্রোত | → a. কালাহারি মরুভূমি |
| ৩. চাঁদের পরিক্রমণ | → b. 27 1/3 দিন |
| ৪. গৌণ জোয়ার | → c. 12 ঘণ্টা 26 মিনিট |
▶ একটি বা দুটি শব্দে উত্তর দাও :
C. সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)
উদাহরণ: উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত, শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত।
• গ্রীষ্মকালে: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জলরাশি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি স্রোত)।
• শীতকালে: উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জলরাশি পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয় (উত্তর-পূর্ব মৌসুমি স্রোত)।
উদাহরণ: উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলের 'গ্র্যান্ড ব্যাংক' ও 'ডগার্স ব্যাংক'।
বৈশিষ্ট্য: হিমশৈলের মোট আয়তনের মাত্র ১/৯ ভাগ জলের ওপরে দৃশ্যমান থাকে এবং বাকি ৮/৯ ভাগ অংশ জলের নিচে নিমজ্জিত থাকে, যা সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য চরম বিপজ্জনক (যেমন টাইটানিক জাহাজের দুর্ঘটনা)।
(উল্লেখ্য: সমুদ্রতরঙ্গে জলকণাগুলি নিজ স্থানেই আন্দোলিত হয়, জলের কোনো স্থায়ী অনুভূমিক স্থানান্তর ঘটে না)।
উদাহরণ: শীতল ল্যাব্রাডর স্রোত, পেরু স্রোত (হামবোল্ড স্রোত), বেঙ্গুয়েলা স্রোত।
উত্তর গোলার্ধে জায়র ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Anticlockwise) আবর্তিত হয়।
১. সংযোগ (Conjunction): অমাবস্যা তিথিতে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করে (সূর্য — চাঁদ — পৃথিবী), তখন তাকে সংযোগ বলে।
২. প্রতিযোগ (Opposition): পূর্ণিমা তিথিতে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান করে (সূর্য — পৃথিবী — চাঁদ), তখন তাকে প্রতিযোগ বলে।
২. নিম্ন জোয়ার বা মরা কোটাল (Neap Tide): শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাপেক্ষে সমকোণে থাকায় বিপরীতমুখী টানের কারণে জলস্ফীতি যখন সবচেয়ে কম হয়, তাকে নিম্ন জোয়ার বা মরা কোটাল বলে।
উদাহরণ: পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদী ও আমাজন নদীর বানডাকা (পোরেরোকা)।
সিজিগি দুটি রূপে ঘটে: (i) অমাবস্যা তিথিতে সংযোগ এবং (ii) পূর্ণিমা তিথিতে প্রতিযোগ। এই অবস্থানে সর্বদা তীব্র ভরা কোটাল ঘটে।
চাঁদ সবচেয়ে দূরে অবস্থান করায় এর মহাকর্ষীয় টান দুর্বল হয়, ফলে এই সময়ে সংঘটিত জোয়ারের তীব্রতা স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে প্রায় ২০% কম হয়। একেই অ্যাপোজি জোয়ার (Apogean Tide) বলে।
D. ব্যাখ্যামূলক উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন
| তুলনার বিষয় | সমুদ্রতরঙ্গ (Sea Wave) | সমুদ্রস্রোত (Ocean Current) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা ও প্রকৃতি | সমুদ্রপৃষ্ঠের জলরাশির কোনো স্থান পরিবর্তন না করে একই স্থানে চক্রাকার উল্লম্ব ওঠানামা হলো সমুদ্রতরঙ্গ। | সমুদ্রের বিপুল জলরাশির এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়মিত অনুভূমিক স্থানান্তর হলো সমুদ্রস্রোত। |
| ২. উৎপত্তির কারণ | প্রধানত সমুদ্রপৃষ্ঠে বায়ুর ঘর্ষণজনিত আলোড়ন ও উপকূলের অগভীরতা তরঙ্গের প্রধান কারণ। | নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর আবর্তন গতি (কোরিওলিস বল) ও সমুদ্রজলের ঘনত্ব-উষ্ণতার পার্থক্য এর কারণ। |
| ৩. জলের সঞ্চালন | জলকণাগুলি কেবল বৃত্তাকার কক্ষপথে আন্দোলিত হয়; জলের কোনো স্থায়ী নির্গমন হয় না। | নদীর প্রবাহের মতো সমুদ্রের জল নির্দিষ্ট দিকে এক স্থান থেকে বহুদূরে প্রবাহিত হয়। |
| ৪. প্রভাব | প্রধানত সমুদ্র উপকূলে ক্ষয়কার্য ও সঞ্চয়কার্য চালিয়ে বিভিন্ন উপকূলীয় ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। | উপকূলের জলবায়ু, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং মৎস্যক্ষেত্র সৃষ্টিতে গভীর প্রভাব ফেলে। |
১. বিপরীতমুখী দুই স্রোতের মিলন: সুমেরু অঞ্চল থেকে আগত শীতল ও ভারী ল্যাব্রাডর স্রোত এবং দক্ষিণ দিক থেকে আগত হালকা ও উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের মিলন ঘটে নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে।
২. জলীয় বাষ্পের ঘনীভবন: উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের ওপরের আর্দ্র উষ্ণ বাতাস যখন শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সংস্পর্শে আসে, তখন উষ্ণ বায়ুর তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে শিশিরাঙ্কে পৌঁছায় এবং বাতাসের বিপুল জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ভেসে থাকে, ফলে চারিদিক ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়।
৩. ঘূর্ণবাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: উষ্ণ ও শীতল বায়ুপুঞ্জের উষ্ণতার বৈসাদৃশ্যে এখানে একটি স্থায়ী সীমান্ত (Front) গঠিত হয় যা প্রায়শই প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সৃষ্টি করে, যা জাহাজ চলাচলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
সৃষ্টির কারণ ও প্রক্রিয়া:
১. সমুদ্রস্রোতের চক্রাকার আবর্তন (জায়র): উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে দক্ষিণে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত, পশ্চিমে উপসাগরীয় স্রোত, উত্তরে উত্তর আটলান্টিক স্রোত এবং পূর্বে ক্যানারি শীতল স্রোত ঘড়ির কাঁটার দিকে চক্রাকারে আবর্তিত হয়ে একটি বিশাল জলচক্র বা জায়র (Gyre) তৈরি করে।
২. স্থির ও স্রোতহীন শান্ত বলয়: এই চারটি স্রোতের বৃত্তাকার প্রবাহের ঠিক কেন্দ্রস্থলে প্রায় ২০°–৪০° উত্তর অক্ষাংশ এবং ৩৫°–৭০° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটি স্রোতহীন, স্থির ও শান্ত জলাবর্ত সৃষ্টি হয়।
৩. সারগাসাম শৈবালের পুঞ্জীভবন: স্রোতহীন শান্ত জলে স্প্যানিশ শব্দ 'সারগাজো' (Sargazo) থেকে নাম পাওয়া মূলহীন, বাদামি রঙের ভাসমান আগাছা ও শৈবাল (Sargassum) দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে জমা হতে থাকে। কোনো উপকূলীয় ভূখণ্ড না থাকা সত্ত্বেও এটি একটি স্বতন্ত্র শৈবালময় সামুদ্রিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
১. সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি: ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন সূর্যের আলো ও পুষ্টির সাহায্যে সালোকসংশ্লেষ ঘটিয়ে খাদ্য তৈরি করে, যা সমগ্র সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম পুষ্টিস্তর বা ভিত্তি রচনা করে।
২. মাছের প্রধান খাদ্য: প্লাঙ্কটন হলো কড, হেরিং, স্যামন প্রভৃতি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন মাছের মূল খাদ্য। যেখানে প্লাঙ্কটনের প্রাচুর্য থাকে (যেমন অগভীর মগ্নচড়াগুলিতে), সেখানেই কোটি কোটি মাছ খাদ্যের সন্ধানে সমবেত হয়।
৩. পৃথিবীর অক্সিজেন উৎপাদন: বায়ুমণ্ডলের মোট অক্সিজেনের প্রায় ৫০% এরও বেশি উৎপন্ন হয় সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে।
৪. মৎস্য শিকারের বিকাশ: পৃথিবীর বিখ্যাত মৎস্যক্ষেত্রগুলি (যেমন গ্র্যান্ড ব্যাংক, ডগার্স ব্যাংক) গড়ে ওঠার পেছনে প্রধান ভূমিকা প্লাঙ্কটনের প্রাচুর্যের।
| তুলনার বিষয় | বহিঃস্রোত (Surface Current) | অন্তঃস্রোত (Deep Undercurrent) |
|---|---|---|
| ১. প্রবাহের স্তর | সমুদ্রের উপরিভাগ বা পৃষ্ঠদেশ দিয়ে অনুভূমিকভাবে প্রবাহিত হয়। | সমুদ্রপৃষ্ঠের বহু নিচে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। |
| ২. জলের প্রকৃতি ও তাপমাত্রা | প্রধানত ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের হালকা, উষ্ণ ও কম ঘনত্বের জল। | মেরু অঞ্চলের অত্যন্ত শীতল, ভারী ও অধিক লবণাক্ত জল। |
| ৩. প্রবাহের অভিমুখ | নিরক্ষরেখার উষ্ণ অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে পৃষ্ঠদেশ দিয়ে যায়। | মেরু অঞ্চল থেকে নিরক্ষরেখার দিকে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ধাবিত হয়। |
| ৪. দৃশ্যমানতা | জাহাজ চলাচল বা চাক্ষুষভাবে এর প্রবাহ ও দিক নির্ণয় করা যায়। | এটি খালি চোখে অদৃশ্য, কেবল গভীরতার জলের তাপমাত্রা ও লবণতা মেপে চিহ্নিত করা যায়। |
১. অগভীর মগ্নচড়ার উপস্থিতি: মহাদেশীয় মহীসোপানের অংশ হিসেবে এখানকার সমুদ্রের গভীরতা ২০০ মিটারেরও কম। ফলে সূর্যালোক সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
২. হিমশৈল গলন ও পুষ্টি সঞ্চয়: শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের সাথে আগত হিমশৈল উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের তাপে গলে গিয়ে তার মধ্যকার খনিজ পুষ্টি উপাদান সমুদ্রতলে অবক্ষেপণ করে।
৩. বিপুল প্লাঙ্কটন জন্ম: নাতিশীতোষ্ণ উপযুক্ত তাপমাত্রা ও অগভীর জলের পর্যাপ্ত আলোর কারণে এখানে মাছের প্রিয় খাদ্য 'ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন' ও 'জুপ্ল্যাঙ্কটন' অবিশ্বাস্য পরিমাণে জন্মায়।
৪. মৎস্যের সমাবেশ: খাদ্যের লোভে ঝাঁকে ঝাঁকে কড, হ্যাডক, হেরিং, ম্যাকারেল প্রভৃতি মূল্যবান সামুদ্রিক মাছ এখানে ডিম পাড়তে ও বংশবৃদ্ধি করতে ভিড় জমায়।
৫. অনুকূল জলবায়ু: নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া মাছ সংরক্ষণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণে সহায়তা করে।
১. বিপরীতধর্মী স্রোতের মিলন: উত্তর দিক থেকে বেরিং সাগর হয়ে নেমে আসা অতিশীতল ওয়াশিও (বা ওয়াসিও) স্রোত এবং দক্ষিণ দিক থেকে উঠে আসা উষ্ণ কুরোশিও স্রোতের মুখোমুখি মিলন ঘটে জাপান উপকূলের কাছে।
২. আর্দ্র বায়ুর দ্রুত ঘনীভবন: উষ্ণ কুরোশিও স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত আর্দ্র বায়ুপুঞ্জ শীতল ওয়াশিও স্রোতের সংস্পর্শে এলে উষ্ণতা দ্রুত হ্রাস পেয়ে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ঝুলন্ত জলকণায় পরিণত হয়।
৩. এই ঘনীভূত জলকণা বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত হয়ে জাপান উপকূলকে সারাবছর ঘন কুয়াশায় ঢেকে রাখে এবং সেখানে প্রায়শই সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝা দেখা দেয়।
১. জলের সঞ্চয় ও উচ্চতা বৃদ্ধি: আয়ন বায়ুর প্রভাবে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে (যেমন আমেরিকার বা এশিয়ার উপকূলে) বিপুল পরিমাণ জল জমায়েত করে, ফলে পশ্চিম প্রান্তে সমুদ্রতলের উচ্চতা পূর্ব প্রান্তের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচু হয়ে জলের ঢাল সৃষ্টি করে।
২. মাধ্যাকর্ষণিক ভারসাম্য রক্ষা: এই উঁচু জলস্তর বজায় রাখা সম্ভব না হওয়ায় মাধ্যাকর্ষণের টানে অতিরিক্ত জলরাশি নিরক্ষরেখার শান্ত বলয় (Doldrums) বরাবর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে বিপরীতমুখে ফিরে আসে।
৩. শান্ত বলয়ের প্রভাব: নিরক্ষীয় শান্ত বলয়ে বায়ুর বাধা কম থাকায় এই জলরাশি নির্বিঘ্নে পূর্বমুখী প্রতিস্রোত রূপে প্রবাহিত হয়।
১. মেক্সিকো উপসাগরে জল সঞ্চয়: উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোতের মিলিত শাখা ক্যারিবিয়ান সাগর অতিক্রম করে মেক্সিকো উপসাগরে প্রবেশ করে এবং সেখানে সংকীর্ণ জলভাগে অবরুদ্ধ হয়ে উত্তপ্ত হয়।
২. ফ্লোরিডা প্রণালী দিয়ে নির্গমন: মেক্সিকো উপসাগরের জলস্তর আটলান্টিকের চেয়ে উঁচু হয়ে পড়ায় সেই বিপুল উষ্ণ জলরাশি প্রবল বেগে সরু ফ্লোরিডা প্রণালী দিয়ে বহির্গত হয়ে ফ্লোরিডা স্রোত রূপে উত্তরমুখী প্রবাহিত হয়।
৩. উপসাগরীয় স্রোত রূপ ধারণ: ফ্লোরিডা স্রোত উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল বরাবর উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় অ্যান্টিলেস স্রোতের সাথে মিলিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ উপসাগরীয় স্রোত (Gulf Stream) নামে প্রবাহিত হয়।
| তুলনার বিষয় | জোয়ারভাটা (Tide) | সমুদ্রস্রোত (Ocean Current) |
|---|---|---|
| ১. সংজ্ঞা | চন্দ্র-সূর্যের আকর্ষণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সমুদ্রজলের ছন্দোবদ্ধ উত্থান-পতন। | নির্দিষ্ট দিকে সমুদ্রের বিপুল জলরাশির নিয়মিত অনুভূমিক প্রবাহ। |
| ২. প্রধান কারণ | চাঁদ ও সূর্যের মহাকর্ষীয় টান এবং পৃথিবীর আবর্তনজনিত কেন্দ্রাতিগ বল। | নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, পৃথিবীর আবর্তন (কোরিওলিস বল) ও জলের ঘনত্বের তারতম্য। |
| ৩. সময়কাল | নিয়মিত ছন্দোবদ্ধ (প্রতি ১২ ঘণ্টা ২৬ মিনিটে জোয়ার এবং ৬ ঘণ্টা ১৩ মিনিটে ভাটা)। | সারা বছর ধরে অবিরতভাবে একটি নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত থাকে। |
| ৪. প্রভাব এলাকা | প্রধানত উপকূলবর্তী অঞ্চল, খাড়ি ও নদী মোহনায় এর প্রভাব প্রত্যক্ষ ও তীব্র। | সমগ্র মহাসাগর জুড়ে মহাদেশীয় জলবায়ু ও সামুদ্রিক প্রাণিজগতে প্রভাব ফেলে। |
| তুলনার বিষয় | মুখ্য জোয়ার (Primary Tide) | গৌণ জোয়ার (Secondary Tide) |
|---|---|---|
| ১. অবস্থান | পৃথিবীর যে অংশ পরিক্রমণরত চাঁদের ঠিক সম্মুখে সরাসরি অবস্থান করে। | মুখ্য জোয়ারের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত প্রতিপাদ স্থানে (Antipode)। |
| ২. সৃষ্টির কারণ | চাঁদের প্রত্যক্ষ ও তীব্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণের ফলে ঘটে। | পৃথিবীর নিজের অক্ষের ওপর ঘূর্ণনজনিত কেন্দ্রাতিগ বলের (Centrifugal force) প্রভাবে ঘটে। |
| ৩. জলস্ফীতির মাত্রা | আকর্ষণ বল প্রত্যক্ষ হওয়ায় জলস্ফীতির মাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি হয়। | কেন্দ্রাতিগ বলের প্রভাবের কারণে জলস্ফীতির মাত্রা মুখ্য জোয়ারের চেয়ে কিছুটা কম হয়। |
| তুলনার বিষয় | পেরিজি অবস্থান (Perigee) | অ্যাপোজি অবস্থান (Apogee) |
|---|---|---|
| ১. দূরত্ব | চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে কম থাকে (প্রায় ৩ লক্ষ ৫৬ হাজার কিমি)। | চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে (প্রায় ৪ লক্ষ ৭ হাজার কিমি)। |
| ২. মহাকর্ষীয় টান | দূরত্ব কম হওয়ায় পৃথিবীর সমুদ্রজলের ওপর চাঁদের আকর্ষণ ক্ষমতা সর্বাধিক হয়। | দূরত্ব বেশি হওয়ায় সমুদ্রজলের ওপর চাঁদের মহাকর্ষীয় টান সবচেয়ে দুর্বল হয়। |
| ৩. জোয়ারের তীব্রতা | জোয়ারের জলস্ফীতি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৫–২০% বেশি হয় (পেরিজি জোয়ার)। | জোয়ারের জলস্ফীতি স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২০% কম হয় (অ্যাপোজি জোয়ার)। |
১. পৃথিবীর আবর্তন: পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর একবার পশ্চিম থেকে পূর্বে পূর্ণ আবর্তন করতে সময় নেয় ২৪ ঘণ্টা (৩৬০°)। সুতরাং, ১ ঘণ্টায় আবর্তন করে ১৫° এবং ১° আবর্তন করতে সময় নেয় ৪ মিনিট।
২. চাঁদের কক্ষপথীয় পরিক্রমণ: পৃথিবী যখন ঘুরছে, চাঁদও একই দিকে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীকে পরিক্রমণ করছে। চাঁদের একবার পরিক্রমণ সম্পন্ন করতে সময় লাগে প্রায় ২৭ ⅓ দিন।
৩. দৈনিক কৌণিক ব্যবধান: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চাঁদ তার কক্ষপথে প্রায় (৩৬০° ÷ ২৭.৩) = ১৩° ১০' (বা প্রায় ১৩°) এগিয়ে যায়।
৪. অতিরিক্ত সময়ের হিসাব: ২৪ ঘণ্টা পর পৃথিবীর নির্দিষ্ট স্থানটি আগের স্থানে ফিরে এলেও চাঁদ ততক্ষণে ১৩° সামনে এগিয়ে যাওয়ায় চাঁদের সরাসরি সম্মুখবর্তী হতে পৃথিবীর স্থানটিকে আরও অতিরিক্ত ১৩° ঘুরতে হয়।
৫. এই ১৩° পথ অতিক্রম করতে পৃথিবীর সময় লাগে (১৩ × ৪ মিনিট) = ৫২ মিনিট।
তাই যেকোনো নির্দিষ্ট স্থানে পরবর্তী মুখ্য জোয়ার আসতে (২৪ ঘণ্টা + ৫২ মিনিট) = ২৪ ঘণ্টা ৫২ মিনিট সময় লাগে।
E. রচনাধর্মী উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (LAQ)
১. নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (Prevailing Winds):
সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির সর্বপ্রধান কারণ হলো নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু)।
• আয়ন বায়ু সারা বছর নিরক্ষরেখার দুই পাশ দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হওয়ায় সমুদ্রের জলকেও পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঠেলে নিয়ে যায় (উত্তর ও দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত)।
• মধ্য অক্ষাংশে পশ্চিমা বায়ু পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হওয়ায় সমুদ্রস্রোতকেও পশ্চিম থেকে পূর্বে ধাবিত করে (উত্তর আটলান্টিক স্রোত ও কুমেরু প্রবাহ)।
২. পৃথিবীর আবর্তন গতি ও কোরিওলিস বল (Coriolis Effect):
পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে অবিরাম আবর্তন করার ফলে একটি কেন্দ্রাতিগ বিক্ষেপ বল বা 'কোরিওলিস বল' উৎপন্ন হয়। ফেরেলের সূত্রানুসারে এই বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। এর ফলেই মহাসাগরগুলিতে বিশাল বৃত্তাকার জলচক্র বা জায়র (Gyre) সৃষ্টি হয়।
৩. সমুদ্রজলের উষ্ণতার তারতম্য (Temperature Difference):
নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যের লম্বালম্বি কিরণে জলরাশি উত্তপ্ত ও প্রসারিত হয়ে হালকা হয় এবং বহিঃস্রোত (পৃষ্ঠস্রোত) রূপে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। অপরদিকে, মেরু অঞ্চলে শীতল ও ভারী জল সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষরেখার দিকে ধাবিত হয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে।
৪. সমুদ্রজলের লবণতা ও ঘনত্বের পার্থক্য (Salinity & Density):
অধিক লবণাক্ত জলের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় তা ভারী হয়ে নিচে নিমজ্জিত হয় এবং কম লবণাক্ত হালকা জলের তলদেশ দিয়ে অন্তঃস্রোত রূপে প্রবাহিত হয়। কম লবণাক্ত হালকা জল উপরিভাগ দিয়ে বহিঃস্রোত রূপে প্রবাহিত হয় (যেমন জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে স্রোত বিনিময়)।
৫. স্থলভাগের অবস্থান ও উপকূলরেখার আকৃতি (Coastline Configuration):
কোনো সমুদ্রস্রোতের প্রবাহপথে কোনো দ্বীপ বা মহাদেশের অন্তরীপ উপস্থিত থাকলে স্রোতের অভিমুখ বাধা পেয়ে বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন—দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের সেন্ট রোক অন্তরীপে বাধা পেয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে।
৬. ঋতু পরিবর্তন (Seasonal Changes):
উত্তর ভারত মহাসাগরে মৌসুমি বায়ুর ঋতুভিত্তিক দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সমুদ্রস্রোত শীত ও গ্রীষ্মে পরস্পর বিপরীতমুখী হয়ে প্রবাহিত হয়।
১. উপকূলীয় জলবায়ুর ওপর প্রভাব:
• তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: কোনো উপকূলের পাশ দিয়ে উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হলে শীতকালেও সেখানকার তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে মৃদু থাকে। যেমন—উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ ও নরওয়ের উপকূলীয় বন্দরগুলি তীব্র শীতের মধ্যেও সারা বছর বরফমুক্ত থাকে।
• বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতা: উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত আর্দ্র বায়ু উপকূলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। বিপরীতভাবে শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত শুষ্ক বায়ুর কারণে বৃষ্টিপাত হয় না; যেমন—শীতল বেঙ্গুয়েলা ও পেরু স্রোতের প্রভাবে যথাক্রমে কালাহারি ও আটাকামা মরুভূমির সৃষ্টি হয়েছে।
২. পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মৎস্যক্ষেত্র ও মগ্নচড়া গঠন:
উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলনস্থলে শীতল স্রোতের সাথে ভেসে আসা হিমশৈল উষ্ণ স্রোতের সংস্পর্শে গলে যায়। হিমশৈলের সাথে আসা বালি, পলি ও খনিজ সঞ্চিত হয়ে অগভীর 'মগ্নচড়া' (যেমন গ্র্যান্ড ব্যাংক, ডগার্স ব্যাংক) তৈরি করে। এই অগভীর জলে সূর্যের আলো ও পুষ্টির প্রাচুর্যে মাছের প্রিয় খাদ্য 'প্লাঙ্কটন' ব্যাপক জন্মায়, ফলে সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম মৎস্য শিকার ক্ষেত্রগুলি গড়ে উঠেছে।
৩. ঘনকুয়াশা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ:
উষ্ণ ও শীতল স্রোতের সংযোগস্থলে (হিমপ্রাচীর বরাবর) উষ্ণ আর্দ্র বায়ু হঠাৎ শীতল বায়ুর সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয়ে তীব্র কুয়াশার সৃষ্টি করে। এছাড়া এখানে প্রায়শই আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় ও উত্তাল ঢেউয়ের উৎপত্তি হয় (যেমন নিউফাউন্ডল্যান্ড ও জাপান উপকূল)।
৪. জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক বাণিজ্য:
সমুদ্রস্রোতের অনুকূলে জাহাজ চালালে জাহাজের গতি বৃদ্ধি পায় ও জ্বালানি খরচ বাঁচে। কিন্তু স্রোতের সংযোগস্থলে ভাসমান হিমশৈল এবং ঘন কুয়াশার কারণে জাহাজ চলাচলে মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি থাকে (১৯১২ সালে টাইটানিক জাহাজের ডুবে যাওয়া এর মর্মান্তিক উদাহরণ)।
৫. শৈবাল সাগরের সৃষ্টি:
মহাসাগরের স্রোতগুলি বৃত্তাকারে আবর্তিত হলে কেন্দ্রে শান্ত ও স্রোতহীন জলভাগের সৃষ্টি হয় যেখানে বিশেষ সামুদ্রিক আগাছা জন্মায় (যেমন উত্তর আটলান্টিকের সারগাসো সাগর)।
১. চন্দ্র ও সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ (Gravitational Pull):
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রানুসারে মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের মধ্যেও এই আকর্ষণ কার্যকর।
• চন্দ্রের আকর্ষণ: সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ২ কোটি ৫৫ লক্ষ গুণ ভারী হলেও পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব (প্রায় ১৫ কোটি কিমি) চাঁদের গড় দূরত্বের (প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিমি) তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। দূরত্বের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে সমুদ্রজলের ওপর চন্দ্রের আকর্ষণ ক্ষমতা সূর্যের প্রায় ২.১৭ গুণ (বা প্রায় ২.২ গুণ) বেশি। তাই জোয়ার সৃষ্টিতে চাঁদের ভূমিকাই প্রধান।
• মুখ্য জোয়ার (Primary Tide): পৃথিবীর যে অংশ পরিক্রমণকালে চাঁদের সরাসরি সম্মুখবর্তী হয়, সেখানে চাঁদের প্রত্যক্ষ ও সর্বাধিক আকর্ষণে জলরাশি স্ফীত হয়ে শক্তিশালী 'মুখ্য জোয়ার' সৃষ্টি করে।
২. পৃথিবীর আবর্তনজনিত কেন্দ্রাতিগ বল (Centrifugal Force):
পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর অবিরত পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘোরে। এই তীব্র ঘূর্ণনের ফলে কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার একটি বল বা 'কেন্দ্রাতিগ বল' উৎপন্ন হয়।
• গৌণ জোয়ার (Secondary Tide): মুখ্য জোয়ারের ঠিক বিপরীত দিকে (প্রতিপাদ স্থানে) চাঁদের দূরত্ব সর্বাধিক হওয়ায় সেখানে চাঁদের মহাকর্ষ বল অত্যন্ত দুর্বল হয়। এই বিপরীত স্থানে চাঁদের আকর্ষণ বলের তুলনায় পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বল অনেক বেশি কার্যকর হওয়ায় জলরাশি উল্টো দিকে ফুলে ওঠে এবং 'গৌণ জোয়ার' বা পরোক্ষ জোয়ার ঘটায়।
৩. ভাটা সৃষ্টি (Ebb):
মুখ্য ও গৌণ জোয়ারের স্থান দুটি থেকে অতিরিক্ত জলরাশি আকৃষ্ট হয়ে সরে আসার কারণে এই দুই স্থানের সঙ্গে সমকোণে (৯০° কোণে) অবস্থিত স্থান দুটিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের জল নেমে যায়। একে ভাটা বলে।
৪. সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবীর আপেক্ষিক অবস্থান (ভরা কোটাল ও মরা কোটাল):
• সিজিগি (ভরা কোটাল): অমাবস্যায় (সংযোগ) সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর একই পাশে এবং পূর্ণিমায় (প্রতিযোগ) বিপরীত পাশে এক সরলরেখায় অবস্থান করলে উভয়ের মিলিত টানে প্রবল জলস্ফীতি ঘটে, একে ভরা কোটাল বলে।
• সমকোণ (মরা কোটাল): শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর কেন্দ্রে পরস্পরের সাথে ৯০° সমকোণে অবস্থান করায় উভয়ের বিপরীতমুখী আকর্ষণে সবচেয়ে দুর্বল জোয়ার বা মরা কোটাল ঘটে।
(ক) জোয়ার-ভাটার ইতিবাচক প্রভাব / সুফল:
১. নৌপরিবহন ও নদী বন্দর সচল রাখা: অগভীর নদী মোহনায় অবস্থিত বন্দরগুলিতে (যেমন কলকাতা বন্দর) স্বাভাবিক অবস্থায় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ ঢুকতে পারে না। কিন্তু জোয়ারের সময় নদীখাতে জলের গভীরতা কয়েক মিটার বেড়ে গেলে অনায়াসে বড় বড় মালবাহী জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে ও নোঙর ছাড়তে পারে।
২. নদীর মোহনা পলিহীন ও নাব্যতা বজায় রাখা: ভাটার তীব্র টানে নদী মোহনায় জমে থাকা নুড়ি, বালি ও পলি সমুদ্রের গভীরে ভেসে যায়, ফলে নদীখাতে পলি জমে চর সৃষ্টি হতে পারে না এবং স্বাভাবিক নাব্যতা বজায় থাকে।
৩. আবর্জনা ও দূষণ নিষ্কাশন: নদী তীরবর্তী বড় বড় শিল্পাঞ্চল ও শহরের জমা আবর্জনা ও বর্জ্য পদার্থ ভাটার সময় নদীর জলের সাথে সমুদ্রে চলে যায়, ফলে নদীদূষণ আংশিক হ্রাস পায়।
৪. বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদন (Tidal Energy): জোয়ারের প্রবল জলপ্রবাহকে মোহনায় বাঁধ দিয়ে আটকে টারবাইন ঘুরিয়ে পরিবেশবান্ধব জোয়ারভাটা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায় (যেমন ভারতের গুজরাটের কচ্ছ উপসাগরে এবং সুন্দরবনের দুর্গাদ্দোয়ানি খাঁড়িতে)।
৫. মৎস্যজীবীদের সহায়তা: জোয়ারের জলে ঝাঁকে ঝাঁকে সামুদ্রিক মাছ (যেমন ইলিশ, ভেটকি) নদী মোহনায় প্রবেশ করে, ফলে মৎস্যজীবীদের মাছ ধরতে সুবিধা হয়। এছাড়া জোয়ারের জলের গতিকে কাজে লাগিয়ে নৌকো চালানো সহজ হয়।
৬. লবণ উৎপাদন: জোয়ারের নোনা জলকে উপকূলের লবণ ক্ষেত্রে (Salt Pan) আটকে রেখে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে সহজেই খাবার লবণ প্রস্তুত করা হয়।
(খ) জোয়ার-ভাটার নেতিবাচক প্রভাব / কুফল:
১. বানডাকার ফলে ক্ষয়ক্ষতি: বর্ষাকালে প্রবল ভরা কোটালে নদীতে উঁচু জলপ্রাচীর বা বান ডাকলে নদীবাঁধ ভেঙে প্লাবন দেখা দেয়, ঘরবাড়ি নষ্ট হয় এবং নৌকোডুবি ঘটে।
২. পানীয় জলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি: জোয়ারের নোনা জল অনেক দূর পর্যন্ত নদীর মিষ্টিজলের প্রবাহে ঢুকে পড়ায় চাষের জমি ও পানীয় জল লবণাক্ত হয়ে পড়ে।
৩. পলি সঞ্চয়: কখনো কখনো ভাটার সময় জল সম্পূর্ণ নেমে যাওয়ার আগেই অতিরিক্ত পলি জমে নদীর মোহনায় অনভিপ্রেত চড়া সৃষ্টি হতে পারে।
Comments
You must be signed in to join the discussion.
No comments yet. Be the first to share your thoughts!