মাধ্যমিক ২০২৭ ইতিহাস সম্পূর্ণ ১০০% কমন সাজেশন ও উত্তর | WBBSE Class 10 History Chapter-wise Final Suggestion 2027
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) ২০২৭ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস বিষয়ের ১০০% কমন চূড়ান্ত অধ্যায়ভিত্তিক সাজেশন। ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার জন্য ১ম থেকে ৮ম অধ্যায় পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে বহুবিকল্পভিত্তিক (MCQ), অতিসংক্ষিপ্ত (VSAQ), সংক্ষিপ্ত (SAQ - মান ২), বিশ্লেষণধর্মী (মান ৪) এবং পরিশেষে রচনাধর্মী (মান ৮) প্রশ্ন ও মডেল উত্তর ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো।
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সর্বশেষ প্রশ্নের প্যাটার্ন অনুযায়ী ইতিহাস বিষয়ে মোট ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়। নিচে প্রতিটি বিভাগের প্রশ্ন ও নম্বর বিভাজন দেওয়া হলো:
- বিভাগ 'ক' (বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন - MCQ): মান ১ × ২০ = ২০ নম্বর (প্রতিটি অধ্যায় থেকে বাধ্যতামূলক)
- বিভাগ 'খ' (অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্ন - VSAQ): মান ১ × ১৬ = ১৬ নম্বর (একটি বাক্যে উত্তর, সত্য/মিথ্যা, স্তম্ভ মেলানো, বিবৃতি-ব্যাখ্যা)
- বিভাগ 'গ' (সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন - SAQ): মান ২ × ১১ = ২২ নম্বর (মোট ১৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১১টির উত্তর দিতে হয়)
- বিভাগ 'ঘ' (বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন): মান ৪ × ৬ = ২৪ নম্বর (প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর)
- বিভাগ 'ঙ' (রচনাধর্মী প্রশ্ন - LAQ): মান ৮ × ১ = ৮ নম্বর (৩টি প্রশ্নের মধ্যে যেকোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর)
১ম অধ্যায় : ইতিহাসের ধারণা (Ideas of History)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- সমকালীন প্রামাণ্য দলিল : তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক আন্দোলন ও জনমতের প্রতিদিনের নিরপেক্ষ বিবরণ সংবাদপত্রে পাওয়া যায়।
- ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ : ব্রিটিশ সরকারের দমনমূলক নীতি এবং তার বিরুদ্ধে দেশীয় প্রতিক্রিয়ার স্পষ্ট চিত্র মেলে 'সোমপ্রকাশ', 'অমৃতবাজার' ইত্যাদি থেকে।
- সংজ্ঞা : রাজা-মহারাজা ও উচ্চবিত্তদের বাইরে গিয়ে সমাজের অবহেলিত কৃষক, শ্রমিক, দলিত ও উপজাতিদের সংগ্রাম ও ভূমিকাকে কেন্দ্রে রেখে ইতিহাস গবেষণাকে নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চা বলে।
- জনক : ভারতে এই ধারার প্রধান পথিকৃৎ ও জনক হলেন ঐতিহাসিক ড. রণজিৎ গুহ।
- চিপকো আন্দোলন (১৯৭৩) : উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়ালে সুন্দরলাল বহুগুণার নেতৃত্বে গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন।
- নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (১৯৮৫) : মেধা পাটকর ও বাবা আমতের নেতৃত্বে নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে পরিবেশ আন্দোলন।
- সংস্কৃতি ও সামাজিক স্তরবিন্যাস : খাদ্যাভ্যাস থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো, ধর্মীয় অনুশাসন ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বোঝা যায়।
- বহিরাগত প্রভাব : পর্তুগিজদের হাত ধরে ভারতে আলু, টমেটো, গোলমরিচ ও ছানার মিষ্টির প্রচলন খাদ্যসংস্কৃতির ঐতিহাসিক বিবর্তন তুলে ধরে।
- ঊনবিংশ শতকের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র : ঠাকুরবাড়ির ভেতরের সংস্কৃতি, সমকালীন কলকাতার সামাজিক জীবন ও স্বদেশী ভাবাবেগের জীবন্ত বিবরণ মেলে।
- হিন্দু মেলার স্মৃতি : হিন্দু মেলা ও জাতীয় জাগরণের উন্মেষকাল সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জানা যায়।
- দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত 'সোমপ্রকাশ' নীলকরদের অত্যাচার এবং লর্ড লিটনের গণবিরোধী নীতির তীব্র সমালোচনা করত।
- লর্ড লিটনের দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন (১৮৭৮)-এর শর্ত মেনে মুচলেকা দিতে অস্বীকার করায় এর প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
- পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি ভেঙে মানব সভ্যতায় নারীর শ্রম, আত্মত্যাগ, সমাজ সংস্কার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁদের ভূমিকাকে সামনে আনার চর্চাকে নারীবাদী ইতিহাস বলে।
- জেরাল্ডিন ফোর্বস, বীণা মজুমদার প্রমুখ এই ধারার উল্লেখযোগ্য গবেষক।
- ১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বাংলার ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও কৃষক সমাজের দুর্দশা প্রকাশিত হতো।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বঙ্গদর্শন বাঙালির চিন্তাজগতে নবদিগন্তের সূচনা করেছিল।
- সরকারি নথিপত্রের বাইরে গিয়ে ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, মনস্তত্ত্ব ও অপ্রকাশিত ঘটনার বিশ্বস্ত বিবরণ এতে পাওয়া যায়।
- বিপিনচন্দ্র পালের 'সত্তর বৎসর' বা সরলাদেবীর 'জীবনের ঝরাপাতা' সমকালীন স্বাদেশিকতার অমূল্য দলিল।
- মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয় : ২৯ জুলাই ১৯১১ খালি পায়ে খেলে ভারতীয় ক্লাব মোহনবাগান ইংরেজদের 'ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট'-কে ২-১ গোলে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জয় করে।
- জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণা : খেলার ময়দানে এই ব্রিটিশ পরাজয় ভারতবাসীর মনে আত্মমর্যাদা ও ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়।
- চিরাচরিত রাজনৈতিক ও যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসের পরিবর্তে সমাজের সাধারণ মানুষ—নারী, শ্রমিক, কৃষক, প্রান্তিক বর্ণের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও মনস্তত্ত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া আধুনিক ইতিহাস চর্চাকে নতুন সামাজিক ইতিহাস বলে।
- ১৯৬০-এর দশক থেকে অ্যানালস স্কুল ও ব্রিটেনে এর বিকাশ ঘটে।
- নির্দিষ্ট অঞ্চলের নিজস্ব ভৌগোলিক রূপ, প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, লোকসংস্কৃতি ও জনবিন্যাস বিশদভাবে অনুধাবন করা যায়।
- জাতীয় ইতিহাসের বহু অজানা তথ্য ও কৃষক-আদিবাসী বিদ্রোহের স্থানীয় প্রেক্ষাপট আঞ্চলিক গবেষণার মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : উনিশ শতকে বাঙালির নবজাগরণ ও জাতীয় চেতনার বিকাশ বুঝতে সমকালীন সাময়িকপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বঙ্গদর্শন' এবং দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের 'সোমপ্রকাশ' এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।
- বঙ্গদর্শন পত্রিকার গুরুত্ব : ১৮৭২ সালে প্রকাশিত বঙ্কিমচন্দ্রের 'বঙ্গদর্শন' কেবল সাহিত্য পত্রিকা ছিল না; এতে বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, ইতিহাস, কৃষক সমস্যা ও প্রত্নতত্ত্বের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা থাকত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, বঙ্গদর্শন বাঙালির শিক্ষিত সমাজকে চিন্তার নতুন খোরাক জুগিয়েছিল।
- সোমপ্রকাশ পত্রিকার গুরুত্ব : ১৮৫৮ সালে দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি নির্ভীক রাজনৈতিক সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক। নীলকরদের শোষণ, দেশীয় জমিদারদের অত্যাচার এবং লর্ড লিটনের দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে এটিই প্রথম জোরালো জনমত গড়ে তোলে।
- ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল : সমকালীন বাঙালির মানসিকতা, ব্রিটিশ শাসনের প্রতিক্রিয়া এবং জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের ক্রমবিকাশ বোঝার জন্য এই দুই পত্রিকা আজও গবেষকদের প্রধান সহায়ক।
মূল্যায়ন : সরকারি নথির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সাধারণ ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে এই দুটি পত্রিকা অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।
ভূমিকা : বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আধুনিক ইতিহাস চর্চার দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে এবং তথাকথিত প্রথাগত রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে নতুন শাখাগুলির উদ্ভব হয়।
- নারী ইতিহাস : মানব সভ্যতায় নারীর আত্মত্যাগ, শ্রম, পরিবার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁদের সক্রিয় ভূমিকাকে কেন্দ্র করে এই চর্চার বিকাশ। জেরাল্ডিন ফোর্বস ও নীরা দেশাইয়ের গবেষণায় নারীদের উপেক্ষিত অবস্থান ইতিহাসের আলোয় এসেছে।
- পরিবেশের ইতিহাস চর্চা : প্রকৃতির সঙ্গে মানব সমাজের সম্পর্ক, বনবিনাশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং চিপকো বা নর্মদা বাঁচাও-এর মতো পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে গবেষণা এর মূল উপজীব্য। রামচন্দ্র গুহ ও মাধব গ্যাডগিল এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ।
- নতুন সামাজিক ইতিহাস : রাজা-মহারাজা ও যুদ্ধের বদলে সমাজের সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন যাপনকে কেন্দ্র করে এই ইতিহাস চর্চা আবর্তিত হয়।
উপসংহার : এই আধুনিক শাখাগুলি ইতিহাসকে এক সর্বজনীন ও সামগ্রিক মানবিক রূপ দান করেছে।
ভূমিকা : সাম্প্রতিককালে খেলাধুলা কেবল শারীরিক বিনোদন বা আমোদপ্রমোদ হিসেবে নয়, সামাজিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এক শক্তিশালী ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।
- জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ : পরাধীন ভারতে খেলাধুলা ছিল ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াই। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ক্লাবের ব্রিটিশ সামরিক দলকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জয় সমগ্র ভারতে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।
- সামাজিক সংহতি ও ঐক্য : খেলার ময়দানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক ভেদাভেদ ভুলে ভারতীয়রা এক জাতীয় পতাকার নিচে একত্রিত হতো। কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'খেলা যখন ইতিহাস' গ্রন্থে এর বিশদ আলোচনা রয়েছে।
- ঔপনিবেশিক আধিপত্য বনাম দেশীয় প্রতিরোধ : ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো ব্রিটিশ খেলাগুলি গ্রহণ করে তাদেরই পরাজিত করার মাধ্যমে ভারতীয়রা নিজেদের শারীরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল।
মূল্যায়ন : খেলার ইতিহাস তৎকালীন সমাজের মনস্তত্ত্ব, রাজনীতি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা অনুধাবনের এক জীবন্ত আয়না।
ভূমিকা : আধুনিক ইতিহাস রচনার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও অন্তরঙ্গ উপাদান হলো আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা। এগুলির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' এবং সরলাদেবী চৌধুরানীর 'জীবনের ঝরাপাতা' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- জীবনস্মৃতির গুরুত্ব : জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্তরমহল, উনিশ শতকের শেষার্ধের কলকাতার সামাজিক জীবন, হিন্দু মেলার সূচনা পর্ব এবং নবজাত জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের প্রামাণ্য ছবি পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের এই স্মৃতিচারণায়। কিশোর মনে স্বাদেশিকতার উন্মেষ এতে জীবন্তভাবে বর্ণিত।
- জীবনের ঝরাপাতা-র গুরুত্ব : সরলাদেবী চৌধুরানীর এই আত্মজীবনীতে স্বদেশী যুগের বিপ্লবীদের অস্ত্রশিক্ষা, 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রতিষ্ঠা, 'প্রতাপাদিত্য উৎসব'-এর মতো বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। ভারতীয় নারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পদার্পণের এটি এক দুর্লভ দলিল।
- ইতিহাসের মূল্য : আত্মজীবনীগুলিতে সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি সমাজ ও মানসিকতার অন্তর্লীন সত্য সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়।
উপসংহার : আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যের এই দুটি নিদর্শন উনিশ-বিশ শতকের বাংলার আত্মজাগরণের নির্ভরযোগ্য দলিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সর্বশেষ প্রশ্নের রূপরেখা অনুযায়ী ১ম অধ্যায় থেকে কোনো ৮ নম্বরের প্রশ্ন আসে না; কেবল ১ নম্বর (MCQ ও VSAQ), ২ নম্বর (SAQ) এবং ৪ নম্বরের প্রশ্ন এসে থাকে।
২য় অধ্যায় : সংস্কার : বৈশিষ্ট্য ও মূল্যায়ন (Reform: Characteristics & Observations)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- স্কটল্যান্ডের ঘড়ি ব্যবসায়ী হয়েও তিনি ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
- তিনি ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ এবং ১৮১৮ সালে ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি ও হেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা নেন।
- ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা বিস্তার ও ছাপাখানা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়া তিন মিশনারিকে 'শ্রীরামপুর ত্রয়ী' বলা হয়।
- তাঁরা হলেন : উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ড।
- কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৮৭২ সালে 'আইন ৩' পাস করে।
- এই আইনের দ্বারা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং বিধবাবিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহকে আইনসিদ্ধ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ছিলেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট ব্রাহ্ম সংস্কারক ও পরবর্তীতে বৈষ্ণব ভাবধারার সমন্বয়বাদী সাধক।
- তিনি ব্রাহ্ম সমাজের সংকীর্ণতা দূর করে জাতিভেদ বিরোধী ভাবধারা ও সামাজিক সংস্কারে যুক্ত ছিলেন।
- রক্ষণশীল সমাজের নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নারীশিক্ষার কট্টর সমর্থক ছিলেন এবং ১৮২২ সালে 'স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক' পুস্তিকা প্রকাশ করেন।
- তিনি ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির মাধ্যমে বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা ও অর্থায়নে সক্রিয় সাহায্য করেন।
- হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক ডিরোজিওর মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদে উদ্বুদ্ধ একদল প্রগতিশীল ছাত্রগোষ্ঠীকে 'নব্যবঙ্গ' বা 'ইয়ং বেঙ্গল' বলা হয়।
- সদস্যবৃন্দ : রামতনু লাহিড়ী, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র প্রমুখ।
- লর্ড বেন্টিঙ্কের আইন সচিব টমাস মেকলে ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রাচ্য শিক্ষার বদলে সরকারি অর্থ পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষায় ব্যয়ের সুপারিশ করে যে কার্যবিবরণী পেশ করেন, তাকে মেকলে মিনিটস বলে।
- এর ফলেই ভারতে সরকারি উদ্যোগে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটে।
- ১৭৮৪ সালের ১৫ জানুয়ারি স্যার উইলিয়াম জোন্স কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
- উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব : প্রাচ্যবিদ্যা, ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের নিয়মতান্ত্রিক অনুবাদ ও গবেষণার পথ খুলে দেয়।
- ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন।
- ভারতে আগত তরুণ ব্রিটিশ অসামরিক কর্মচারীদের (সিভিলিয়ানদের) ভারতীয় ভাষা, আইন ও দেশীয় সংস্কৃতিতে শিক্ষিত করাই ছিল এর লক্ষ্য।
- হরিনাথ মজুমদার (কাঙাল হরিনাথ) সম্পাদিত এই পত্রিকায় গ্রামীণ বাংলার জমিদার-মহাজনদের সীমাহীন অর্থনৈতিক নিপীড়ন ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলা হতো।
- নীলকর সাহেবদের কৃষক নির্যাতনের খবর এতে সাহসিকতার সঙ্গে উন্মোচিত করা হয়।
- হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর এই পত্রিকায় নীলকরদের পাশবিক অত্যাচারের বিস্তারিত সংবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করতেন।
- তিনি সাধারণ কৃষকদের নিজের খরচে আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন এবং শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের বিবেককে জাগ্রত করেছিলেন।
- জনবিচ্ছিন্নতা : তাঁদের চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি এবং সনাতন হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি আক্রমণ সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি।
- গ্রাম্য সমাজের সাথে সংযোগহীনতা : আন্দোলনটি মূলত কলকাতার মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত যুবকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
- রাজা রামমোহন রায়কে ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ বলা হয়।
- তিনি মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ভেঙে আধুনিক যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা, মানবতাবাদ ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন করে নবযুগের সূচনা করেছিলেন।
- তিনি ১৮৩৫ সালে মেকলে মিনিটস গ্রহণ করে ইংরেজিকে সরকারি শিক্ষানীতির মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
- ১৮৩৫ সালে এশিয়ার প্রথম আধুনিক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
- ১৮৫৩ সালের ৬ জানুয়ারি মধুসূদন রায় এবং পরবর্তীতে গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় হিন্দু প্যাট্রিয়ট আত্মপ্রকাশ করে।
- তিনি হুগলির এক মহান দানবীর ছিলেন, যিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি শিক্ষা বিস্তার ও দরিদ্র কল্যাণে 'মহসিন ফান্ড'-এ দান করেছিলেন।
- এই ফান্ড থেকেই হুগলি মহসিন কলেজসহ বহু বিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
- পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ভারতীয় ছাত্র ও শিক্ষক।
- ১৮৩৬ সালে কুসংস্কার ভেঙে প্রথম ভারতীয় হিসেবে মানুষের মৃতদেহ শবব্যবচ্ছেদ করে তিনি প্রাচ্যের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জয়যাত্রা সূচনা করেন।
- ১৮১৮ সালে ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে দেশীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে মাতৃভাষায় উন্নত পাঠ্যপুস্তক রচনা ও বিতরণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : আধুনিক ভারতের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় উপলব্ধি করেছিলেন যে মধ্যযুগীয় জড়তা ও কুসংস্কার দূর করতে হলে যুক্তিবাদী ও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পাশ্চাত্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
- লর্ড আমহার্স্টকে ঐতিহাসিক চিঠি (১৮২৩) : ব্রিটিশ সরকার সরকারি অর্থ সংস্কৃত শিক্ষায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিলে রামমোহন ১৮২৩ সালে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি দিয়ে সংস্কৃতের বদলে গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও অন্যান্য ব্যবহারিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষাদানের জোরালো আবেদন জানান।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা : তিনি ১৮১৫ সালে নিজস্ব অর্থানুকূল্যে 'অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল' স্থাপন করেন। ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ এবং ১৮১৮ সালে স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় তিনি ডেভিড হেয়ার ও রাধাকান্ত দেবকে প্রত্যক্ষ সহায়তা দেন।
- বেদান্ত কলেজ স্থাপন : ১৮২৬ সালে বেদান্ত কলেজ স্থাপন করে তিনি প্রাচ্য দর্শন ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের আদর্শ মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন।
মূল্যায়ন : রামমোহনের এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে ১৮৩৫ সালে সরকারি শিক্ষানীতিতে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার বিজয় সুনিশ্চিত করেছিল।
ভূমিকা : উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলার ধর্ম ও সমাজ চিন্তায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের 'সর্বধর্ম সমন্বয়' এবং তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের 'নববেদান্ত' এক বৈপ্লবিক আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটায়।
- শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয় : শ্রীরামকৃষ্ণদেব বিভিন্ন ধর্মমত—হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম স্বীয় জীবনে সাধনা করে এই পরম সত্যে উপনীত হন যে সব ধর্মের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। তাঁর অমিয় বাণী ছিল—"যত মত, তত পথ"। তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মূলে কুঠারাঘাত করেন।
- বিবেকানন্দের নববেদান্ত ও মানবসেবা : বিবেকানন্দ শঙ্করাচার্যের মায়াবাদী বেদান্তকে কর্মমুখী মানবকল্যাণে রূপান্তরিত করেন। তাঁর মূল বাণী ছিল—"জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" ধর্মের আসল অর্থ কোনো শাস্ত্রীয় আচার নয়, ক্ষুধার্ত দরিদ্র মানুষের সেবা।
- বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় পুনর্জাগরণ : ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্মসম্মেলনে তিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সনাতন দর্শনের উদারতা প্রমাণ করেন এবং ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করে সেবা ও ত্যাগের আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।
উপসংহার : এই সমন্বয়বাদী ধর্মাদর্শ জাতিকে হীনমন্যতা থেকে মুক্ত করে আত্মবিশ্বাসী ও ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়েছিল।
ভূমিকা : উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪)-এর সুপারিশক্রমে ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল ভারতের প্রথম আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
- উচ্চশিক্ষার প্রসার ও বিস্তার : প্রতিষ্ঠার পর প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সমগ্র উত্তর, পূর্ব ও মধ্য ভারতের বিশাল ভূখণ্ডের কলেজ ও উচ্চশিক্ষা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো। এর ফলে দেশে আধুনিক কলা, বিজ্ঞান ও আইনের চর্চা ব্যাপক গতি পায়।
- স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের যুগান্তকারী নেতৃত্ব : ১৯০৬ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত উপাচার্য হিসেবে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কেবল একটি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এক আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেন।
- স্নাতকোত্তর ও মাতৃভাষার চর্চা : তিনিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে স্নাতকোত্তর (Post-Graduate) বিভাগ চালু করেন এবং ড. সিভি রমন, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, মেঘনাদ সাহার মতো বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতদের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত করেন। সেই সাথে বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথ খুলে দেন।
মূল্যায়ন : জাতীয় পুনর্জাগরণ, আধুনিক মেধার স্ফূরণ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব তৈরিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
ভূমিকা : ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে প্রাচ্যের প্রথম আধুনিক ইউরোপীয় চিকিৎসালয় হিসেবে 'কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ' প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ঐতিহাসিক শবব্যবচ্ছেদ (১৮৩৬) : শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাস ও জাতপাতের কুসংস্কার ভেঙে ১৮৩৬ সালের ২৮ অক্টোবর পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত প্রথম ভারতীয় ছাত্র হিসেবে সফলভাবে মানুষের মৃতদেহের শবব্যবচ্ছেদ (Dissection) করে দেশে আধুনিক চিকিৎসাচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করেন।
- দক্ষ ভারতীয় চিকিৎসক তৈরি : এই কলেজ থেকে পাস করে ভোলানাথ বসু, গোপালচন্দ্র শীল প্রমুখ ভারতীয় মেধা ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।
- নারী শিক্ষার অগ্রগতি : কাদম্বিনী গাঙ্গুলী এই কলেজ থেকেই ১৮৮৬ সালে ডিগ্রি লাভ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা চিকিৎসকদের একজন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
উপসংহার : ভারতীয় সমাজের জড়তা ভেঙে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত গড়তে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অবদান অবিস্মরণীয়।
ভূমিকা : ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অফ কন্ট্রোলের সভাপতি চার্লস উড ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্গঠন ও প্রসারের জন্য এক সুদূরপ্রসারী শিক্ষানীতি ঘোষণা করেন, যা 'উডের ডেসপ্যাচ' নামে পরিচিত। একে ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার 'ম্যাগনাকার্টা' বলা হয়।
- শিক্ষা দপ্তর গঠন : ব্রিটিশ ভারতের প্রতিটি প্রদেশে একজন নির্দেশকের (DPI) অধীনে একটি করে সরকারি শিক্ষা দপ্তর প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়।
- বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন : লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে কলকাতা, বোম্বাই এবং মাদ্রাজ—এই তিনটি প্রেসিডেন্সি শহরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয় (যা ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়)।
- সমন্বিত শিক্ষা কাঠামো ও অনুদান প্রথা : প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এক স্তরীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং বেসরকারি বিদ্যালয়গুলির জন্য সরকারি অনুদান প্রথা (Grants-in-Aid) প্রবর্তিত হয়।
- নারী শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ : নারী শিক্ষা ও শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মূল্যায়ন : ত্রুটি সত্ত্বেও উডের ডেসপ্যাচই ভারতে আধুনিক সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
ভূমিকা : ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ বাস্তবতা ও অন্তঃসারশূন্যতা বুঝতে কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' (১৮৬২) এবং দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' (১৮৬০) নাটক দুটি প্রধানতম সাহিত্যিক দলিল।
- হুতোম প্যাঁচার নকশায় কলকাতার বাবু সমাজ : কলকাতার নব্যধনী উচ্চবিত্ত বাবু সমাজের ভণ্ডামি, অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণ, মদ্যপান, বাঈজি নাচ এবং চড়ক-বারোয়ারি পূজার হুজুগ ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এতে উন্মোচিত হয়।
- নীলদর্পণ নাটকে গ্রামীণ শোষণ ও ক্রন্দন : দীনবন্ধু মিত্র গ্রামীণ বাংলার রক্তক্ষরণকে মঞ্চে তুলে ধরেন। নীলকর উড ও রোগ সাহেবের পাশবিক অত্যাচার, কৃষক তোরাপ ও ক্ষেত্রমণির আর্তনাদ এবং সম্পন্ন রায়ত গোলক বসুর পরিবারের ধ্বংসসাধন সমকালীন নীলচাষের নির্মম শোষক রূপকে উন্মোচিত করে।
- সামাজিক প্রভাব : এই দুই সাহিত্যকর্ম বাঙালি শিক্ষিত সমাজের বিবেককে জাগ্রত করে তাঁদের গণমুখী হতে বাধ্য করেছিল।
উপসংহার : এই গ্রন্থ দুটি তৎকালীন বাংলার নগর ও গ্রামের পরস্পরবিরোধী দুই দ্বান্দ্বিক সমাজচিত্রকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
ভূমিকা : উনিশ শতকে অবরোধবাসিনী ভারতীয় নারীকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এই তিন মহীরুহের অবদান চিরস্মরণীয়।
- রাজা রাধাকান্ত দেবের ভূমিকা : রক্ষণশীল সমাজের নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি নারী শিক্ষার কট্টর সমর্থক ছিলেন। ১৮২২ সালে তিনি 'স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক' পুস্তিকা প্রকাশ করেন এবং ক্যালকাটা স্কুল সোসাইটির মাধ্যমে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনে অর্থ ও সমর্থন দেন।
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা : তিনি ছিলেন নারীমুক্তির প্রধান স্থপতি। সরকারের স্পেশাল ইন্সপেক্টর হিসেবে নিজ ব্যয়ে ও উদ্যোগে দক্ষিণবঙ্গ ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে আজীবন সংগ্রাম করেন।
- ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন ও হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় : আইন সচিব জে. ই. ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন ১৮৪৯ সালের ৭ মে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী 'ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল' (বর্তমানে বেথুন স্কুল ও কলেজ), যা ছিল ভারতের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ উচ্চমানের বালিকা বিদ্যালয়।
উপসংহার : এঁদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফলেই ভারতীয় নারী সমাজ অন্ধকারের অন্তরাল ভেঙে আধুনিক শিক্ষার আঙিনায় প্রবেশ করতে পেরেছিল।
ভূমিকা : ভারতীয় সনাতন হিন্দু সমাজের সবচেয়ে বর্বর ও অমানবিক কুসংস্কার ছিল মৃত স্বামীর চিতায় জীবিত বিধবা স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারার 'সতীদাহ প্রথা'। এর বিরুদ্ধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই চালিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায়।
- ব্যক্তিগত বেদনা ও পণ : ১৮১১ সালে নিজের ভ্রাতৃবধূ অলকমঞ্জরীর মর্মান্তিক সতীদাহ স্বচক্ষে দেখে রামমোহন এই নৃশংস প্রথা চিরতরে নির্মূল করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন।
- শাস্ত্রীয় প্রমাণ ও জনমত গঠন : তিনি শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে স্বজনদের বোঝাতেন। ১৮১৮ ও ১৮২০ সালে প্রকাশিত পুস্তিকায় মনুস্মৃতি ও যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে হিন্দুশাস্ত্রে সতীদাহ কোনো বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান নয়। 'সম্বাদ কৌমুদী' পত্রিকায় এর বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন।
- ১৭ নম্বর রেগুলেশন পাস (১৮২৯) : রামমোহনের অকাট্য যুক্তি ও আন্তর্জাতিক জনমতের ওপর ভর করে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক রেগুলেশন XVII (১৭) জারি করে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও নরহত্যাতুল্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেন।
মূল্যায়ন : রামমোহনের এই জয় ছিল ভারতীয় সমাজে যুক্তিবাদ, মানবকল্যাণ ও নারী জীবনের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম ঐতিহাসিক মাইলফলক।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষানীতিকে কেন্দ্র করে ভারতে যে চরম মতপার্থক্য তৈরি হয়, তা 'প্রাচ্য-পাশ্চাত্য বিতর্ক' (Orientalist-Anglicist Controversy) নামে খ্যাত।
১. প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক :
- বিতর্কের সূত্রপাত : ১৮১৩ সালের সনদ আইনে (Charter Act, 1813) ভারতে শিক্ষা বিস্তারের জন্য বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়। এই অর্থ প্রাচ্য নাকি পাশ্চাত্য শিক্ষায় ব্যয় হবে—এই নিয়ে বিরোধ বাঁধে।
- প্রাচ্যবাদী দল (Orientalists) : এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক, উইলসন প্রমুখ চেয়েছিলেন এই অর্থ সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষার সনাতন প্রাচ্য শিক্ষার প্রসারে ব্যয় হোক।
- পাশ্চাত্যবাদী দল (Anglicists) : টমাস ব্যাবিংটন মেকলে, চার্লস ট্রেভেলিয়ান, রামমোহন রায় প্রমুখ দাবি তোলেন এই অর্থ পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, দর্শন ও ইংরেজি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত।
- মীমাংসা : ১৮৩৫ সালের মেকলে মিনিটস এবং লর্ড বেন্টিঙ্কের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষার জয় ঘোষিত হয়।
২. উচ্চ শিক্ষার বিকাশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান :
- প্রতিষ্ঠা : উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪)-এর সুপারিশক্রমে ১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম উপাচার্য ছিলেন জেমস উইলিয়াম কোলভিল।
- উচ্চশিক্ষার বিস্তার : এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল বাংলায় নয়, সমগ্র উত্তর, পূর্ব ও মধ্য ভারতে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। আধুনিক কলা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও আইন শিক্ষার পাঠ্যক্রম তৈরি করে।
- স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের অবদান : উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আমলে (১৯০৬-১৯১৪) এটি কেবল পরীক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি বিশ্বমানের উচ্চতর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। তিনি বাংলায় প্রথম স্নাতকোত্তর বিভাগ (Post-Graduate) খোলেন এবং সিভি রমন, সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন, মেঘনাদ সাহার মতো দিকপালদের অধ্যাপনায় নিযুক্ত করেন।
উপসংহার : কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় মেধার বিকাশ ঘটিয়ে জাতীয় পুনর্জাগরণ ও বিজ্ঞান গবেষণায় এক নবযুগের সূচনা করেছিল।
ভূমিকা : ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে বাংলায় চিন্তা, সাহিত্য, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব বৌদ্ধিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তাকে অনেকেই 'বাংলার নবজাগরণ' (Bengal Renaissance) বলে অভিহিত করেছেন। তবে এর প্রকৃত চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে গভীর বিতর্ক রয়েছে।
১. নবজাগরণের ইতিবাচক দিকসমূহ :
- যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ : রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্তের হাত ধরে মধ্যযুগীয় অন্ধবিশ্বাস ও অচলায়তনের বিপরীতে মানবকল্যাণ, নারীমুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতার জন্ম হয়।
- সাহিত্যের সমৃদ্ধি : মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বৈপ্লবিক আধুনিকায়ন ঘটে।
- জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ : হিন্দু মেলা, ভারত সভা ইত্যাদির মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধিকার ও দেশাত্মবোধের স্ফূরণ ঘটে।
২. নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা ও চরিত্রগত ত্রুটি :
- শহুরে ও উচ্চবিত্তের আন্দোলন : ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার ও রণজিৎ গুহ দেখিয়েছেন এই নবজাগরণ মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত বাবু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; গ্রামীণ কৃষক-শ্রমিক সমাজে এর স্পর্শ লাগেনি।
- ঔপনিবেশিক দাসত্ব ও ব্রিটিশ নির্ভরতা : নবজাগরণের নেতারা অনেকেই ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের পক্ষে 'ঐশ্বরিক আশীর্বাদ' বলে মনে করতেন এবং সাম্রাজ্যবাদের মৌলিক শোষক চরিত্রটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
- মুসলিম সমাজের বিচ্ছিন্নতা : নবজাগরণের চরিত্রটি বহুলাংশে প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্য দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘদিন এই ধারা থেকে দূরে ছিল।
উপসংহার : ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. অনিল শীল প্রমুখ একে 'তথাকথিত নবজাগরণ' বললেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে ত্রুটি সত্ত্বেও এই বৌদ্ধিক আলোড়নই পরবর্তীকালে আধুনিক ভারতের সমাজ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
৩য় অধ্যায় : প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ : বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ (Resistance & Rebellion)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- হাজী শরীয়তুল্লাহর পুত্র দুদু মিঞা ফরাজি আন্দোলনকে এক শক্তিশালী শোষণবিরোধী কৃষক আন্দোলনে পরিণত করেন।
- তিনি ঘোষণা করেন—'জমি আল্লাহর দান, কারও কর ধার্য করার অধিকার নেই'। তিনি নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে রায়তদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
- বিদ্রোহ : অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ (যেমন সাঁওতাল বিদ্রোহ)।
- অভ্যুত্থান : কোনো নির্দিষ্ট দল বা সামরিক বাহিনীর আকস্মিক সশস্ত্র প্রতিরোধ (যেমন নৌ অভ্যুত্থান)।
- বিপ্লব : সমগ্র সমাজ ও শাসন কাঠামোর আমূল রূপান্তর (যেমন ফরাসি বিপ্লব)।
- জমির প্রাচীন যৌথ মালিকানা 'খুঁতকাঠি প্রথা' পুনরুদ্ধার করা।
- দিকু শোষক ও ব্রিটিশ রাজকে উচ্ছেদ করে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে স্বাধীন 'মুন্ডা রাজ্য' প্রতিষ্ঠা করা।
- মুন্ডা সমাজে প্রচলিত জমির যৌথ মালিকানা প্রথাকে 'খুঁতকাঠি' প্রথা বলা হতো, যেখানে কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা বা করের বোঝা ছিল না।
- মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রাণী শিরোমণি চুয়াড় বিদ্রোহে (১৭৯৯) স্থানীয় পাইক ও কৃষকদের নেতৃত্ব দিয়ে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরোচিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁকে 'মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ' বলা হয়।
- ইসলামের বিকৃতি দূর করে মূল আদর্শে ফেরা এবং ভারতবর্ষকে 'দার-উল-হারব' (শত্রুর দেশ) থেকে 'দার-উল-ইসলাম' (মুক্তির দেশ)-এ রূপান্তর করা।
- বাংলায় তিতুমীরের নেতৃত্বে এটি জমিদার ও নীলকর বিরোধী কৃষক প্রতিরোধে রূপ নেয়।
- ১৮৫৯-৬০ সালের তীব্র নীল বিদ্রোহের পর বাধ্য হয়ে ১৮৬০ সালে ডব্লিউ. এস. সিটন-কারের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয়।
- এর উদ্দেশ্য ছিল নীলচাষের ত্রুটি ও কৃষকদের অভিযোগ খতিয়ে দেখা। কমিশন রায় দেয় যে নীলচাষ সম্পূর্ণ কৃষকের ইচ্ছাধীন।
- রেলপথের স্লিপার ও নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ তৈরির জন্য শাল ও সেগুন কাঠের একচেটিয়া জোগান নিশ্চিত করা।
- বনজ সম্পদের বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি করা।
- লক্ষ্য : ইসলামের ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য পালন এবং জমিদারি শোষণের অবসান ঘটানো।
- ব্যর্থতা : দুদু মিঞার মৃত্যুর পর যোগ্য নেতৃত্বের অভাব এবং ব্রিটিশদের কঠোর দমননীতির ফলে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।
- হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় হিন্দু প্যাট্রিয়টে নীলকরদের অত্যাচারের পর্দাফাঁস করেন।
- দীনবন্ধু মিত্র 'নীলদর্পণ' নাটক লিখে সমকালীন শিক্ষিত বিবেককে নাড়িয়ে দেন।
- ১৮৭৩ সালে পাবনার কৃষকরা জমিদারদের অন্যায় খাজনা বৃদ্ধি, বেআইনি আবওয়াব ও জমির দলিল দখলের বিরুদ্ধে 'কৃষক সমিতি' গড়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- 'কেনারাম' (ভারী বাটখারা) দিয়ে ফসল কিনত এবং 'বেচারাম' (হালকা বাটখারা) দিয়ে পণ্য বিক্রি করত।
- ৫০% থেকে ৫০০% পর্যন্ত সুদের জালে সাঁওতালদের আজীবন ক্রীতদাসে পরিণত করত।
- ফরাজি আন্দোলন : হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিঞা।
- ওহাবি / বারাসাত আন্দোলন : সৈয়দ আহমেদ ও তিতুমীর।
- তিনি বাংলায় বারাসাত বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন। নারকেলবেড়িয়ায় 'বাঁশের কেল্লা' গড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীন শাসন ঘোষণা করে ১৮৩১ সালে কামানের মুখে বীরের মতো শহীদ হন।
- এটি ছিল শোষণবিরোধী আদিবাসী গণবিপ্লব, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কামার, কুমার, তাঁতিদেরও পাশে পেয়েছিল। এর মূল চরিত্র ছিল চরম সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা।
- সাঁওতাল ও ছোটনাগপুর অঞ্চলে ব্যবসা ও মহাজনি করতে আসা বাইরে থেকে আগত প্রতারক ও শোষক ব্যবসায়ীদের 'দিকু' (অর্থ- বহিরাগত প্রতারক) বলা হতো।
- মেদিনীপুর ও জঙ্গলমহলে জমিদারদের অধীনে থাকা বংশানুক্রমিক স্থানীয় লাঠিয়াল পদাতিক সেনাদের 'পাইক' বলা হতো, যারা যুদ্ধ ও প্রহরার বিনিময়ে নিষ্কর 'পাইকান জমি' ভোগ করত।
- ১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দের কোল বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার আদিবাসীদের জন্য ১৮৩৪ সালে ছোটনাগপুর অঞ্চল নিয়ে এক বিশেষ নন-রেগুলেশন প্রশাসনিক অঞ্চল গড়ে তোলে, যা এই নামে পরিচিত।
- ১৭৮৩ সালে রংপুরের ইজারাদার দেবী সিংহের সীমাহীন অত্যাচার, নারী নির্যাতন ও করের বোঝায় অতিষ্ঠ হয়ে হিন্দু ও মুসলিম কৃষকরা একযোগে বিদ্রোহ করে।
- তিনি নিজের 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকায় নীলকরদের অত্যাচার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন এবং কৃষকদের বিনামূল্যে উকিল দিয়ে আইনি সাহায্য করে সর্বস্বান্ত হন।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : ব্রিটিশ সরকার ১৮৬৫ ও ১৮৭৮ সালে দমনমূলক অরণ্য আইন প্রণয়ন করে ভারতের সমৃদ্ধ বনভূমির ওপর নিজস্ব একচ্ছত্র বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কায়েম করে।
- রেলপথের স্লিপার সংগ্রহ : ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য দ্রুত রেলপথ বিস্তার ঘটছিল। রেললাইনের নিচে স্লিপার পাতার জন্য বিপুল পরিমাণ শাল ও সেগুন কাঠের সরবরাহ নিশ্চিত করতে অরণ্য দখল করা হয়।
- রাজকীয় নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ : ইংল্যান্ডের ওক কাঠের সংকট মেটাতে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির যুদ্ধজাহাজ তৈরির জন্য ভারতের দীর্ঘস্থায়ী সেগুন কাঠের প্রয়োজন মেটানো।
- রাজস্ব বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক শোষণ : কাঠ, রবার, গালা, মোম ও চামড়ার বাণিজ্যিক রপ্তানি থেকে বিপুল সরকারি রাজস্ব আদায় এবং ব্যক্তিগত ঠিকাদারদের ইজারা দিয়ে লাভবান হওয়া।
- আদিবাসীদের অরণ্য অধিকার হরণ : অরণ্যকে সংরক্ষিত, সুরক্ষিত ও গ্রামীণ শ্রেণীতে ভাগ করে আদিবাসীদের প্রবেশ ও জীবিকা নির্বাহ নিষিদ্ধ করা।
উপসংহার : এই শোষক আইনের ফলেই সমগ্র ভারতে একের পর এক আদিবাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল।
ভূমিকা : ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে সবচেয়ে সুসংগঠিত গণসংগ্রাম ছিল ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ বা 'হুল'। সিধু ও কানুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল।
- দামিন-ই-কো অঞ্চলে রাজস্বের বোঝা : জঙ্গল কেটে কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তোলা সাঁওতালদের 'দামিন-ই-কো' এলাকায় ইংরেজ সরকার বলপূর্বক জমিদারি কায়েম করে মাত্রাতিরিক্ত হারে খাজনা চাপিয়ে দেয়।
- দিকু মহাজনদের প্রতারণা : বহিরাগত মহাজনরা 'কেনারাম' (বেশি ওজনের বাটখারা) দিয়ে ফসল কিনত এবং 'বেচারাম' (কম ওজনের বাটখারা) দিয়ে জিনিস বেচত। ৫০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত সুদের জালে সাঁওতালদের আজীবন ক্রীতদাসে পরিণত করত।
- রেলপথের কর্মচারীদের পাশবিক নির্যাতন : ভাগলপুর রেললাইনের ইউরোপীয় ঠিকাদাররা সাঁওতাল পুরুষদের দিয়ে বেগার খাটাত এবং তাদের মা-বোনদের ওপর চরম পাশবিক অত্যাচার চালাত।
- আইন ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বন : ব্রিটিশ দারোগা ও পুলিশ সর্বদাই মহাজনদের পক্ষ নিত; আদিবাসীরা কোনো ন্যায়বিচার পেত না।
মূল্যায়ন : এই অমানুষিক অর্থনৈতিক শোষণ ও সামাজিক অপমানের হাত থেকে আত্মরক্ষা করতেই সাঁওতালরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
ভূমিকা : উনিশ শতকে কৃষক ও আদিবাসী জনসমাজের ব্রিটিশ ও জমিদার বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এই গণসংগ্রামগুলির মাধ্যমে।
- ফরাজি আন্দোলন : হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তাঁর পুত্র দুদু মিঞার নেতৃত্বে বাংলায় চলা এই আন্দোলন ঘোষণা করে 'জমি আল্লাহর দান, কারও কর ধার্য করার অধিকার নেই'। এটি নীলকর ও জমিদারদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কৃষক প্রতিরোধে পরিণত হয়।
- কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২) : ছোটনাগপুর অঞ্চলে বহিরাগত দিকুদের জমি বেদখল, অতিরিক্ত খাজনা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগতের নেতৃত্বে কোলরা বিদ্রোহ করে। এর ফলে ১৮৩৪ সালে 'দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি' গঠিত হয়।
- মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০) : বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে জমির যৌথ মালিকানা 'খুঁতকাঠি' প্রথা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন 'মুন্ডা রাজ' গঠনের জন্য উলগুলান সংঘটিত হয়।
- পাগলাপন্থী বিদ্রোহ (১৮২৪-৩৩) : ময়মনসিংহের শেরপুর অঞ্চলে করম শাহ ও টিপু শাহের নেতৃত্বে সুফি পাগলাপন্থী কৃষকরা জমিদারদের অন্যায় আবওয়াব ও ব্রিটিশ করের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
উপসংহার : এই আন্দোলনগুলি প্রমাণ করে ভারতীয় কৃষক শ্রেণী কখনোই ঔপনিবেশিক শাসনকে বিনাবাক্যে মেনে নেয়নি।
ভূমিকা : আরব দেশে আবদুল ওহাবের সূচিত ইসলামীয় সংস্কার আন্দোলন ভারতে সৈয়দ আহমেদ এবং বাংলায় মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের নেতৃত্বে অভূতপূর্ব গণসংগ্রামের রূপ নেয়।
- ধর্মীয় সংস্কার থেকে কৃষক মুক্তি সংগ্রাম : বাংলায় ওহাবি আন্দোলন শুরু হয়েছিল ইসলামের কুসংস্কার দূর করার ধর্মীয় আদর্শ নিয়ে, কিন্তু অচিরেই তা অত্যাচারী হিন্দু ও মুসলিম জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কৃষক সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়।
- জমিদারদের দাড়ির ওপর করের প্রতিবাদ : নদীয়া ও ২৪ পরগনার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় ওহাবিদের দাড়ির ওপর কর ধার্য করলে তিতুমীর কৃষকদের নিয়ে বিদ্রোহের ডাক দেন এবং নারকেলবেড়িয়ায় বিখ্যাত 'বাঁশের কেল্লা' নির্মাণ করেন।
- জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চরিত্র : তিতুমীর নিজ অঞ্চলে কোম্পানির শাসন অস্বীকার করে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩১ সালে ইংরেজ সেনার কামানের মুখে তিনি বীরের মতো শহীদ হন।
মূল্যায়ন : একে কেবল সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বলা ভুল; এটি ছিল মূলত দরিদ্র মুসলিম ও হিন্দু রায়তদের সম্মিলিত ব্রিটিশ বিরোধী কৃষক প্রতিরোধ।
ভূমিকা : ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দের নীল বিদ্রোহের একটি অনন্য ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষকদের মাঠের লড়াইয়ের সাথে কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্রের অভূতপূর্ব সমর্থন।
- হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' : হিন্দু প্যাট্রিয়টের সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নিজের পত্রিকায় নীলকরদের পাশবিক অত্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং নিজের সর্বস্ব ব্যয় করে কৃষকদের আদালতে আইনি লড়াইয়ে সাহায্য করেন।
- দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক : দীনবন্ধু মিত্রের নাটকটি নীলকরদের অত্যাচারের জীবন্ত চিত্র সাধারণ মানুষের দরবারে তুলে ধরে। রেভারেন্ড জেমস লং এটি নিজের নামে প্রকাশ করে কারাদণ্ড বরণ করেন।
- অন্যান্য পত্রিকা ও আইনজীবী : সোমপ্রকাশ, সুলভ সমাচার পত্রিকাগুলি কৃষকদের পক্ষে সোচ্চার হয়। শিশিরকুমার ঘোষ ও মনমোহন ঘোষ আদালতে কৃষকদের পক্ষে আইনি সহায়তা দেন।
উপসংহার : মাঠের কৃষক এবং শহরের কলমজীবীদের এই বিরল মেলবন্ধনের ফলেই ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করে জোরপূর্বক নীলচাষ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।
ভূমিকা : রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি বর্ণনায় ইতিহাস শাস্ত্রে 'বিপ্লব', 'অভ্যুত্থান' ও 'বিদ্রোহ'—এই তিনটি পারিভাষিক শব্দের সুস্পষ্ট পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
- বিদ্রোহ (Rebellion) : প্রচলিত কোনো অন্যায় নিয়ম, শোষণ বা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং অসন্তোষমূলক প্রতিরোধ আন্দোলনকে বিদ্রোহ বলে (যেমন: ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ)। এটি ব্যর্থ হতে পারে বা আংশিক দাবি আদায় করতে পারে।
- অভ্যুত্থান (Uprising / Mutiny) : সমাজের কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সশস্ত্র বাহিনীর দ্বারা প্রচলিত শাসক বা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আকস্মিক সশস্ত্র প্রচেষ্টাকে অভ্যুত্থান বলে (যেমন: ১৯৪৬ সালের নৌ অভ্যুত্থান)।
- বিপ্লব (Revolution) : যখন কোনো মৌলিক গণজাগরণের মাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্রুত এবং আমূল রূপান্তর ঘটে, তখন তাকে বিপ্লব বলে (যেমন: ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব বা ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব)।
উপসংহার : বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ থেকেই অনেক সময় ব্যাপক অভ্যুত্থান এবং পরিশেষে এক মহামানবিক বিপ্লবের সৃষ্টি হয়।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : ১৮৫৯-৬০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার নদিয়া, যশোর, ২৪ পরগনা ও মালদহ জেলায় সংঘটিত নীল বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ভারতের এক সফল ও সুসংগঠিত কৃষক প্রতিরোধ। দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ গণবিপ্লবে রূপ নেয়।
১. নীল বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ :
- দাদন প্রথার শোষণ : নীলকর সাহেবরা দরিদ্র রায়তদের সামান্য অগ্রিম টাকা (দাদন) দিয়ে উর্বর ধানের জমিতে জোরপূর্বক নীল চাষ করতে বাধ্য করত। একবার দাদন নিলে কৃষকের কোনোদিনই ঋণ শোধ হতো না।
- অমানুষিক নির্যাতন : নীল চাষে অস্বীকার করলে কৃষকের ঘরে আগুন দেওয়া, গবাদি পশু লুট, শারীরিক চাবুক মারা এবং নীলকুঠির অন্ধকূপে আটক রেখে নির্যাতন করা হতো।
- পঞ্চম ও সপ্তম আইন : ইংরেজ সরকার একতরফা আইন জারি করে নীলচাষকে বাধ্যতামূলক এবং চুক্তিভঙ্গকে ফৌজদারি অপরাধ বলে ঘোষণা করেছিল।
২. শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকা :
- হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও হিন্দু প্যাট্রিয়ট : 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর পত্রিকায় নীলকরদের পাশবিক অত্যাচারের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং নিজের খরচে আদালতে চাষীদের উকিল দিয়ে লড়াই চালান।
- দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক : দীনবন্ধু মিত্রের এই কালজয়ী নাটক বাংলার মানুষের বিবেক নাড়িয়ে দেয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এর ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং রেভারেন্ড জেমস লং এটি প্রকাশ করে কারাবরণ করেন।
- আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা : শিশিরকুমার ঘোষ, মনোমোহন ঘোষ প্রমুখ আদালতে কৃষকদের পক্ষে আইনি সহায়তা প্রদান করেন।
৩. নীল বিদ্রোহের ফলাফল ও গুরুত্ব :
- ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে সরকার ডব্লিউ. এস. সিটন-কার-এর সভাপতিত্বে নীল কমিশন (Indigo Commission) গঠন করতে বাধ্য হয়।
- কমিশন রায় দেয় যে নীল চাষ সম্পূর্ণ কৃষকের ইচ্ছাধীন এবং জোরপূর্বক কাউকে বাধ্য করা বেআইনি। এর ফলে বাংলায় অত্যাচারী নীলচাষ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
উপসংহার : নীল বিদ্রোহ প্রমাণ করেছিল যে কৃষক শক্তি ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সচেতন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ অত্যাচারী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকেও পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে।
ভূমিকা : ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভাগলপুর, বীরভূম ও রাজমহল পাহাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে সংঘটিত সাঁওতাল বিদ্রোহ (হুল) ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী আদিবাসী প্রতিরোধ।
১. সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান কারণসমূহ :
- জমির অধিকার হরণ ও উচ্চ রাজস্ব : দামিন-ই-কো অঞ্চলে কঠোর পরিশ্রমে তৈরি সাঁওতালদের ফসলি জমিতে ব্রিটিশ সরকার বলপূর্বক জমিদারি ব্যবস্থা কায়েম করে ও মাত্রাতিরিক্ত কর ধার্য করে।
- দিকু মহাজনদের প্রতারণা : বহিরাগত মহাজনরা 'কেনারাম' (বেশি ওজনের বাটখারা) দিয়ে ফসল কিনত এবং 'বেচারাম' (কম ওজনের বাটখারা) দিয়ে জিনিস বিক্রি করত। সুদের পরিমাণ ছিল ৫০% থেকে ৫০০% পর্যন্ত।
- রেলপথের ঠিকাদারদের পাশবিক শোষণ : সাঁওতাল পুরুষদের নামমাত্র পারিশ্রমিকে বেগার খাটানো এবং তাদের মেয়েদের সম্ভ্রমহানি করা হতো।
- আইন ব্যবস্থার অবহেলা : ব্রিটিশ আদালত ও পুলিশ সর্বদাই মহাজন ও জমিদারদের সুরক্ষা দিত; আদিবাসীদের কান্না পৌঁছাত না।
২. সাঁওতাল বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব :
- স্বতন্ত্র সাঁওতাল পরগনা গঠন : সরকার বুঝতে পারে যে সাঁওতালদের চিরাচরিত জীবনযাত্রা রক্ষা না করলে শান্তিশৃঙ্খলা অসম্ভব। তাই বিদ্রোহ দমনের পর ১৮৫৬ সালে দামিন-ই-কো অঞ্চল ভেঙে 'সাঁওতাল পরগনা' (Santhal Pargana) নন-রেগুলেশন জেলা গঠিত হয়।
- আইনি সুরক্ষা : মহাজনদের সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয় এবং উপজাতিদের নিজস্ব সামাজিক প্রথা ও মোড়লদের শাসনকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
- ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা : সাঁওতালদের এই বীরত্বপূর্ণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ এবং অন্যান্য কৃষক ও স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার অনন্ত উৎস হয়ে ওঠে।
উপসংহার : ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্যানিং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে তীর-ধনুকের সাঁওতালদের দমন করতে ব্রিটিশদের কামান ও আগ্নেয়াস্ত্রের চূড়ান্ত বর্বরতা প্রয়োগ করতে হয়েছিল।
ভূমিকা : উনিশ শতকে ব্রিটিশ সরকার ভারতের অরণ্য সম্পদের ওপর সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৮৬৫, ১৮৭৮ এবং পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে ধারাবাহিকভাবে দমনমূলক অরণ্য আইন প্রণয়ন করে। এর ফলে আদিবাসীদের বহু শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী অরণ্য অধিকার সমূলে কেড়ে নেওয়া হয়।
১. অরণ্য আইন প্রবর্তনে ব্রিটিশ সরকারের মূল উদ্দেশ্য :
- রেলপথ নির্মাণ ও সাম্রাজ্যিক যোগাযোগ : ভারতে ব্রিটিশ প্রশাসনিক যোগাযোগ ও সেনা পরিবহনের জন্য দ্রুত রেলপথ বিস্তারে বিপুল শাল ও সেগুন কাঠের স্লিপারের প্রয়োজন মেটাতে বনাঞ্চল দখল করা হয়।
- নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মাণ : ইংল্যান্ডের ওক কাঠের সংকট দেখা দিলে ব্রিটিশ রাজকীয় যুদ্ধজাহাজ তৈরির জন্য মজবুত সেগুন কাঠের অবাধ সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- রাজস্ব বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক শোষণ : কাঠ, রবার, গালা, মোম, চামড়া ইত্যাদির বাণিজ্যিক রফতানি করে বিপুল সরকারি আয় অর্জন এবং ইউরোপীয় ঠিকাদারদের ইজারা দিয়ে মুনাফা লোটা।
- চা ও কফি বাগিচা বিস্তার : ইউরোপীয় প্ল্যান্টারদের জন্য জঙ্গল কেটে চা, কফি ও নীল বাগিচা গড়ে তোলার জমি বরাদ্দ করা।
- বনভূমি শ্রেণীবিভাগ : অরণ্যকে 'সংরক্ষিত', 'সুরক্ষিত' ও 'গ্রামীণ' শ্রেণীতে ভাগ করে আদিবাসীদের অবাধ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
২. আদিবাসীদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ আন্দোলন :
- জীবিকা ও সংস্কৃতির সংকট : অরণ্য আইন আদিবাসীদের পশুপালন, শিকার, কন্দমূল সংগ্রহ এবং চিরাচরিত 'ঝুম' বা স্থানান্তর চাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেয়, যার ফলে তারা চরম অনাহার ও অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।
- বেগার শ্রম ও ঠিকাদারদের নিপীড়ন : বনবিভাগের ইউরোপীয় কর্মচারী ও ঠিকাদাররা আদিবাসীদের বিনা পারিশ্রমিকে জঙ্গল কাটায় বাধ্য করত এবং চরম শারীরিক নির্যাতন চালাত।
- ধারাবাহিক বিদ্রোহের বিস্ফোরণ : এই অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২), বীরসা মুন্ডার উলগুলান (১৮৯৯-১৯০০), বাস্তার বিদ্রোহ (১৯১০) এবং আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে রম্পা বিদ্রোহ (১৯২২-২৪)।
উপসংহার : অরণ্য আইন ছিল ভারতের পরিবেশ ও আদিবাসী সমাজের ওপর ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের এক চরম নিদর্শন, যা সমগ্র উপজাতি ভারতকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মরণপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ করেছিল।
৪র্থ অধ্যায় : সংঘবদ্ধতার গোড়ার কথা (Early Stages of Collective Action)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- ১৮৮৩ সালে লর্ড রিপনের আইন সচিব সি. পি. ইলবার্ট ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের বিচার করার অধিকার দিয়ে যে বিল আনেন, তা ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত।
- ঐতিহাসিক ড. অনিল শীলের মতে, উনিশ শতকে ভারতীয়দের জাতীয় চেতনা রাজনৈতিক রূপ নিয়ে অসংখ্য সংগঠনের জন্ম দেয় (যেমন: বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, ভারত সভা ইত্যাদি)।
- গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শিল্পীরা ব্রিটিশ বর্ণবিদ্বেষ এবং অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণকারী বাঙালি বাবু সমাজের ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ কৌতুকের মাধ্যমে উন্মোচন করতে ব্যঙ্গচিত্র আঁকতেন।
- সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটি কেবল সিপাহীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সাধারণ জনতা ব্রিটিশদের উৎখাত করতে অভিন্ন লক্ষ্যে লড়েছিল, তাই সাভারকর একে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলেন।
- লর্ড লিটন দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলির স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে ব্রিটিশ নীতির সমালোচনা বন্ধ করতে এই কুখ্যাত দমনমূলক আইন জারি করেন।
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০৫ সালে ভারতমাতাকে চার হাত বিশিষ্ট শান্ত বৈষ্ণবী সন্ন্যাসিনীরূপে আঁকেন; তাঁর হাতে ছিল অন্ন (ধান), বস্ত্র, শিক্ষা (বেদ) ও দীক্ষার প্রতীক।
- ১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসু স্বদেশী ভাবধারা, দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী ও শরীরচর্চার মাধ্যমে বাঙালির আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
- ১ নভেম্বর ১৮৫৮ এলাহাবাদ দরবারে প্রকাশিত হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশীয় রাজন্যবর্গ ও প্রজাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা।
- বর্ণবিদ্বেষের কারণে তারা একজন কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় বিচারকের আদালতে শ্বেতাঙ্গদের বিচার হওয়াকে চূড়ান্ত অপমানজনক মনে করত।
- সিভিল সার্ভিসে বয়স কমানোর প্রতিবাদ, দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন বাতিল এবং ইলবার্ট বিলের সমর্থনে ব্যাপক আন্দোলন চালায়।
- আলো-ছায়ার কিউবিজমের ব্যবহার এবং ব্রিটিশ তোষামোদকারী বাঙালি বাবু সংস্কৃতির নগ্ন রূপ প্রকাশ।
- গোলন্দাজ বাহিনী সম্পূর্ণ ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং ভারতীয় ও ব্রিটিশ সেনার অনুপাত ২:১ করা হয়।
- দূরবর্তী বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, ভাববিনিময় ও অভিন্ন ভারতীয় সত্তার জন্ম দেয় রেলপথ।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষে সাহিত্য ও শিল্পের অবদান ছিল অপরিসীম। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, রবীন্দ্রনাথের গোরা এবং অবনীন্দ্রনাথের ভারতমাতা চিত্র জাতীয় চেতনার তিন প্রধান আলোকবর্তিকা।
- বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) : এর অন্তর্নিহিত 'বন্দে মাতরম' গানটি দেশমাতৃকাকে পূজনীয় মাতৃমূর্তিতে রূপায়িত করে। দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের যে দীক্ষা আনন্দমঠের সন্তানদল দিয়েছিল, তা স্বদেশী ও বিপ্লবী আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গোরা' (১৯১০) : সংকীর্ণ জাতিভেদ, গোঁড়ামি ও অন্ধ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে উদার, অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন মানবতাবাদী ভারতবর্ষের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে এই উপন্যাসে। গোরার উপলব্ধি ছিল—"আমি ভারতীয়।"
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' চিত্র (১৯০৫) : চার হাত বিশিষ্ট বৈষ্ণবী সন্ন্যাসিনীরূপী ভারতমাতার হাতে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও দীক্ষা ছিল আত্মনির্ভরশীল ও অহিংস ভারতের পবিত্র রূপ।
উপসংহার : এই সৃষ্টিগুলি পরাধীন ভারতবাসীর মনে শৃঙ্খলমুক্তির অদম্য প্রেরণা জুগিয়েছিল।
ভূমিকা : ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে গবেষকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য বিদ্যমান। কেউ একে সামন্ত বিদ্রোহ, আবার কেউ ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে দেখেছেন।
- সামন্ত শ্রেণীর বিদ্রোহের যুক্তি : ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও সুরেন্দ্রনাথ সেন মনে করেন এই বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দ—নানা সাহেব, ঝাঁসির লক্ষ্মীবাঈ, কুনওয়ার সিং প্রমুখ সামন্ত শাসকরা মূলত নিজেদের হারানো রাজ্য ও স্বার্থ রক্ষার জন্যই লড়াই করেছিলেন। সমগ্র ভারত নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় ধারণা তাঁদের ছিল না।
- প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের যুক্তি : বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে এটি কেবল সামরিক অভ্যুত্থান বা সামন্ত লড়াই ছিল না। সিপাহী ও অযোধ্যা-বিহারের সাধারণ জনগণ ইংরেজদের সমূলে উৎখাত করে ভারতবর্ষকে পরাধীনতামুক্ত করতে একযোগে যুদ্ধ করেছিল। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল অভূতপূর্ব।
মূল্যায়ন : আধুনিক জাতীয়তাবাদী চেতনার ঘাটতি সত্ত্বেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেওয়া এটিই ছিল প্রথম সর্বভারতীয় গণপ্রতিরোধ।
ভূমিকা : ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে সর্বভারতীয় জাতীয় সংগঠন হিসেবে 'ভারত সভা' (Indian Association) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- সর্বভারতীয় ঐক্য গড়ে তোলা : সুরেন্দ্রনাথ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঐক্য সাধনের জন্য দেশব্যাপী সফর করেন। তিনি উত্তর ভারত ও দক্ষিণ ভারতে জনসভা করে ব্যাপক সমর্থন আদায় করেন।
- সিভিল সার্ভিস আন্দোলন : সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ভারতীয়দের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করার প্রতিবাদে ভারত সভা দেশজোড়া তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে।
- দেশীয় ভাষা সংবাদপত্র আইন ও ইলবার্ট বিল : লর্ড লিটনের ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট এবং বর্ণবিদ্বেষী ইলবার্ট বিলের বিরোধিতায় ভারত সভা ভারতীয়দের এক কাতারে দাঁড় করায়।
- জাতীয় সম্মেলন (National Conference) : ১৮৮৩ ও ১৮৮৫ সালে সুরেন্দ্রনাথের উদ্যোগে কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলন পরবর্তীকালে 'জাতীয় কংগ্রেস' প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছিল।
উপসংহার : সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই ভারত সভাকে জাতীয় কংগ্রেসের পূর্বসূরী বলা হয়।
ভূমিকা : উনিশ শতকের উত্তরার্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক নীতি এবং তার বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়ার দুটি প্রধান ঐতিহাসিক মাইলফলক হলো মহারানীর ঘোষণাপত্র ও ইলবার্ট বিল বিতর্ক।
- মহারানীর ঘোষণাপত্র (১ নভেম্বর ১৮৫৮) : ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ রাজমুকুটের হাতে ন্যস্ত করে। লর্ড ক্যানিং এলাহাবাদ দরবারে এটি পাঠ করেন। এতে দেশীয় রাজ্য বিস্তার বন্ধ, ধর্মীয় নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং যোগ্যতানুসারে ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে সমানাধিকারের আশ্বাস দেওয়া হয়—যদিও বাস্তবে তা প্রতিশ্রুতির খেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
- ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৮৩) : লর্ড রিপনের আইন সচিব সি. পি. ইলবার্ট ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের বিচার করার ক্ষমতা দিয়ে একটি বিল আনেন। ক্ষুব্ধ ইউরোপীয়রা 'ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' গড়ে জাতিবিদ্বেষমূলক তীব্র আন্দোলন চালায়। বাধ্য হয়ে সরকার বিলটি সংশোধন করে।
উপসংহার : এই দুই ঘটনা ভারতীয়দের স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে আবেদন-নিবেদনে নয়, নিজেদের সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধ ছাড়া অধিকার আদায় অসম্ভব।
ভূমিকা : ১৮৯৯ সালে উদ্বোধন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এবং পরবর্তীতে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত স্বামী বিবেকানন্দের 'বর্তমান ভারত' হলো ভারতীয় জাতীয়তাবোধের অবিনশ্বর মন্ত্রবাণী।
- ভারতের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ : বিবেকানন্দ দেখান কীভাবে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শাসনের পর বিশ্বে 'শূদ্র' অর্থাৎ মেহনতি শ্রমিক শ্রেণীর জাগরণ আসন্ন। তিনি দরিদ্র জনসাধারণের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখেন।
- দেশমাতৃকা ও সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ব : তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন—"বলো ভাই, ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুকালীন দোলনা।"
- দুর্বলতা ও কাপুরুষতার তীব্র নিন্দা : তিনি যুবসমাজকে পেশিবহুল আত্মবিশ্বাসী হতে আহ্বান জানান এবং বলেন পরাধীনতার মূল কারণ হলো ভারতীয়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও ঐক্যের অভাব।
মূল্যায়ন : অরবিন্দ ঘোষ ও সুভাষচন্দ্র বসু স্বীকার করেছেন যে স্বদেশী ও বিপ্লবী আন্দোলনের হাজার হাজার তরুণ বিবেকানন্দের এই লেখনী থেকেই আত্মবলিদানের প্রেরণা পেয়েছিলেন।
ভূমিকা : ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ যখন উত্তর ও মধ্য ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন কলকাতার পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ সামগ্রিকভাবে এই বিদ্রোহের প্রতি বিরূপ ও উদাসীন মনোভাব প্রদর্শন করেছিল।
- ব্রিটিশ শাসনকে প্রগতির বাহক মনে করা : শিক্ষিত বাঙালি সমাজ বিশ্বাস করত ব্রিটিশ শাসনই ভারতে আধুনিক শিক্ষা, রেল, টেলিগ্রাফ ও সামাজিক সংস্কারের বিকাশ ঘটিয়েছে। তারা আশঙ্কা করেছিল বিদ্রোহ সফল হলে মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক অরাজকতা ফিরে আসবে।
- বিদ্রোহের নিন্দা ও শান্তি প্রার্থনা : সমকালীন পত্রিকা 'সংবাদ প্রভাকর', 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা প্রকাশ্যে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং সরকারের বিজয়ের জন্য প্রার্থনা সভা করে।
- ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি : কিশোরীচাঁদ মিত্র, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো অনেকে সিপাহীদের অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করলেও সশস্ত্র বিদ্রোহের পন্থাকে সমর্থন করেননি।
উপসংহার : শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের এই ঔপনিবেশিক মোহভঙ্গ ঘটতে আরও কয়েক দশক সময় লেগেছিল, যা পরবর্তী জাতীয় আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করে।
ভূমিকা : ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে নবগোপাল মিত্র এবং রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে কলকাতায় 'জাতীয় মেলা' বা 'হিন্দু মেলা' প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল বাঙালির আত্মমর্যাদা ও স্বদেশপ্রেমের প্রথম সার্বজনীন উৎসব।
- স্বদেশী ভাবধারা ও আত্মনির্ভরতা : মেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় শিল্প, হস্তশিল্প, তাঁত ও কৃষিপণ্যের প্রদর্শনী করে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা।
- জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ : মেলায় জাতীয় সঙ্গীত, দেশাত্মবোধক কবিতা আবৃত্তি এবং ঐতিহাসিক নাটকের প্রতিযোগিতা হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিশোর বয়সে এই মেলায় স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন।
- শারীরচর্চা ও অস্ত্রশিক্ষা : মেলায় কুস্তি, লাঠিখেলা, শরীরচর্চা ও অসিযুদ্ধের প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাঙালি যুবকদের কাপুরুষতার দুর্নাম ঘুচিয়ে নির্ভীক ও বলশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মূল্যায়ন : সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হিন্দু মেলাই বাঙালির মনে প্রথম স্বদেশপ্রেম ও আত্মশক্তির বীজ বপন করেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতে জাতীয়তাবোধের উন্মেষে কেবল রাজনৈতিক সভা-সমিতি নয়, সাহিত্যিকদের রচনা ('লেখা') এবং শিল্পীদের চিত্রশিল্প ('রেখা') এক যুগান্তকারী স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছিল।
১. লেখার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ :
- বঙ্কিমচন্দ্রের 'আনন্দমঠ' ও 'বন্দে মাতরম' : দেশমাতৃকার দেবীরূপ এবং আত্মত্যাগী সন্তানদলের বীরগাথা ভারতবাসীর রক্তে দেশপ্রেমের সঞ্চার করে। বন্দে মাতরম জাতীয় আন্দোলনের বীজমন্ত্রে পরিণত হয়।
- রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' উপন্যাস : সংকীর্ণ বর্ণভেদ ও গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে নিখাদ মানবিক ও সর্বজনীন ভারত-আত্মার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে এই উপন্যাসে।
- স্বামী বিবেকানন্দের 'বর্তমান ভারত' : বিবেকানন্দ দৃপ্ত কণ্ঠে ভারতবাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন—"বলো আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই... ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ।" তিনি নিম্নবর্গ ও শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির ওপর জোর দেন।
২. রেখার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের বিকাশ :
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ভারতমাতা' চিত্র (১৯০৫) : স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে অবনীন্দ্রনাথ ভারতমাতাকে চার হাত বিশিষ্ট বৈষ্ণবী সন্ন্যাসিনীরূপে আঁকেন। তাঁর হাতে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ও দীক্ষা ছিল আত্মনির্ভরশীল ও শান্ত ভারতের অহিংস প্রতীক।
- গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্র : গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যঙ্গচিত্রমালা 'অদ্ভুত লোক', 'বিরূপ বজ্র'-এর মাধ্যমে অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণকারী উচ্চবিত্ত বাঙালি বাবু সমাজ এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বর্ণবিদ্বেষের নগ্ন স্বরূপ তীব্র কৌতুকের সঙ্গে উন্মোচন করেছিলেন।
উপসংহার : লেখনী ও তুলির এই মেলবন্ধন ভারতীয়দের পরাধীনতার গ্লানি মোচন করে এক গৌরবময় আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান করেছিল।
৫ম অধ্যায় : বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ (Alternative Ideas & Initiatives)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- ১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান ভারতে মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পদার্থ-উদ্ভিদবিদ্যার উচ্চতর শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করে।
- ৩০ নভেম্বর ১৯১৭ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু এটি প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল পরাধীন ভারতে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলা।
- ১৮০০ সালে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক বাংলা ছাপাখানা ও গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।
- তিনি সংস্কৃত প্রেস স্থাপন করেন এবং 'বর্ণপরিচয়'সহ আদর্শ শিশুপাঠ্য গ্রন্থ ছাপিয়ে বাংলা প্রকাশনা ব্যবসাকে আধুনিক রূপ দেন।
- ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও দর্শনের মিলন ঘটিয়ে এক বিশ্বভ্রাতৃত্বের শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি চার্লস উইলকিন্সের তত্ত্বাবধানে নিখুঁত ও নান্দনিক বাংলা অক্ষরের ধাতব টাইপ সফলভাবে তৈরি করেছিলেন।
- চার্লস উইলকিন্সকে বাংলার গুটেনবার্গ বলা হয়, কারণ তিনি প্রথম সফলভাবে বাংলা হরফের ধাতু নির্মিত টাইপ তৈরি করেছিলেন।
- চারদেওয়ালের কৃত্রিম পরিবেশ ভেঙে মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিশুর আনন্দময় বিকাশের উদ্দেশ্যে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ১১ মার্চ ১৯০৬ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় সরকারি বিদ্যালয় বর্জন করে স্বদেশী নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্যে গঠিত হয়।
- তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং ১৮৭৬ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীন মৌলিক গবেষণা কেন্দ্র IACS-এর প্রতিষ্ঠাতা।
- মেকলের ধারণা ছিল উচ্চবিত্তদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষা দিলে তা ধীরে ধীরে সমাজে নিচের স্তরে চুইয়ে পড়বে; এই নীতিকেই চুইয়ে পড়া নীতি বলে।
- তিনি বলেন ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল কেরানি তৈরির যান্ত্রিক খাঁচা ('তোতাকাহিনী'), যাতে শিশুর হৃদয়ের কোনো যোগ নেই।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম' এবং পরবর্তীতে ১৯২১ সালে 'বিশ্বভারতী' বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাস্তব শিক্ষাদর্শনের রূপায়ণ।
- মুক্ত প্রকৃতির কোলে পাঠদান : চারদেওয়ালের ইট-কাঠের যান্ত্রিক শ্রেণীকক্ষের বদলে গাছপালা, পাখির ডাক ও মুক্ত আকাশের তলায় পাঠদানের ব্যবস্থা করেন, যাতে শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ ও কৌতূহল অক্ষুণ্ণ থাকে।
- সৃজনশীলতা ও কলাচর্চা : কলাভবন ও সঙ্গীতভবন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নৃত্য, গীত, চিত্রকলা ও অভিনয়কে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ করে তোলেন।
- আন্তর্জাতিক মৈত্রী ও মিলনক্ষেত্র : বিশ্বভারতীর আদর্শ ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধন ঘটানো। বিশ্বভারতীর মূলমন্ত্র ছিল—"যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্"।
- শ্রীনিকেতন ও পল্লী পুনর্গঠন : তিনি শিক্ষাকে সাধারণ গ্রামীণ মানুষের কৃষিকাজ, কুটিরশিল্প ও স্বাস্থ্যোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেন।
উপসংহার : রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আধুনিক ভারতে বিকল্প মুক্ত শিক্ষার শ্রেষ্ঠ প্রতীক।
ভূমিকা : ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই কলকাতায় ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত IACS ছিল ভারতের প্রথম মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
- প্রতিষ্ঠার পটভূমি : ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার উপলব্ধি করেন যে পরাধীন ভারতের যুবসমাজকে প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত না করলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তিনি দেশীয় অর্থানুকূল্যে ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রণে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন।
- ঐতিহাসিক বিজ্ঞান সাধনা : ফাদার লাফোঁ, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ দিকপাল এখানে নিয়মিত বিজ্ঞান সাধনা করতেন।
- রামন এফেক্ট ও নোবেল পুরস্কার (১৯৩০) : এই প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারেই ড. সি. ভি. রমন তাঁর ঐতিহাসিক আলোক বিকিরণ সংক্রান্ত গবেষণা সম্পন্ন করেন এবং ১৯২৮ সালে 'রামন এফেক্ট' আবিষ্কার করে ১৯৩০ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
উপসংহার : ভারতে আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় বিজ্ঞানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় IACS-এর অবদান অনন্য।
ভূমিকা : ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর ভারতীয় বিজ্ঞানের পথিকৃৎ স্যার জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' (Bose Institute) প্রতিষ্ঠা করেন।
- প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য : উদ্ভিদের প্রাণ ও সংবেদনশীলতা, তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং জীব ও জড়জগতের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্কের ওপর উচ্চতর মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করা।
- আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার : নিজস্ব আবিষ্কৃত 'ক্রেসকোগ্রাফ' যন্ত্রের সাহায্যে জগদীশচন্দ্র বসু উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উত্তেজনার সাড়া বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানটিকে দেশের বিজ্ঞান পিপাসু তরুণদের মন্দির হিসেবে উৎসর্গ করেন।
- বিজ্ঞান ও দর্শনের মিলন : প্রতিষ্ঠানের স্থাপত্য ও আদর্শে ভারতীয় প্রাচীন দর্শন ও আধুনিক বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।
উপসংহার : বসু বিজ্ঞান মন্দির পরাধীন ভারতে বিজ্ঞান গবেষণায় আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ভূমিকা : স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয় শিক্ষার বিস্তার এবং আধুনিক মুদ্রণ শিল্পের বিকাশে এই প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বের অবদান অবিস্মরণীয়।
- জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (১৯০৬) : বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমিতে ব্রিটিশ সরকারি শিক্ষালয় বর্জন করে স্বদেশী নিয়ন্ত্রণে সাহিত্য, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়ে ১১ মার্চ ১৯০৬ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে এটি গঠিত হয়। এর অধীনে গড়ে ওঠে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।
- উপেন্দ্রকিশোর ও ইউ রায় অ্যান্ড সন্স (১৮৯৫) : উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ভারতে আধুনিক হাফটোন ব্লক প্রিন্টিং পদ্ধতির পথিকৃৎ। ১৮৯৫ সালে তিনি 'ইউ রায় অ্যান্ড সন্স' ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করে স্ক্রিন-অ্যাডজাস্টিং যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তাঁর মুদ্রিত 'সন্দেশ' পত্রিকা ও ছোটদের বই বাংলা মুদ্রণ শিল্পের মান আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেয়।
উপসংহার : এই প্রচেষ্টাগুলি প্রমাণ করে বিকল্প চিন্তা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাঙালিরা স্বকীয় মেধার অসাধারণ স্বাক্ষর রেখেছিল।
ভূমিকা : ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সমান্তরালে তারকনাথ পালিতের অর্থানুকূল্যে ২৫ জুলাই ১৯০৬ বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য : পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি ব্যবহারিক কারিগরি, যন্ত্রবিদ্যা ও প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে দেশের যুবসমাজকে শিল্পমুখী ও স্বাবলম্বী করে তোলা। বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ প্রমথনাথ বসু এর প্রথম অধ্যক্ষ হন।
- পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ : মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি সাবান তৈরি, রং তৈরি, চামড়া পাকা করা ইত্যাদি শিল্পের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর : পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানটি কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (CET) এবং পরিশেষে ১৯৫৫ সালে আধুনিক 'যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়'-এ রূপান্তরিত হয়।
মূল্যায়ন : বাংলায় প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে বিটিআই এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল।
ভূমিকা : বাংলায় আধুনিক ছাপাখানা ও প্রকাশনা শিল্পের প্রাথমিক ভিত গড়ে উঠেছিল শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন প্রেস এবং প্রথম বাঙালি প্রকাশক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের হাত ধরে।
- শ্রীরামপুর মিশন প্রেস (১৮০০) : উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম ওয়ার্ডের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রেস থেকে ৪০টিরও বেশি ভারতীয় ও প্রাচ্য ভাষায় বাইবেল ও ব্যাকরণ গ্রন্থ ছাপা হয়। এখান থেকেই প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র 'দিগদর্শন' এবং সাপ্তাহিক 'সমাচার দর্পণ' (১৮১৮) প্রকাশিত হয়।
- গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের অনন্য ভূমিকা : তিনি ছিলেন বাংলা প্রকাশনা শিল্পের প্রথম বাঙালি পথিকৃৎ। শ্রীরামপুর প্রেসে কাজ শিখে ১৮১৬ সালে তিনি কলকাতায় 'বেঙ্গল গেজেটি প্রেস' স্থাপন করেন এবং ১৮১৮ সালে প্রথম সচিত্র বাংলা বই 'অন্নদামঙ্গল' ও প্রথম বাঙালি সম্পাদিত সংবাদপত্র 'বেঙ্গল গেজেট' প্রকাশ করেন।
উপসংহার : এই দুই উদ্যোগের মাধ্যমেই বাংলায় মুদ্রিত বইপত্রের বিস্তার ঘটে এবং আধুনিক শিক্ষা সর্বসাধারণের নাগালে আসে।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ভারতের আধুনিক শিক্ষাচিন্তার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রবর্তিত ঔপনিবেশিক চারদেওয়ালের যান্ত্রিক ও মুখস্থনির্ভর কেরানি তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। তাঁর আদর্শ ছিল প্রকৃতির মুক্ত কোলে মানবাত্মার পূর্ণ বিকাশ।
১. প্রকৃতি ও শিক্ষার নিবিড় সমন্বয় :
- মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্য : রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন প্রকৃতির অবারিত রূপ শিশুর মন ও ইন্দ্রিয়কে বিকশিত করে। তাই চারদেওয়ালের শ্রেণীকক্ষ ত্যাগ করে তিনি শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে ও শালবীথিকার মুক্ত ছায়াতলে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করেন।
- ঋতু বৈচিত্র্যের অনুভূতি : প্রকৃতির বিভিন্ন ঋতু পরিবর্তন, গাছপালা, পশুপাখির সঙ্গে নিত্য বসবাস শিশুর সংবেদনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে এবং বিশ্বপ্রকৃতির সাথে একাত্ম হতে শেখায়।
২. মানুষ ও শিক্ষার আত্মিক মেলবন্ধন :
- সর্বতোমুখী ব্যক্তিত্বের বিকাশ : কেবল পুথিগত বিদ্যা নয়, শিশুর শারীরিক, মানসিক, নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক গুণের সর্বাঙ্গীণ উন্মেষই হলো প্রকৃত শিক্ষা।
- সৃজনশীলতার স্বাধীনতা : রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার ক্ষেত্রে চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, নৃত্য, অভিনয় ও হস্তশিল্পের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন—"আনন্দহীন শিক্ষা কোনো শিক্ষাই নয়।"
- মাতৃভাষার মাধ্যমে পাঠদান : তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন মাতৃভাষায় শিক্ষাদানই শিশুর স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে সতেজ রাখে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন—"শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ।"
৩. বিশ্বমানবধর্ম ও বিশ্বভারতীর আদর্শ :
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় : সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বদলে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও আন্তর্জাতিকতাবোধ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর বিশ্বভারতীর মূলমন্ত্র ছিল—"যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্" (যেখানে সমগ্র বিশ্ব এসে একটি নীড়ে মিলিত হয়)।
- কর্মশিক্ষা ও পল্লী পুনর্গঠন : তিনি শ্রীনিকেতনে পল্লী পুনর্গঠন বিভাগ খুলে গ্রামবাসীদের কৃষিবিদ্যা, তাঁতশিল্প ও প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেন, যাতে শিক্ষা সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে কাজে আসে।
উপসংহার : রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা কেবল এক তাত্ত্বিক ধারণা ছিল না; শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর মাধ্যমে তিনি বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে প্রকৃতির আনন্দময় ক্রোড়ে মানুষ ও ব্রহ্মাণ্ডের মিলনই শিক্ষার শ্রেষ্ঠতম শিখর।
৬ষ্ঠ অধ্যায় : বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- কৃষকরা সরাসরি পূর্ণ স্বরাজ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়।
- কমিউনিস্ট ও বামপন্থী ভাবধারার প্রভাবে কিষাণ সভা গড়ে স্বতন্ত্র শ্রেণী আন্দোলন গড়ে তোলে।
- বিহারের চম্পারনে রায়তদের প্রতি বিঘার (২০ কাঠা) সবচেয়ে উর্বর ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে নীল চাষ করতে বাধ্য করার চুক্তি ছিল তিনকাঠিয়া প্রথা।
- ১৯৪২-এ মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশ সামন্তের নেতৃত্বে সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়; তারা নিজস্ব 'বিদ্যুৎ বাহিনী' ও আদালত পরিচালনা করে।
- ১৯৩৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ, আচার্য নরেন্দ্র দেব প্রমুখ কংগ্রেসের মধ্যে বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই দল গড়েন।
- নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ৫০% খাজনা না দেওয়া, নগদ অর্থে খাজনা প্রদান এবং জমি থেকে বেআইনি উচ্ছেদ বন্ধ করা।
- ১৯২৮ সালে কৃষক ও শ্রমিকদের দাবিকে জাতীয় আন্দোলনের মূলধারায় আনতে এবং পূর্ণ স্বরাজ অর্জনের লক্ষ্যে গঠিত হয়।
- স্বদেশী নেতারা মূলত বর্ণহিন্দু জমিদার শ্রেণীর ছিলেন এবং কৃষকদের ভূমি অধিকার বা খাজনা হ্রাসের কোনো দাবি কর্মসূচিতে রাখেননি।
- ১৯২৮ সালে বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কর-বন্ধ আন্দোলন সফল হয়ে প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল অহিংস সত্যাগ্রহ অজেয়।
- ১৯২১-২২ সালে উত্তরপ্রদেশের হরদোই, সীতাপুর ও বাহরাইচে নিম্নবর্গের নেতা মাদারী পাশি এই আন্দোলন শুরু করেন।
- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং ভারী করের চাপে কৃষক ও সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল।
- ১৯২১ সালে কেরালার মালাবার উপকূলে দরিদ্র মুসলিম মোপলা কৃষকরা অত্যাচারী হিন্দু জেনমি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
- ১৮৭০ সালে সমাজসেবক শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায় বরাহনগরে শ্রমজীবী সমিতি এবং ১৮৭৪ সালে 'ভারত শ্রমজীবী' পত্রিকা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : বিশ শতকের বিশের দশকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে শ্রমিক-কৃষকদের উত্থান ও বামপন্থী রাজনীতির বিস্তার রোধ করতে ব্রিটিশ সরকার নানা দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
- ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (১৯২৮) : বোম্বাই ও বাংলায় বামপন্থী নেতাদের উদ্যোগে গঠিত এই দল জাতীয় কংগ্রেসকে পূর্ণ স্বরাজের দাবিতে পরিচালিত করতে এবং শ্রমিক-কৃষকদের ৮ ঘণ্টা কাজ, ন্যূনতম মজুরি ও জমিদারি উচ্ছেদের দাবিকে জাতীয় আন্দোলনের মূল এজেন্ডা করে তুলতে সচেষ্ট হয়।
- মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯-৩৩) : কমিউনিস্ট ও শ্রমিক আন্দোলনের ব্যাপক বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, ফিলিপ স্প্রাট সহ ৩১ জন শীর্ষ শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করে চার বছর ধরে এই ঐতিহাসিক বিচার চালায়। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ও সাহিত্যিক রোমাঁ রোলাঁ এই দমননীতির তীব্র নিন্দা করেন।
উপসংহার : ব্রিটিশরা বামপন্থা দমনে মামলা চালালেও কাঠগড়াটিই পরিণত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রচারের অন্যতম বৈপ্লবিক মঞ্চে।
ভূমিকা : ১৯২১-২২ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশের হরদোই, বাহরাইচ, সীতাপুর প্রভৃতি জেলায় মাদারী পাশির নেতৃত্বে এক স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র কৃষক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা 'একা' বা একতা আন্দোলন নামে পরিচিত।
- আন্দোলনের কারণ : তালুকদার ও জমিদারদের দ্বারা নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ৫০% খাজনা আদায়, অন্যায় উপঢৌকন (আবওয়াব) এবং কৃষকদের জমি থেকে আকস্মিক উচ্ছেদ ও বেগার শ্রমের বিরুদ্ধে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ জন্ম নেয়।
- আন্দোলনের শপথ ও কর্মসূচি : কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় শপথ নেয় যে তারা নির্ধারিত খাজনা ব্যতীত এক পয়সাও বেশি দেবে না, নগদ অর্থে খাজনা দেবে এবং বেগার খাটবে না। নিম্নবর্গের পশুপালক ও কৃষকদের ঐক্য ছিল এর মূল শক্তি।
- সীমাবদ্ধতা ও সরকারি দমন : অহিংস আন্দোলনের গণ্ডি পেরিয়ে কৃষকরা অনেক সময় জমিদারদের সম্পত্তিতে আক্রমণ চালায়, যার ফলে জাতীয় কংগ্রেস এই আন্দোলন থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। পরিশেষে ব্রিটিশ পুলিশ নির্মম দমনপীড়ন চালিয়ে মাদারী পাশিসহ নেতাদের গ্রেপ্তার করে আন্দোলন স্তব্ধ করে।
মূল্যায়ন : একা আন্দোলন ছিল নিম্নবর্গীয় কৃষকদের সম্পূর্ণ নিজস্ব তাগিদে গড়ে ওঠা এক দুঃসাহসী শোষণবিরোধী সংগ্রাম।
ভূমিকা : ১৯২৮ সালে গুজরাটের সুরাট জেলার বারদৌলি তালুকে ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় ৩০% ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন সংঘটিত হয়।
- গান্ধীজির পূর্ণ নৈতিক সমর্থন : মহাত্মা গান্ধী আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থন জানান এবং তাঁর 'ইয়ং ইন্ডিয়া' ও 'নবজীবন' পত্রিকায় বারদৌলির কৃষকদের আত্মত্যাগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি নির্দেশ দেন যে আন্দোলনটি সম্পূর্ণ অহিংস ও সুশৃঙ্খল থাকতে হবে।
- কংগ্রেস নেতৃত্বের অংশগ্রহণ : বল্লভভাই প্যাটেলের পাশাপাশি কংগ্রেস নেতারা গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প করে কৃষকদের শপথ গ্রহণ করান যাতে কোনো অবস্থাতেই বর্ধিত খাজনা না দেওয়া হয়। নারীদের অংশগ্রহণে কস্তুরবা গান্ধী ও মণিাবেন প্যাটেল নেতৃত্ব দেন।
- আইনসভার বাইরে চাপ সৃষ্টি : বোম্বাই আইনসভার কংগ্রেস সদস্যরা কৃষকদের সমর্থনে পদত্যাগ করেন এবং সর্বভারতীয় স্তরে ব্রিটিশদের ওপর বিপুল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন।
উপসংহার : কংগ্রেসের এই সুসংগঠিত সমর্থনের ফলেই সরকার নতিস্বীকার করে ম্যাক্সওয়েল-ব্লুমফিল্ড তদন্ত কমিটি বসাতে বাধ্য হয় এবং রাজস্ব বৃদ্ধি ৬.০৩%-এ নামিয়ে আনে।
ভূমিকা : ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সূচিত স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনে বাংলার শ্রমিক শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়েছিল।
- কলকারখানা ধর্মঘট : বিলিতি পণ্য বয়কটের পাশাপাশি ব্রিটিশ মালিকানাধীন চটকল, সুতাকল ও প্রিন্টিং প্রেসগুলিতে শ্রমিকরা ধর্মঘট পালন করে। হাওড়ার বার্ন কোম্পানি, ফোর্ট গ্লস্টার জুট মিলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দেয়।
- রেল ও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিরোধ : ১৯০৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের (EIR) বাঙালি কেরানি ও শ্রমিকরা ঐতিহাসিক ধর্মঘট সংগঠিত করে। স্টিমার শ্রমিকরাও আন্দোলনে যোগ দেয়।
- ট্রেড ইউনিয়নের অঙ্কুরোদগম : অশ্বিনীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, লিয়াকত হোসেন প্রমুখ নেতারা শ্রমিকদের সংগঠিত করেন এবং এই সময়েই 'ইন্ডিয়ান মিল হ্যান্ডস ইউনিয়ন' ও 'প্রিন্টার্স ইউনিয়ন'-এর মতো প্রাথমিক শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে।
উপসংহার : বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন সামাজিক শক্তির আগমন বার্তা ঘোষণা করেছিল।
ভূমিকা : উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে পূর্ববঙ্গে (ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, যশোর) তথাকথিত নিম্নবর্ণের চণ্ডাল বা নমশূদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন 'নমশূদ্র আন্দোলন' নামে পরিচিত।
- শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও মতুয়া আন্দোলন : ওড়াকান্দির শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর নমশূদ্রদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করেন এবং এক সহজিয়া ভক্তিবাদী 'মতুয়া ধর্ম' প্রবর্তন করে জাতপাত বিরোধী মানবিক চেতনা গড়ে তোলেন।
- গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন : হরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর উপলব্ধি করেন শিক্ষার অভাবই নমশূদ্রদের প্রধান অনগ্রসরতার কারণ। তিনি গ্রামে গ্রামে পাঠশালা খোলেন এবং সরকারি চাকরির দাবি তোলেন।
- রাজনৈতিক রূপ ও স্বাতন্ত্র্য : বিশ শতকে প্রমথরঞ্জন ঠাকুর ও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে এই আন্দোলন রাজনৈতিক মর্যাদা অর্জন করে। উচ্চবর্ণের হিন্দু নেতৃত্বের উদাসীনতার কারণে তারা স্বতন্ত্র দলিত স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট হয়।
মূল্যায়ন : এটি ছিল বর্ণহিন্দুর সামাজিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক সফল সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সংগ্রাম।
ভূমিকা : ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল লখনউ শহরে সর্বভারতীয় স্তরে কৃষকদের অধিকার রক্ষার প্রধান জাতীয় সংগঠন হিসেবে 'সর্বভারতীয় কিষাণ সভা' (All India Kisan Sabha) প্রতিষ্ঠিত হয়।
- প্রতিষ্ঠাতা ও নেতৃত্ব : বিহারের প্রখ্যাত কৃষক নেতা স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী ছিলেন এর প্রথম সভাপতি এবং অন্ধ্রের কৃষক নেতা এন. জি. রঙ্গা ছিলেন প্রথম সাধারণ সম্পাদক। এতে ইন্দুলাল যাজ্ঞিক, পি. সি. যোশী প্রমুখ অংশ নেন।
- মূল দাবি ও কিষাণ ম্যানিফেস্টো : জমিদারি প্রথার সম্পূর্ণ উচ্ছেদ, কৃষকদের ঋণের দায় মকুব, উৎপন্ন ফসলের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এবং জমির ওপর রায়তদের নিঃশর্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
- জাতীয় কংগ্রেসের সাথে সম্পর্ক : জওহরলাল নেহরু এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতৃত্ব অনেক সময় জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, যার ফলে কিষাণ সভা একটি স্বাধীন বামপন্থী কৃষক ফ্রন্ট হিসেবে গড়ে ওঠে।
উপসংহার : এই সংগঠনের নেতৃত্বেই পরবর্তীকালে তেভাগা, তেলেঙ্গানা ও ওয়ার্লি কৃষক সংগ্রামের মতো ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর ভারতবর্ষে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন বিপ্লবী ধারার সূচনা ঘটে, যা বামপন্থী আন্দোলন নামে পরিচিত। মানবেন্দ্রনাথ রায়, মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে প্রমুখের নেতৃত্বে বামপন্থীরা স্বাধীনতা সংগ্রামকে সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তি সংগ্রামের সাথে যুক্ত করেন।
১. বামপন্থী আন্দোলনের সূচনা ও দল গঠন :
- সিপিআই প্রতিষ্ঠা : ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার তাসখন্দে মানবেন্দ্রনাথ রায়, অবনী মুখার্জী প্রমুখ প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ১৯২৫ সালে কানপুরে সত্যভক্তের উদ্যোগে এটি ভারতীয় মাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (WPP) : ১৯২৮ সালে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে কৃষক-শ্রমিকদের দাবি তুলে ধরতে গঠিত হয় এই দল, যা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
২. জাতীয় আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বে বামপন্থীদের ভূমিকা :
- পূর্ণ স্বরাজের দাবি উত্থাপন : ১৯২১ সালে আহমেদাবাদ কংগ্রেস অধিবেশনে মৌলানা হাসরত মোহানি এবং মানবেন্দ্রনাথ রায়ই প্রথম ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে ভারতের 'পূর্ণ স্বাধীনতার' (Complete Independence) দাবি উত্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে কংগ্রেস গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
- শ্রমিক ও কৃষক সমাবেশ : বামপন্থীরা দেশের প্রধান প্রধান শিল্পনগরী কলকাতা, বোম্বাই, কানপুরে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলে। ১৯২০ সালে গঠিত এআইটিইউসি (AITUC)-র মাধ্যমে মিল ধর্মঘট ও রেল ধর্মঘটের নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতির মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেয়।
- আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো পর্বে : ১৯৩০-এর দশকে শ্রমিক শ্রেণী দেশজুড়ে আইন অমান্য আন্দোলনে শামিল হয়। ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বহু সাধারণ বামপন্থী কর্মী গোপন প্রচার ও প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন।
৩. ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি ও ঐতিহাসিক মামলা :
- বামপন্থীদের উত্থানে শঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৪ সালে পেশোয়ার ও কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা এবং ১৯২৯ সালে ঐতিহাসিক মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে মুজফফর আহমেদ, ডাঙ্গে, ফিলিপ স্প্রাট সহ ৩১ জন বিশিষ্ট বামপন্থী নেতাকে কারারুদ্ধ করে। এই বিচার বিশ্বজুড়ে আলবার্ট আইনস্টাইন ও রোমাঁ রোলাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
উপসংহার : বামপন্থীদের অক্লান্ত আন্দোলনের ফলেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের লড়াই থাকেনি; তা জমিদারি উচ্ছেদ, শ্রমিক অধিকার এবং সাম্যবাদী শোষণহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে রূপান্তরিত হয়েছিল।
ভূমিকা : ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে সূচিত 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন' ছিল ভারতের মুক্তি সংগ্রামের সর্বাত্মক গণবিপ্লব। শীর্ষ কংগ্রেস নেতৃত্ব গ্রেপ্তারের পর দেশের শ্রমিক শ্রেণী ব্রিটিশ কলকারখানা ও উৎপাদন স্তব্ধ করে এই আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখে।
১. ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা :
- কলকারখানা ধর্মঘট ও উৎপাদন স্তব্ধ : বোম্বাই, আহমেদাবাদ, কলকাতা, কানপুর, মাদ্রাজের বস্ত্রকল ও কারখানাগুলিতে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালন করে। আহমেদাবাদের বস্ত্রশিল্পে টানা সাড়ে তিন মাস একনাগাড়ে ধর্মঘট চলেছিল, যাকে পণ্ডিত নেহরু 'ভারতের স্ট্যালিনগ্রাদ' আখ্যা দেন।
- জামশেদপুরের টিস্কো (TISCO) ধর্মঘট : জামশেদপুরের টাটা স্টিল কারখানার প্রায় ত্রিশ হাজার ইস্পাত শ্রমিক 'কোনো ব্রিটিশ যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করব না' শপথ নিয়ে টানা ১৩ দিন উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে।
- রেল ও পরিবহন ব্যবস্থা পঙ্গু করা : রেলওয়ে ও ডক শ্রমিকরা রেললাইন উপড়ে ফেলে, টেলিগ্রাফ তার কেটে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ব্রিটিশ সেনা চলাচল রুখে দেয়।
- সশস্ত্র প্রতিরোধ ও আত্মবলিদান : পুলিশের নির্মম গুলি ও লাঠিচার্জের মুখেও শ্রমিকরা পিছু হটেনি; তারা আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের আশ্রয় প্রদান ও প্রচারপত্র বিতরণে অগ্রণী ভূমিকা নেয়।
২. ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি (W.P.P) টীকা :
- পটভূমি ও প্রতিষ্ঠা : ১৯২৬-২৮ খ্রিস্টাব্দে মানবেন্দ্রনাথ রায়, মুজফফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, পি. সি. যোশী প্রমুখ বামপন্থী নেতাদের উদ্যোগে বোম্বাই ও বাংলায় প্রাদেশিক দলগুলি একত্রিত হয়ে ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে সর্বভারতীয় 'ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজেন্টস পার্টি' আত্মপ্রকাশ করে।
- মূল লক্ষ্য ও কর্মসূচি : জাতীয় কংগ্রেসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ থেকে 'পূর্ণ স্বরাজ' আদায় করা, জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে কৃষকদের বিনামূল্যে জমি প্রদান এবং কলকারখানায় শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের সময় ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ।
- পত্র-পত্রিকা ও প্রচার : বাংলায় কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় 'লাঙল' ও 'গণবাণী', বোম্বাইয়ে 'ক্রান্তি' পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি করে।
- ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও দমন : এই পার্টির ক্রমবর্ধনশীল জনপ্রিয়তায় আতঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে ঐতিহাসিক মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে এর সমস্ত শীর্ষ নেতৃত্বকে কারারুদ্ধ করে।
উপসংহার : শ্রমিক শ্রেণীর এই মরণপণ সংগ্রাম প্রমাণ করেছিল যে ভারতের জাতীয় মুক্তির চালিকাশক্তি ছিল মেহনতি মানুষের অদম্য প্রাণশক্তি।
৭ম অধ্যায় : বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
- আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাপ্টেন রশিদ আলীকে ব্রিটিশ আদালত ৭ বছর কারাদণ্ড দিলে তার প্রতিবাদে ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ কলকাতায় ধর্মঘট পালিত হয়।
- ৮ ডিসেম্বর ১৯৩০ বিনয়, বাদল ও দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করে সিম্পসনকে হত্যা করে পুলিশের সাথে যে অসম বন্দুকযুদ্ধ চালান, তাকে অলিন্দ যুদ্ধ বলে।
- মাস্টারদা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে নেতৃত্ব দেন এবং প্রীতিলতা পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করে ধরা পড়ার মুহূর্তে সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
- বীণা দাস কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি চালান এবং ঝাঁসির রাণী ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন।
- ১৯০৫ সালে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসুর নেতৃত্বে কার্লাইল সার্কুলার অমান্যকারী বহিষ্কৃত ছাত্রদের পড়াশোনা ও স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত রাখতে গঠিত হয়।
- ১০ অক্টোবর ১৯০৫ জারি করা ব্রিটিশ আদেশ, যেখানে ছাত্রদের স্বদেশী সমাবেশ বা 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিলে স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয়।
- অরুণা আসফ আলী পতাকা উত্তোলন করেন, উষা মেহতা গোপন কংগ্রেস রেডিও চালান এবং মাতঙ্গিনী হাজরা প্রাণ বিসর্জন দেন।
- ১৯২৩ সালে ঢাকায় লীলা নাগ নারীদের শরীরচর্চা, অস্ত্রশিক্ষা ও বৈপ্লবিক চেতনায় প্রস্তুত করার লক্ষ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
- ৭৩ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা তমলুক থানা অভিযানে তেরঙা পতাকা উঁচিয়ে পুলিশের গুলিতে বীরের মতো শহীদ হন ('গান্ধীবুড়ি')।
- নারীরা অন্দরমহল ভেঙে সরাসরি রাজপথের আইন অমান্য ও পিকেটিংয়ে অংশ নেন।
- সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামে বন্দুক ও বোমা হাতে প্রত্যক্ষ অ্যাকশনে নামেন।
- ১৯৩২ সালে পুনা চুক্তির পর মহাত্মা গান্ধী দলিতদের অস্পৃশ্যতা দূর করে আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে হরিজন সেবক সংঘ গড়েন।
- ফরিদপুরের ওড়াকান্দিতে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর দলিত নমশূদ্র সমাজের অধিকার ও শিক্ষা বিস্তারে মতুয়া মহাসংঘ গড়েন।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
ভূমিকা : মহাত্মা গান্ধীর ডাকে বিশ শতকের দুটি প্রধান জাতীয় আন্দোলন—১৯৩০-এর আইন অমান্য এবং ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ভারতীয় নারীরা ব্যাপক সংখ্যায় রাজপথে নেমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
- আইন অমান্য আন্দোলনে নারী সমাজ : সরোজিনী নাইডুর নেতৃত্বে দর্শনা লবণগোলা অভিযান অহিংস নারী প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাসন্তী দেবী, নেলী সেনগুপ্ত, প্রভাবতী দেবী প্রমুখ নারী রাজপথে মিছিল, পিকেটিং ও লবণ আইন ভঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে শত শত সংখ্যায় কারাবরণ করেন।
- ভারত ছাড়ো আন্দোলনে নারী বীরত্ব : শীর্ষ নেতারা বন্দি হলে নারীরা আন্দোলনের হাল ধরেন। অরুণা আসফ আলী বোম্বাইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং সুচেতা কৃপালিনী গোপন রেডিও সম্প্রচারে অংশ নেন।
- বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা : মেদিনীপুরের তমলুকে ৭৩ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা জাতীয় পতাকা হাতে থানা অভিযানে নেতৃত্ব দেন এবং ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
উপসংহার : এই আন্দোলনগুলি প্রমাণ করে ভারতীয় নারীরা কেবল চারদেওয়ালের রক্ষক নন, তাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী।
ভূমিকা : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লব এক গৌরবময় অধ্যায়। শিক্ষক সূর্য সেন এবং তাঁর বিশ্বস্ত ছাত্রী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এই সংগ্রামের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র।
- মাস্টারদা সূর্য সেন : তিনি ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'র চট্টগ্রাম শাখা নিয়ে যুগপৎ দুটি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেন, টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করেন এবং জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে জয়লাভ করে চট্টগ্রামে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।
- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার : মাস্টারদার নির্দেশে ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম ভারতীয় নারী সেনাপতি হিসেবে পাহাড়তলীর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন। ক্লাবের প্রবেশদ্বারে লেখা ছিল 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ'। প্রীতিলতা বীরবিক্রমে সফল আক্রমণ চালিয়ে ধরা পড়ার মুহূর্তে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
মূল্যায়ন : এঁদের অসীম বীরত্ব ও আত্মবলিদান প্রমাণ করেছিল যে ভারতের যুবসমাজ ও নারীরা দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে দ্বিধাহীন।
ভূমিকা : বিশ শতকের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ভারতীয় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক ও বিস্ময়কর দিক।
- সহযোগী ভূমিকা থেকে প্রত্যক্ষ অ্যাকশনে রূপান্তর : প্রথমদিকে নারীরা মূলত বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া, গোপন বার্তা ও অস্ত্র বহন এবং অর্থ সংগ্রহের কাজ করতেন। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকে প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, বীণা দাসরা সরাসরি রিভলবার ও বোমা হাতে অ্যাকশনে নামেন।
- শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও ছাত্রী সমাজের প্রাধান্য : ঢাকা, চট্টগ্রাম, কলকাতা ও কুমিল্লার কলেজ ও স্কুলের প্রগতিশীল ছাত্রীরাই প্রধানত এই বিপজ্জনক পথে এগিয়ে আসেন। লীলা নাগের 'দীপালি সংঘ' তাদের অস্ত্রশিক্ষা ও অনুপ্রেরণা জোগায়।
- আপসহীন আত্মবলিদানের আদর্শ : ধরা পড়ার মুহূর্তে ধরা না দিয়ে আত্মাহুতি দেওয়ার অভূতপূর্ব সাহস তাঁরা দেখিয়েছিলেন (যেমন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার)।
উপসংহার : নারীদের এই সশস্ত্র পদার্পণ পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক বাঁধন ভেঙে দেশের মুক্তিসংগ্রামে নারীকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছিল।
ভূমিকা : বিংশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় নারী শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন ও সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে লীলা নাগ (রায়) এক অবিস্মরণীয় অগ্নিকন্যা।
- দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা (১৯২৩) : ঢাকায় নারীদের আত্মরক্ষা, লাঠিখেলা, শরীরচর্চা ও রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি দীপালি সংঘ গড়ে তোলেন। এটি অচিরেই বিপ্লবীদের নারী শাখার প্রধান নার্সারিতে পরিণত হয়।
- নারী শিক্ষা বিস্তার : তিনি ঢাকায় 'দীপালি স্কুল' এবং একাধিক নারী শিক্ষালয় স্থাপন করেন যাতে মেয়েরা আধুনিক শিক্ষায় স্বাবলম্বী হতে পারে।
- শ্রীসঙ্ঘ ও নেতাজির সাথে সংযোগ : বিপ্লবী অনিল রায়ের 'শ্রীসঙ্ঘ'-এর সাথে যুক্ত হয়ে তিনি সরাসরি বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। সুভাষচন্দ্র বসুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কাজ করেন।
- 'জয়শ্রী' পত্রিকা প্রকাশ : ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদে নারীদের পরিচালিত প্রথম নির্ভীক রাজনৈতিক পত্রিকা 'জয়শ্রী' প্রকাশ করেন।
মূল্যায়ন : লীলা নাগ প্রমাণ করেছিলেন নারী মুক্তি ও দেশের মুক্তি পরস্পরের পরিপূরক।
ভূমিকা : বিশ শতকে ভারতে বর্ণাশ্রম ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে দলিত আন্দোলন এবং বাংলায় গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে নমশূদ্র আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে।
- সামাজিক সমমর্যাদা ও আত্মসম্মান প্রতিষ্ঠা : এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল মন্দিরে প্রবেশাধিকার, সর্বজনীন জলাশয় ব্যবহারের অধিকার এবং সমাজে সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক অধিকার অর্জন (যেমন: ১৯২৭-এর মহাদ সত্যাগ্রহ)।
- শিক্ষা ও চাকরির সংরক্ষণ দাবি : দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণীর মুক্তির জন্য আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা এবং আইনসভা ও সরকারি চাকরিতে পৃথক সংরক্ষণ দাবি করা হয়।
- উচ্চবর্ণের প্রতি অনাস্থা ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান : দলিত নেতারা মনে করতেন উচ্চবর্ণের নেতৃত্বে চলা জাতীয় আন্দোলন তাঁদের জাতপাত প্রথার খাঁচা থেকে মুক্তি দেবে না; তাই তাঁরা পৃথক নির্বাচনের দাবি তোলেন (যার ফলশ্রুতিতে ১৯৩২ সালের পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়)।
উপসংহার : এই আন্দোলন ভারতীয় সংবিধানের খসড়ায় সামাজিক সমতা ও সংরক্ষণ নীতি অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল।
ভূমিকা : বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লববাদের ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা 'বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স' (BV) এবং লীলা নাগের 'দীপালি সংঘ' দুটি কিংবদন্তি সংগঠন।
- বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (BV)-এর দুর্ধর্ষ ভূমিকা : মেজর সত্য গুপ্ত ও সুভাষচন্দ্র বসুর গঠিত এই গোপন বিপ্লবী দল ব্রিটিশ অত্যাচারী পুলিশ ও আমলাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুঃসাহসিক অ্যাকশন চালায়। অলিন্দ যুদ্ধে বিনয়-বাদল-দীনেশ কর্তৃক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সিম্পসন হত্যা এবং মেদিনীপুরের অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পেডি, ডগলাস ও বার্জকে ধারাবাহিক হত্যা ছিল বিভির চরম কৃতিত্ব।
- দীপালি সংঘের বিপ্লবী ভূমিকা : ঢাকায় নারীদের লাঠিখেলা, ছোরাখেলা ও শরীরচর্চায় প্রশিক্ষিত করে গুপ্ত সমিতির কাজের জন্য নারী বাহিনী প্রস্তুত করে দীপালি সংঘ। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও বীণা দাস এই সংঘ থেকেই প্রাথমিক দেশাত্মবোধের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন।
উপসংহার : এই দুটি সংগঠনের আত্মত্যাগ ও দুঃসাহস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক প্রশাসনের মেরুদণ্ডে স্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
ভূমিকা : বিশ শতকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের ভূমিকা নিছক সভা-সমিতি ও পিকেটিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁরা সশস্ত্র বিপ্লবের বিপজ্জনক অগ্নিপথে নির্ভীক আত্মবলিদানের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
১. বঙ্গভঙ্গ ও অহিংস পর্ব পেরিয়ে সশস্ত্র পথে পদার্পণ :
- সরলাদেবী চৌধুরানী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও প্রতাপাদিত্য উৎসবের মাধ্যমে যুবসমাজকে অস্ত্রশিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করেন।
- ১৯২৩ সালে ঢাকায় লীলা নাগ গড়ে তোলেন 'দীপালি সংঘ', যা নারীদের অস্ত্রশিক্ষা, লাঠিখেলা ও গুপ্ত সমিতির কাজের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।
২. বিপ্লবী অধ্যায়ে বীর নারীদের ভূমিকা :
- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার : মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি প্রীতিলতা ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করে সফল হন এবং গ্রেপ্তার এড়াতে সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় নারী বিপ্লবী শহীদ।
- কল্পনা দত্ত : চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও জালালাবাদ যুদ্ধের পর তিনি গোপন আস্তানায় বোমা তৈরি ও গেরিলা যুদ্ধে মাস্টারদার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন।
- শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী : কুমিল্লার দুই নির্ভীক স্কুলছাত্রী ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করেন।
- বীণা দাস : ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বাংলার কুখ্যাত গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে অত্যন্ত নিকট থেকে লক্ষ্য করে পরপর রিভলবারের গুলি চালান।
৩. নারীদের আত্মত্যাগের বৈশিষ্ট্য :
- গোপন চিঠিপত্র ও অস্ত্র একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছে দেওয়া, বিপ্লবীদের আশ্রয় দেওয়া এবং প্রয়োজনে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার অভূতপূর্ব তেজ তাঁরা প্রদর্শন করেছিলেন।
উপসংহার : এই অগ্নিকন্যাদের দৃষ্টান্ত ভারতীয় নারীকে অবগুণ্ঠিতা থেকে দেশের মুক্তির রণচণ্ডীতে রূপান্তরিত করেছিল, যা বিশ্ববিপ্লবের ইতিহাসে এক বিরল ও স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।
ভূমিকা : ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন ভারতীয় মহিলাদের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের প্রথম জাতীয় মঞ্চ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। অন্দরমহলের ঘেরাটোপ পেরিয়ে হাজার হাজার নারী রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
১. নারী সমাজের বহুমুখী ভূমিকা :
- অরন্ধন ও রাখিবন্ধন উৎসব : ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের কালো দিনে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে মহিলারা ঘরে ঘরে উনুন না জ্বালিয়ে 'অরন্ধন' পালন করেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখিবন্ধন উৎসবে শামিল হয়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বার্তা দেন।
- বিদেশি দ্রব্য বর্জন ও পিকেটিং : নারীরা বিলাতি কাঁচের চুড়ি ভেঙে ফেলেন, বিলিতি লবণ ও ম্যানচেস্টারের বস্ত্র ব্যবহার বর্জন করেন এবং হাটে-বাজারে দোকানে পিকেটিংয়ে অংশ নেন।
- স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার ও অর্থ সাহায্য : খদ্দরের মোটা কাপড় পরা ও দেশীয় চরকায় সুতো কাটাকে নারীরা ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। অনেকে স্বদেশী আন্দোলনের তহবিলে নিজেদের সোনার অলঙ্কার দান করে দেন।
- নারীদের সংগঠন ও নেতৃত্ব : সরলাদেবী চৌধুরানী গড়ে তোলেন 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' স্বদেশী বিপণি এবং 'প্রতাপাদিত্য উৎসব'-এর মাধ্যমে যুবসমাজকে লাঠিখেলা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। স্বর্ণকুমারী দেবী 'সখী সমিতি'র মাধ্যমে স্বদেশী মেলা আয়োজন করেন।
- বিপ্লবীদের আশ্রয় ও অস্ত্র সংরক্ষণ : বহু গৃহবধূ ব্রিটিশ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিপ্লবীদের নিজেদের গৃহে গোপনে আশ্রয় দিতেন এবং অস্ত্র ও নিষিদ্ধ প্রচারপত্র লুকিয়ে রাখতেন।
২. আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা :
- উচ্চবিত্ত ও শহুরে সীমাবদ্ধতা : আন্দোলনটি মূলত কলকাতা ও জেলা শহরের উচ্চবর্ণীয় হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল; গ্রামীণ কৃষক নারীরা ব্যাপকভাবে এতে অংশ নেয়নি।
- মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ নগণ্য : ধর্মীয় আচার (যেমন রাখি, ব্রত) ব্যবহারের কারণে বাংলার মুসলিম সমাজের নারীদের এতে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি।
- স্বতন্ত্র নারী দাবিদাওয়ার অভাব : আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণ দেশপ্রেম নির্ভর; নারীদের শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার বা ভোটাধিকারের মতো মৌলিক সামাজিক দাবি সেখানে স্থান পায়নি।
উপসংহার : সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ভারতীয় নারীর বন্দিনী ভাবমূর্তি ভেঙে তাঁদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মূলস্রোতে এক পরাক্রমশালী শক্তিতে পরিণত করেছিল।
৮ম অধ্যায় : উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারত : বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্ব (Post-Colonial India)
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নাবলি (MCQ) MCQ মান ১
অতিসংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (VSAQ) VSAQ মান ১
36দেশীয় রাজ্যগুলির ভারতভুক্তির দলিলের নাম কী ছিল?
একটি বাক্যে উত্তর
উত্তর
ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন (Instrument of Accession)।
37জুনাগড় রাজ্যটি গণভোটের মাধ্যমে ভারতে যোগ দেয়—
ঠিক বা ভুল
উত্তর
ঠিক। (১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে ৯৯% প্রজা ভারতে যোগদানের পক্ষে ভোট দেয়।)
38ভাষাভিত্তিক অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের দাবিতে আমরণ অনশন করে কে শহীদ হন?
একটি বাক্যে উত্তর
উত্তর
গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামালু (৫৮ দিন অনশনের পর)।
39বিবৃতি : ১৯৫৩ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়েছিল।
বিবৃতি ও ব্যাখ্যা
উত্তর
সঠিক ব্যাখ্যা : ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবিগুলি পরীক্ষা করে সীমানা নির্ধারণ করার জন্য।
40কাশ্মীরের কোন্ মহারাজা ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন?
একটি বাক্যে উত্তর
উত্তর
মহারাজা হরি সিং (২৬ অক্টোবর ১৯৪৭)।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলি (SAQ) SAQ মান ২
100স্মৃতিকথা কীভাবে উদ্বাস্তু সমস্যার ইতিহাস রচনার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়?
মান ২
- সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে দাঙ্গা, ভিটেমাটি হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা ও সীমান্তের ট্র্যাজেডির জীবন্ত সত্য স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়।
101ভারতে 'লৌহমানব' কাকে এবং কেন বলা হয়?
মান ২
- সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে লৌহমানব বলা হয়, কারণ স্বাধীনতার পর ৫৬৫টির বেশি দেশীয় রাজ্যকে অখণ্ড ভারতে যুক্ত করে তিনি ভারত পুনর্গঠন করেছিলেন।
102'আজাদ কাশ্মীর' বলতে কী বোঝো?
মান ২
- ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের পর কাশ্মীর ভূখণ্ডের যে অংশ পাকিস্তান বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে, তাকে আজাদ কাশ্মীর বলা হয়।
103১৯৫০ সালে কেন নেহরু-লিয়াকত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?
মান ২
- দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ এবং তাঁদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাক্ষরিত হয়।
104'পুনর্বাসনের যুগ' (Period of Rehabilitation) বলতে কী বোঝো?
মান ২
- ১৯৪৭ থেকে পরবর্তী প্রায় এক দশক দেশভাগজনিত কোটি কোটি সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুকে জমি, ঘর ও জীবিকা প্রদানের সময়কে পুনর্বাসনের যুগ বলে।
105মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা (Mountbatten Plan) কী ছিল?
মান ২
- ৩ জুন ১৯৪৭ লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডমিনিয়নে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করার যে পরিকল্পনা দেন, তা এই নামে পরিচিত।
106ভারতের স্বাধীনতা আইনে দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে কী বলা হয়েছে?
মান ২
- বলা হয় ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব শেষ হবে এবং দেশীয় রাজ্যগুলি ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে।
107রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (১৯৫৩) কেন গঠিত হয়?
মান ২
- অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের পর সমগ্র ভারতজুড়ে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি খতিয়ে দেখতে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে গঠিত হয়।
108কোন পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করেন?
মান ২
- ১৯৪৭-এর অক্টোবরে পাকিস্তানি হানাদার সেনা শ্রীনগরের কাছে পৌঁছে গেলে মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্যের জন্য দলিলে স্বাক্ষর করেন।
109ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের পিছনে যুক্তি কী ছিল?
মান ২
- একই ভাষাভাষী মানুষদের শাসনকার্য ও যোগাযোগ সহজ হয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ দ্রুত ঘটে।
110ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবগুলি কী ছিল?
মান ২
- একটি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং একটি গণপরিষদ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
111ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ফরাসি ও পর্তুগিজ উপনিবেশগুলি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়?
মান ২
- চন্দননগর ও পন্ডিচেরি চুক্তির মাধ্যমে এবং গোয়া ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনার 'অপারেশন বিজয়' অভিযানের মাধ্যমে ভারতভুক্ত হয়।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
44দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জুনাগড় এবং হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়েছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের সীমানায় থাকা দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি ছিল নবজাত ভারতের অখণ্ডতার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদের সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল।
- জুনাগড় সমস্যার সমাধান : জুনাগড়ের মুসলিম নবাব সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু প্রজা সত্ত্বেও পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে 'আরজি হুকুমত' গঠন করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করে এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে ৯৯% প্রজা ভারতে যোগদানের পক্ষে রায় দিলে জুনাগড় ভারতভুক্ত হয়।
- হায়দ্রাবাদ ও অপারেশন পোলো : হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলি খান স্বাধীন থাকতে চেয়ে অত্যাচারী 'রাজাকার' বাহিনীর সাহায্যে প্রজাদের ওপর সন্ত্রাস চালাতেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo) সামরিক অভিযান চালায়। নিজামের বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং হায়দ্রাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হয়।
উপসংহার : এই দুই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই ভারতের মানচিত্র ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড রূপ লাভ করেছিল।
45দেশভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে ভারত সরকার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রত্যক্ষ ও নির্মম পরিণতি ছিল কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট। এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সামাল দিতে ভারত সরকারকে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হয়।
- ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর গঠন : সরকার একটি পৃথক পুনর্বাসন মন্ত্রক গড়ে তোলে। পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে তাবু খাটিয়ে বিশাল বিশাল ত্রাণ শিবির ও লঙ্গরখানা তৈরি করা হয়।
- পশ্চিম প্রান্তের পুনর্বাসন : পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য দিল্লিতে তিলকনগরের মতো কলোনি এবং ফরিদাবাদ, চণ্ডীগড়ে পরিকল্পিত আবাসন ও জমি বরাদ্দ করা হয়। ক্ষতিপূরণ প্রদান করে স্থায়ী পুনর্বাসন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
- পূর্ব প্রান্তের জটিলতা ও ক্যাম্প ব্যবস্থা : পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সরকার স্থায়ী পুনর্বাসনের বদলে কেবল অস্থায়ী ত্রাণ সাহায্য দিতে থাকে। পরবর্তীকালে দণ্ডকারণ্য ও আন্দামানে উদ্বাস্তুদের পাঠানোর বিতর্কিত নীতি গৃহীত হয়।
- নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (১৯৫০) : দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে উদ্বাস্তু স্রোত থামানোর চেষ্টা করা হয়।
মূল্যায়ন : আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীন ভারত সরকার এই বিশাল মানবিক বিপর্যয়কে অত্যন্ত সহমর্মিতা ও ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছিল।
46টীকা লেখো : কাশ্মীর সমস্যা এবং ভারত-পাকিস্তান বিরোধের সূত্রপাত।
মান ৪
ভূমিকা : দেশীয় রাজ্য কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম ভূ-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত।
- মহারাজা হরি সিং-এর দোদুল্যচিত্ততা : কাশ্মীর ছিল হিন্দু রাজা হরি সিং শাসিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। ১৯৪৭-এর আগস্টে রাজা স্বাধীন থাকার চেষ্টা করে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সাথেই অনাক্রমণ চুক্তি করতে চান।
- পাকিস্তানি আক্রমণ ও ভারতভুক্তি : ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সমর্থিত হানাদার উপজাতি ও পাকিস্তানি সেনা কাশ্মীর আক্রমণ করে রাজধানী শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে। ভীত মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর না করলে সেনা পাঠানো সম্ভব নয়।
- দলিলে স্বাক্ষর ও যুদ্ধ : ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং 'Instrument of Accession'-এ স্বাক্ষর করে ভারতকে সার্বভৌম ক্ষমতা দেন। ভারতীয় সেনা কাশ্মীর পৌঁছে হানাদারদের পিছু হটিয়ে শ্রীনগর রক্ষা করে।
- আজাদ কাশ্মীর ও রাষ্ট্রসংঘের যুদ্ধবিরতি : কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পাকিস্তানের বেআইনি দখলে থেকে যায় (PoK), এবং ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
উপসংহার : সেই থেকেই কাশ্মীর উপত্যকা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চিরস্থায়ী বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
47ভারত সরকার কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার প্রশ্নটি সমাধান করেছিল (ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন)?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের সময় ৫৬৫টিরও বেশি দেশীয় রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো রাষ্ট্রে যোগ দেওয়া অথবা স্বাধীন থাকার বিপজ্জনক সুযোগ দিয়ে যায়। এই খণ্ড-বিখণ্ড দেশকে এক সুতোয় গাঁথার দায়িত্ব নেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও ভি. পি. মেনন।
- স্টেটস ডিপার্টমেন্ট ও ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন : সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে গঠিত হয় দেশীয় রাজ্য দপ্তর। তিনি সমস্ত রাজাদের কাছে 'ভারতভুক্তি দলিল' (Instrument of Accession) পেশ করে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ—এই তিনটি কেন্দ্রীয় বিষয় ভারতের হাতে সমর্পণের প্রস্তাব দেন।
- কূটনীতি ও দেশপ্রেমের আবেদন : প্যাটেল অত্যন্ত মিষ্টি কূটনীতির মাধ্যমে রাজাদের বোঝান যে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়াই তাদের অস্তিত্ব ও প্রজাদের মঙ্গলের একমাত্র পথ। এর বিনিময়ে রাজাদের খেতাব ও বাৎসরিক রাজভাতা (Privy Purse) দেওয়া হয়।
- কঠোর সামরিক পদক্ষেপ : যে রাজ্যগুলি অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করে—যেমন জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ ও কাশ্মীর—সেখানে কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারতভুক্ত করা হয়।
উপসংহার : সর্দার প্যাটেলের এই লৌহদৃঢ় নেতৃত্বের ফলেই ভারত বহু খণ্ডে বিভক্ত 'বলকানাইজেশন' থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
48স্বাধীনতার পর নবগঠিত স্বাধীন ভারতের সামনে কী কী প্রধান সমস্যা দেখা দিয়েছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের আনন্দে ভাসলেও নবজাত স্বাধীন ভারতের সম্মুখে এক পাহাড়প্রমাণ বহুমুখী জাতীয় সংকট উপস্থিত হয়েছিল।
- দেশভাগজনিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা : পাঞ্জাব, বাংলা ও দিল্লিতে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক হিংসায় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং সম্প্রীতির সংকট দেখা দেয়।
- উদ্বাস্তু সমস্যা : প্রায় ১ কোটি নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত মানুষের পুনর্বাসন, অন্ন ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ছিল এক তীব্র অর্থনৈতিক বোঝা।
- দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি : ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করে অখণ্ড ভারতের ভূখণ্ড নির্মাণ ছিল এক বিরাট জটিল চ্যালেঞ্জ।
- খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগের ফলে উর্বর কৃষি জমি পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় দেশে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
- ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি : বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজ্য গঠনের তীব্র আন্দোলন জাতীয় ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
উপসংহার : এই অভূতপূর্ব দুর্যোগগুলির মোকাবিলা করেই জওহরলাল নেহরু ও সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
49ভাষার ভিত্তিতে কীভাবে ভারতে রাজ্যগুলি পুনর্গঠিত হয়েছিল (রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন ও আইন, ১৯৫৬)?
মান ৪
ভূমিকা : স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিজ নিজ ভাষার ভিত্তিতে আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম প্রধান অধ্যায়।
- পটভূমি ও অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন : তেলুগু ভাষীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামালু ১৯৫২ সালে ৫৮ দিন আমরণ অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে সরকার ১ অক্টোবর ১৯৫৩ প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য হিসেবে 'অন্ধ্রপ্রদেশ' গঠন করতে বাধ্য হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (SRC, 1953) : সমগ্র ভারতের সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য ১৯৫৩ সালে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে কে. এম. পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জরুকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬) : কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট 'State Reorganisation Act' পাস করে। এর ফলে ভারতের পূর্বতন এ, বি, সি, ডি শ্রেণীর রাজ্য বিন্যাস বিলোপ করে সমগ্র ভারতকে ১৪টি অঙ্গরাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
- পরবর্তী সম্প্রসারণ : পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে দ্বিভাষিক বোম্বাই রাজ্য ভেঙে গুজরাট ও মহারাষ্ট্র গঠিত হয়।
উপসংহার : ভাষার ভিত্তিতে এই রাজ্য পুনর্গঠন ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে জাতীয় সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
পর্ষদের প্রশ্নকাঠামো নির্দেশিকা
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সর্বশেষ প্রশ্নের রূপরেখা অনুযায়ী ৮ম অধ্যায় থেকেও কোনো ৮ নম্বরের প্রশ্ন আসে না; কেবল ১ নম্বর (MCQ ও VSAQ), ২ নম্বর (SAQ) এবং ৪ নম্বরের প্রশ্ন এসে থাকে।
মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষায় ৯০+ নম্বর পাওয়ার গোপন কৌশল
- সঠিক সাল, তারিখ ও ব্যক্তির নাম : ইতিহাস উত্তর লেখার সময় সাল ও ব্যক্তির নাম নির্ভুলভাবে উল্লেখ করলে পরীক্ষকের কাছে ভালো প্রভাব তৈরি হয়। কোনো তথ্যে সন্দেহ থাকলে ভুল সাল লিখবে না।
- পয়েন্ট ও সাব-হেডিং ভিত্তিক উপস্থাপনা : ৪ ও ৮ নম্বরের প্রশ্নে গৎবাঁধা প্যারাগ্রাফের বদলে ভূমিকা, ৩-৪টি সুস্পষ্ট সাব-হেডিং বা পয়েন্ট এবং পরিশেষে মূল্যায়ন বা উপসংহার লিখলে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত হয়।
- কোটেশন ও ঐতিহাসিকদের অভিমত : বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. অনিল শীল বা বিপান চন্দ্রের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি উত্তরের মান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।
- সময় ব্যবস্থাপনা : পরীক্ষার প্রথম ১৫ মিনিটে প্রশ্ন নির্বাচন করে নাও। ১ নম্বরের প্রশ্নে কোনো অতিরিক্ত সময় নষ্ট করবে না। ২ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর ২-৩টি বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। ৮ নম্বরের জন্য অন্তত ২০-২৫ মিনিট সময় বাঁচিয়ে রাখবে।
- সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে দাঙ্গা, ভিটেমাটি হারানোর ব্যক্তিগত বেদনা ও সীমান্তের ট্র্যাজেডির জীবন্ত সত্য স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়।
- সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে লৌহমানব বলা হয়, কারণ স্বাধীনতার পর ৫৬৫টির বেশি দেশীয় রাজ্যকে অখণ্ড ভারতে যুক্ত করে তিনি ভারত পুনর্গঠন করেছিলেন।
- ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের পর কাশ্মীর ভূখণ্ডের যে অংশ পাকিস্তান বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে, তাকে আজাদ কাশ্মীর বলা হয়।
- দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বন্ধ এবং তাঁদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাক্ষরিত হয়।
- ১৯৪৭ থেকে পরবর্তী প্রায় এক দশক দেশভাগজনিত কোটি কোটি সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুকে জমি, ঘর ও জীবিকা প্রদানের সময়কে পুনর্বাসনের যুগ বলে।
- ৩ জুন ১৯৪৭ লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক ডমিনিয়নে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত করার যে পরিকল্পনা দেন, তা এই নামে পরিচিত।
- বলা হয় ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব শেষ হবে এবং দেশীয় রাজ্যগুলি ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবে অথবা স্বাধীন থাকতে পারবে।
- অন্ধ্রপ্রদেশ গঠনের পর সমগ্র ভারতজুড়ে ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনের দাবি খতিয়ে দেখতে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে গঠিত হয়।
- ১৯৪৭-এর অক্টোবরে পাকিস্তানি হানাদার সেনা শ্রীনগরের কাছে পৌঁছে গেলে মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্যের জন্য দলিলে স্বাক্ষর করেন।
- একই ভাষাভাষী মানুষদের শাসনকার্য ও যোগাযোগ সহজ হয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ দ্রুত ঘটে।
- একটি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং একটি গণপরিষদ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
- চন্দননগর ও পন্ডিচেরি চুক্তির মাধ্যমে এবং গোয়া ১৯৬১ সালে ভারতীয় সেনার 'অপারেশন বিজয়' অভিযানের মাধ্যমে ভারতভুক্ত হয়।
বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৪
44দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে জুনাগড় এবং হায়দ্রাবাদ রাজ্যটি কীভাবে ভারতভুক্ত হয়েছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের সীমানায় থাকা দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি ছিল নবজাত ভারতের অখণ্ডতার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদের সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল।
- জুনাগড় সমস্যার সমাধান : জুনাগড়ের মুসলিম নবাব সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু প্রজা সত্ত্বেও পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে 'আরজি হুকুমত' গঠন করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করে এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে ৯৯% প্রজা ভারতে যোগদানের পক্ষে রায় দিলে জুনাগড় ভারতভুক্ত হয়।
- হায়দ্রাবাদ ও অপারেশন পোলো : হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলি খান স্বাধীন থাকতে চেয়ে অত্যাচারী 'রাজাকার' বাহিনীর সাহায্যে প্রজাদের ওপর সন্ত্রাস চালাতেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo) সামরিক অভিযান চালায়। নিজামের বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং হায়দ্রাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হয়।
উপসংহার : এই দুই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই ভারতের মানচিত্র ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড রূপ লাভ করেছিল।
45দেশভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধানে ভারত সরকার কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রত্যক্ষ ও নির্মম পরিণতি ছিল কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট। এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সামাল দিতে ভারত সরকারকে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হয়।
- ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর গঠন : সরকার একটি পৃথক পুনর্বাসন মন্ত্রক গড়ে তোলে। পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে তাবু খাটিয়ে বিশাল বিশাল ত্রাণ শিবির ও লঙ্গরখানা তৈরি করা হয়।
- পশ্চিম প্রান্তের পুনর্বাসন : পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য দিল্লিতে তিলকনগরের মতো কলোনি এবং ফরিদাবাদ, চণ্ডীগড়ে পরিকল্পিত আবাসন ও জমি বরাদ্দ করা হয়। ক্ষতিপূরণ প্রদান করে স্থায়ী পুনর্বাসন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
- পূর্ব প্রান্তের জটিলতা ও ক্যাম্প ব্যবস্থা : পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সরকার স্থায়ী পুনর্বাসনের বদলে কেবল অস্থায়ী ত্রাণ সাহায্য দিতে থাকে। পরবর্তীকালে দণ্ডকারণ্য ও আন্দামানে উদ্বাস্তুদের পাঠানোর বিতর্কিত নীতি গৃহীত হয়।
- নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (১৯৫০) : দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে উদ্বাস্তু স্রোত থামানোর চেষ্টা করা হয়।
মূল্যায়ন : আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীন ভারত সরকার এই বিশাল মানবিক বিপর্যয়কে অত্যন্ত সহমর্মিতা ও ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছিল।
46টীকা লেখো : কাশ্মীর সমস্যা এবং ভারত-পাকিস্তান বিরোধের সূত্রপাত।
মান ৪
ভূমিকা : দেশীয় রাজ্য কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম ভূ-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত।
- মহারাজা হরি সিং-এর দোদুল্যচিত্ততা : কাশ্মীর ছিল হিন্দু রাজা হরি সিং শাসিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। ১৯৪৭-এর আগস্টে রাজা স্বাধীন থাকার চেষ্টা করে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সাথেই অনাক্রমণ চুক্তি করতে চান।
- পাকিস্তানি আক্রমণ ও ভারতভুক্তি : ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সমর্থিত হানাদার উপজাতি ও পাকিস্তানি সেনা কাশ্মীর আক্রমণ করে রাজধানী শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে। ভীত মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর না করলে সেনা পাঠানো সম্ভব নয়।
- দলিলে স্বাক্ষর ও যুদ্ধ : ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং 'Instrument of Accession'-এ স্বাক্ষর করে ভারতকে সার্বভৌম ক্ষমতা দেন। ভারতীয় সেনা কাশ্মীর পৌঁছে হানাদারদের পিছু হটিয়ে শ্রীনগর রক্ষা করে।
- আজাদ কাশ্মীর ও রাষ্ট্রসংঘের যুদ্ধবিরতি : কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পাকিস্তানের বেআইনি দখলে থেকে যায় (PoK), এবং ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
উপসংহার : সেই থেকেই কাশ্মীর উপত্যকা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চিরস্থায়ী বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
47ভারত সরকার কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতীয় ইউনিয়নে সংযুক্ত করার প্রশ্নটি সমাধান করেছিল (ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন)?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের সময় ৫৬৫টিরও বেশি দেশীয় রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো রাষ্ট্রে যোগ দেওয়া অথবা স্বাধীন থাকার বিপজ্জনক সুযোগ দিয়ে যায়। এই খণ্ড-বিখণ্ড দেশকে এক সুতোয় গাঁথার দায়িত্ব নেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও ভি. পি. মেনন।
- স্টেটস ডিপার্টমেন্ট ও ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন : সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে গঠিত হয় দেশীয় রাজ্য দপ্তর। তিনি সমস্ত রাজাদের কাছে 'ভারতভুক্তি দলিল' (Instrument of Accession) পেশ করে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ—এই তিনটি কেন্দ্রীয় বিষয় ভারতের হাতে সমর্পণের প্রস্তাব দেন।
- কূটনীতি ও দেশপ্রেমের আবেদন : প্যাটেল অত্যন্ত মিষ্টি কূটনীতির মাধ্যমে রাজাদের বোঝান যে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়াই তাদের অস্তিত্ব ও প্রজাদের মঙ্গলের একমাত্র পথ। এর বিনিময়ে রাজাদের খেতাব ও বাৎসরিক রাজভাতা (Privy Purse) দেওয়া হয়।
- কঠোর সামরিক পদক্ষেপ : যে রাজ্যগুলি অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করে—যেমন জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ ও কাশ্মীর—সেখানে কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারতভুক্ত করা হয়।
উপসংহার : সর্দার প্যাটেলের এই লৌহদৃঢ় নেতৃত্বের ফলেই ভারত বহু খণ্ডে বিভক্ত 'বলকানাইজেশন' থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
48স্বাধীনতার পর নবগঠিত স্বাধীন ভারতের সামনে কী কী প্রধান সমস্যা দেখা দিয়েছিল?
মান ৪
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের আনন্দে ভাসলেও নবজাত স্বাধীন ভারতের সম্মুখে এক পাহাড়প্রমাণ বহুমুখী জাতীয় সংকট উপস্থিত হয়েছিল।
- দেশভাগজনিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা : পাঞ্জাব, বাংলা ও দিল্লিতে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক হিংসায় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং সম্প্রীতির সংকট দেখা দেয়।
- উদ্বাস্তু সমস্যা : প্রায় ১ কোটি নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত মানুষের পুনর্বাসন, অন্ন ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ছিল এক তীব্র অর্থনৈতিক বোঝা।
- দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি : ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করে অখণ্ড ভারতের ভূখণ্ড নির্মাণ ছিল এক বিরাট জটিল চ্যালেঞ্জ।
- খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগের ফলে উর্বর কৃষি জমি পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় দেশে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
- ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি : বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজ্য গঠনের তীব্র আন্দোলন জাতীয় ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
উপসংহার : এই অভূতপূর্ব দুর্যোগগুলির মোকাবিলা করেই জওহরলাল নেহরু ও সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
49ভাষার ভিত্তিতে কীভাবে ভারতে রাজ্যগুলি পুনর্গঠিত হয়েছিল (রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন ও আইন, ১৯৫৬)?
মান ৪
ভূমিকা : স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিজ নিজ ভাষার ভিত্তিতে আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম প্রধান অধ্যায়।
- পটভূমি ও অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন : তেলুগু ভাষীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামালু ১৯৫২ সালে ৫৮ দিন আমরণ অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে সরকার ১ অক্টোবর ১৯৫৩ প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য হিসেবে 'অন্ধ্রপ্রদেশ' গঠন করতে বাধ্য হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (SRC, 1953) : সমগ্র ভারতের সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য ১৯৫৩ সালে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে কে. এম. পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জরুকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬) : কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট 'State Reorganisation Act' পাস করে। এর ফলে ভারতের পূর্বতন এ, বি, সি, ডি শ্রেণীর রাজ্য বিন্যাস বিলোপ করে সমগ্র ভারতকে ১৪টি অঙ্গরাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
- পরবর্তী সম্প্রসারণ : পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে দ্বিভাষিক বোম্বাই রাজ্য ভেঙে গুজরাট ও মহারাষ্ট্র গঠিত হয়।
উপসংহার : ভাষার ভিত্তিতে এই রাজ্য পুনর্গঠন ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে জাতীয় সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্নাবলি LAQ মান ৮
পর্ষদের প্রশ্নকাঠামো নির্দেশিকা
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সর্বশেষ প্রশ্নের রূপরেখা অনুযায়ী ৮ম অধ্যায় থেকেও কোনো ৮ নম্বরের প্রশ্ন আসে না; কেবল ১ নম্বর (MCQ ও VSAQ), ২ নম্বর (SAQ) এবং ৪ নম্বরের প্রশ্ন এসে থাকে।
মাধ্যমিক ইতিহাস পরীক্ষায় ৯০+ নম্বর পাওয়ার গোপন কৌশল
- সঠিক সাল, তারিখ ও ব্যক্তির নাম : ইতিহাস উত্তর লেখার সময় সাল ও ব্যক্তির নাম নির্ভুলভাবে উল্লেখ করলে পরীক্ষকের কাছে ভালো প্রভাব তৈরি হয়। কোনো তথ্যে সন্দেহ থাকলে ভুল সাল লিখবে না।
- পয়েন্ট ও সাব-হেডিং ভিত্তিক উপস্থাপনা : ৪ ও ৮ নম্বরের প্রশ্নে গৎবাঁধা প্যারাগ্রাফের বদলে ভূমিকা, ৩-৪টি সুস্পষ্ট সাব-হেডিং বা পয়েন্ট এবং পরিশেষে মূল্যায়ন বা উপসংহার লিখলে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত হয়।
- কোটেশন ও ঐতিহাসিকদের অভিমত : বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. অনিল শীল বা বিপান চন্দ্রের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি উত্তরের মান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।
- সময় ব্যবস্থাপনা : পরীক্ষার প্রথম ১৫ মিনিটে প্রশ্ন নির্বাচন করে নাও। ১ নম্বরের প্রশ্নে কোনো অতিরিক্ত সময় নষ্ট করবে না। ২ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর ২-৩টি বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। ৮ নম্বরের জন্য অন্তত ২০-২৫ মিনিট সময় বাঁচিয়ে রাখবে।
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তানের সীমানায় থাকা দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি ছিল নবজাত ভারতের অখণ্ডতার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদের সমস্যা সমাধানে ভারত সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন হয়েছিল।
- জুনাগড় সমস্যার সমাধান : জুনাগড়ের মুসলিম নবাব সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু প্রজা সত্ত্বেও পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। স্থানীয় জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে 'আরজি হুকুমত' গঠন করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতীয় সেনা প্রবেশ করে এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণভোটে ৯৯% প্রজা ভারতে যোগদানের পক্ষে রায় দিলে জুনাগড় ভারতভুক্ত হয়।
- হায়দ্রাবাদ ও অপারেশন পোলো : হায়দ্রাবাদের নিজাম ওসমান আলি খান স্বাধীন থাকতে চেয়ে অত্যাচারী 'রাজাকার' বাহিনীর সাহায্যে প্রজাদের ওপর সন্ত্রাস চালাতেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী 'অপারেশন পোলো' (Operation Polo) সামরিক অভিযান চালায়। নিজামের বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং হায়দ্রাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হয়।
উপসংহার : এই দুই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই ভারতের মানচিত্র ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে অখণ্ড রূপ লাভ করেছিল।
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের প্রত্যক্ষ ও নির্মম পরিণতি ছিল কোটি কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট। এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় সামাল দিতে ভারত সরকারকে বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হয়।
- ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর গঠন : সরকার একটি পৃথক পুনর্বাসন মন্ত্রক গড়ে তোলে। পাঞ্জাব ও পশ্চিমবঙ্গে তাবু খাটিয়ে বিশাল বিশাল ত্রাণ শিবির ও লঙ্গরখানা তৈরি করা হয়।
- পশ্চিম প্রান্তের পুনর্বাসন : পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য দিল্লিতে তিলকনগরের মতো কলোনি এবং ফরিদাবাদ, চণ্ডীগড়ে পরিকল্পিত আবাসন ও জমি বরাদ্দ করা হয়। ক্ষতিপূরণ প্রদান করে স্থায়ী পুনর্বাসন দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
- পূর্ব প্রান্তের জটিলতা ও ক্যাম্প ব্যবস্থা : পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সরকার স্থায়ী পুনর্বাসনের বদলে কেবল অস্থায়ী ত্রাণ সাহায্য দিতে থাকে। পরবর্তীকালে দণ্ডকারণ্য ও আন্দামানে উদ্বাস্তুদের পাঠানোর বিতর্কিত নীতি গৃহীত হয়।
- নেহরু-লিয়াকত চুক্তি (১৯৫০) : দুই দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে উদ্বাস্তু স্রোত থামানোর চেষ্টা করা হয়।
মূল্যায়ন : আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও স্বাধীন ভারত সরকার এই বিশাল মানবিক বিপর্যয়কে অত্যন্ত সহমর্মিতা ও ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করেছিল।
ভূমিকা : দেশীয় রাজ্য কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়, তা আজও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম ভূ-রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত।
- মহারাজা হরি সিং-এর দোদুল্যচিত্ততা : কাশ্মীর ছিল হিন্দু রাজা হরি সিং শাসিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। ১৯৪৭-এর আগস্টে রাজা স্বাধীন থাকার চেষ্টা করে ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সাথেই অনাক্রমণ চুক্তি করতে চান।
- পাকিস্তানি আক্রমণ ও ভারতভুক্তি : ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সমর্থিত হানাদার উপজাতি ও পাকিস্তানি সেনা কাশ্মীর আক্রমণ করে রাজধানী শ্রীনগরের দিকে এগোতে থাকে। ভীত মহারাজা ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চান। ভারত সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর না করলে সেনা পাঠানো সম্ভব নয়।
- দলিলে স্বাক্ষর ও যুদ্ধ : ২৬ অক্টোবর মহারাজা হরি সিং 'Instrument of Accession'-এ স্বাক্ষর করে ভারতকে সার্বভৌম ক্ষমতা দেন। ভারতীয় সেনা কাশ্মীর পৌঁছে হানাদারদের পিছু হটিয়ে শ্রীনগর রক্ষা করে।
- আজাদ কাশ্মীর ও রাষ্ট্রসংঘের যুদ্ধবিরতি : কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পাকিস্তানের বেআইনি দখলে থেকে যায় (PoK), এবং ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়।
উপসংহার : সেই থেকেই কাশ্মীর উপত্যকা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চিরস্থায়ী বৈরিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগের সময় ৫৬৫টিরও বেশি দেশীয় রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো রাষ্ট্রে যোগ দেওয়া অথবা স্বাধীন থাকার বিপজ্জনক সুযোগ দিয়ে যায়। এই খণ্ড-বিখণ্ড দেশকে এক সুতোয় গাঁথার দায়িত্ব নেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও ভি. পি. মেনন।
- স্টেটস ডিপার্টমেন্ট ও ইনস্ট্রুমেন্ট অফ অ্যাকসেশন : সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে গঠিত হয় দেশীয় রাজ্য দপ্তর। তিনি সমস্ত রাজাদের কাছে 'ভারতভুক্তি দলিল' (Instrument of Accession) পেশ করে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ—এই তিনটি কেন্দ্রীয় বিষয় ভারতের হাতে সমর্পণের প্রস্তাব দেন।
- কূটনীতি ও দেশপ্রেমের আবেদন : প্যাটেল অত্যন্ত মিষ্টি কূটনীতির মাধ্যমে রাজাদের বোঝান যে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়াই তাদের অস্তিত্ব ও প্রজাদের মঙ্গলের একমাত্র পথ। এর বিনিময়ে রাজাদের খেতাব ও বাৎসরিক রাজভাতা (Privy Purse) দেওয়া হয়।
- কঠোর সামরিক পদক্ষেপ : যে রাজ্যগুলি অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করে—যেমন জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ ও কাশ্মীর—সেখানে কঠোর সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারতভুক্ত করা হয়।
উপসংহার : সর্দার প্যাটেলের এই লৌহদৃঢ় নেতৃত্বের ফলেই ভারত বহু খণ্ডে বিভক্ত 'বলকানাইজেশন' থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
ভূমিকা : ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের আনন্দে ভাসলেও নবজাত স্বাধীন ভারতের সম্মুখে এক পাহাড়প্রমাণ বহুমুখী জাতীয় সংকট উপস্থিত হয়েছিল।
- দেশভাগজনিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা : পাঞ্জাব, বাংলা ও দিল্লিতে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক হিংসায় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং সম্প্রীতির সংকট দেখা দেয়।
- উদ্বাস্তু সমস্যা : প্রায় ১ কোটি নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত মানুষের পুনর্বাসন, অন্ন ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ছিল এক তীব্র অর্থনৈতিক বোঝা।
- দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি : ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নে যুক্ত করে অখণ্ড ভারতের ভূখণ্ড নির্মাণ ছিল এক বিরাট জটিল চ্যালেঞ্জ।
- খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগের ফলে উর্বর কৃষি জমি পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় দেশে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
- ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের দাবি : বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজ্য গঠনের তীব্র আন্দোলন জাতীয় ঐক্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
উপসংহার : এই অভূতপূর্ব দুর্যোগগুলির মোকাবিলা করেই জওহরলাল নেহরু ও সর্দার প্যাটেলের নেতৃত্বে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
ভূমিকা : স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিজ নিজ ভাষার ভিত্তিতে আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম প্রধান অধ্যায়।
- পটভূমি ও অন্ধ্রপ্রদেশ গঠন : তেলুগু ভাষীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামালু ১৯৫২ সালে ৫৮ দিন আমরণ অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। দেশজুড়ে ক্ষোভের মুখে সরকার ১ অক্টোবর ১৯৫৩ প্রথম ভাষাভিত্তিক রাজ্য হিসেবে 'অন্ধ্রপ্রদেশ' গঠন করতে বাধ্য হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন (SRC, 1953) : সমগ্র ভারতের সীমানা পুনর্বিন্যাসের জন্য ১৯৫৩ সালে বিচারপতি ফজল আলির নেতৃত্বে কে. এম. পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জরুকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হয়।
- রাজ্য পুনর্গঠন আইন (১৯৫৬) : কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫৬ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট 'State Reorganisation Act' পাস করে। এর ফলে ভারতের পূর্বতন এ, বি, সি, ডি শ্রেণীর রাজ্য বিন্যাস বিলোপ করে সমগ্র ভারতকে ১৪টি অঙ্গরাজ্য এবং ৬টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
- পরবর্তী সম্প্রসারণ : পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে দ্বিভাষিক বোম্বাই রাজ্য ভেঙে গুজরাট ও মহারাষ্ট্র গঠিত হয়।
উপসংহার : ভাষার ভিত্তিতে এই রাজ্য পুনর্গঠন ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে জাতীয় সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) সর্বশেষ প্রশ্নের রূপরেখা অনুযায়ী ৮ম অধ্যায় থেকেও কোনো ৮ নম্বরের প্রশ্ন আসে না; কেবল ১ নম্বর (MCQ ও VSAQ), ২ নম্বর (SAQ) এবং ৪ নম্বরের প্রশ্ন এসে থাকে।
- সঠিক সাল, তারিখ ও ব্যক্তির নাম : ইতিহাস উত্তর লেখার সময় সাল ও ব্যক্তির নাম নির্ভুলভাবে উল্লেখ করলে পরীক্ষকের কাছে ভালো প্রভাব তৈরি হয়। কোনো তথ্যে সন্দেহ থাকলে ভুল সাল লিখবে না।
- পয়েন্ট ও সাব-হেডিং ভিত্তিক উপস্থাপনা : ৪ ও ৮ নম্বরের প্রশ্নে গৎবাঁধা প্যারাগ্রাফের বদলে ভূমিকা, ৩-৪টি সুস্পষ্ট সাব-হেডিং বা পয়েন্ট এবং পরিশেষে মূল্যায়ন বা উপসংহার লিখলে পূর্ণ নম্বর নিশ্চিত হয়।
- কোটেশন ও ঐতিহাসিকদের অভিমত : বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. অনিল শীল বা বিপান চন্দ্রের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি উত্তরের মান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।
- সময় ব্যবস্থাপনা : পরীক্ষার প্রথম ১৫ মিনিটে প্রশ্ন নির্বাচন করে নাও। ১ নম্বরের প্রশ্নে কোনো অতিরিক্ত সময় নষ্ট করবে না। ২ নম্বরের প্রশ্নের উত্তর ২-৩টি বাক্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। ৮ নম্বরের জন্য অন্তত ২০-২৫ মিনিট সময় বাঁচিয়ে রাখবে।